একটি ইনকরপোরেটেড কোম্পানি, এর শেয়ারহোল্ডার বা
সদস্যদের থেকে
পৃথক একটা
স্বতন্ত্র আইনি
সত্তা। আগে
কোম্পানি হতো
দুই ধরনের—অন্তত সাতজন
ব্যক্তির সমন্বয়ে
পাবলিক কোম্পানি এবং অন্তত দুজন
ব্যক্তির সমন্বয়ে
প্রাইভেট কোম্পানি। ফলত একজন একক
ব্যক্তির সামনে
ব্যাপক ঝুঁকি
ও ব্যবসায়িক সীমাবদ্ধতা নিয়ে একক
মালিকানায় ব্যবসা
পরিচালনা করা
ছাড়া আর
কোনো পথ
খোলা ছিল
না।
কোম্পানি আইনে ২০২০ সালে
সংযোজিত সর্বশেষ
সংশোধনী এ সমস্যার সমাধান
নিয়ে এসেছে।
এটি ‘এক
ব্যক্তি কোম্পানি’ (ওয়ান পারসন কোম্পানি, এর পর থেকে
সংক্ষেপে ‘ওপিসি’
নামে সম্বোধিত) নামে একটি নতুন
ধারণার প্রবর্তন করেছে, যা একক
ব্যক্তিকে কোম্পানি নিবন্ধিত করার ও ‘লিমিটেড দায়বদ্ধতা’র সুবিধা পাওয়ার
সুযোগ দেয়।
উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করার একটি প্রয়াস
এ সংশোধনী। ওপিসি ছোট ও মাঝারি ব্যবসা
প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা করপোরেট
আকার দিয়ে
অথচ করপোরেশন হওয়ার প্রধান আইনি
বাধ্যবাধকতাগুলো থেকে মুক্ত
রেখে তাদের
ব্যবসাকে সহজতর
করে। এ নিবন্ধে ওপিসি
নিবন্ধন করার
ক্ষেত্রে সুযোগ
ও এই
সর্বশেষ করপোরেট
কাঠামো ‘ওপিসি’র চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করা
হবে।
কে ওপিসি নিবন্ধন করতে পারবেন?: সর্বশেষ সংশোধনী
অনুযায়ী কেবল
একজন ‘প্রাকৃতিক ব্যক্তি’ই কোনো
ওপিসির শেয়ারহোল্ডার হতে পারবেন। তার
মানে কোনো
‘আইনগত ব্যক্তিসত্তা’ অর্থাত্ করপোরেশন ওপিসির
শেয়ারহোল্ডার হতে
পারবে না।
এ আইন
একজন ব্যক্তিকে একটার বেশি ওপিসি
নিবন্ধিত করার
অনুমতি দেয়
না। এ বাধ্যবাধকতার লক্ষ্য
হচ্ছে ওপিসিতে
একক শেয়ারহোল্ডারের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিশ্চিত
করা, যাতে
একটি ওপিসি
দ্রুত বেড়ে
ওঠে এবং
প্রাইভেট/পাবলিক
কোম্পানিতে পরিণত
হয়। তারপর
ওই একক
শেয়ারহোল্ডার ওপিসির
মাধ্যমে আরো
কোনো একটি
ব্যবসায়িক উদ্যোগে
মনোযোগী হতে
পারবেন।
আইনটির ভাষা বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন কারো জন্য আইনসংগত উদ্দেশ্যে ওপিসি নিবন্ধিত করতে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। বিদেশীদের জন্য জ্ঞাপিত কোনো বাধার এমন অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর তফসিল ৯(ক)তে বেঁধে দেয়া ফর্মে একক শেয়ারহোল্ডারের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো বিদেশী জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর পেতে পারেন না। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের বিকল্প হিসেবে ‘পাসপোর্ট নম্বর’-এর অনুপস্থিতি বিদেশী নাগরিকদের জন্য ওপিসিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটা ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যদিও ভারতের আইনও এর সমতুল্য, বাংলাদেশ সরকারের বিদেশী বিনিয়োগ টানার লক্ষ্য এখানে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বিফল হয়। যা হোক, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অন্য বিধানাবলি নির্দেশ করে যে বিদেশীরাও ওপিসি নিবন্ধন করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২০২০ সালের সংশোধনী বিদেশীদের কাছে ওপিসির শেয়ার হস্তান্তর বিষয়ে বিস্তারিত বিধান দেয়। আইন অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তরে সম্মতিপত্র ও এফিডেভিটের জন্য প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ যথাযথ সত্যায়ন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরণ বাধ্যতামূলক। সুতরাং এটি প্রস্তাব করা যায় যে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের সুবিধার্থে আরজেএসসির উচিত শিডিউল ৯(ক)-এর ফর্ম পূরণের জন্য বিদেশীদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট নম্বরও গ্রহণ করা।
‘নমিনি’ সম্পর্কে: লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে যেকোনো প্রাকৃতিক ব্যক্তিকে নমিনি হিসেবে মনোনীত করা যাবে। একক শেয়ারহোল্ডার যদি মারা যান বা কোম্পানি পরিচালনা করতে অসমর্থ হয়ে পড়েন তাহলে নমিনি শেয়ারহোল্ডার হবেন। নমিনির নাম ওপিসি নিবন্ধিত করার সময়ই নিবন্ধন করতে হবে। যা হোক, নমিনি যেকোনো সময় কোনো ওপিসির নমিনি থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করতে পারেন। আর ওপিসির শেয়ারহোল্ডারও রেজিস্ট্রারকে অবগত করার মাধ্যমে নমিনি পরিবর্তন করতে পারেন। নমিনি মৃত শেয়ারহোল্ডারের সমপরিমাণ অংশ ও অন্য সুবিধাদির অধিকারী হবেন। একই সঙ্গে তিনি পূর্বতন শেয়ারহোল্ডারের সমতুল্য দায়ও বহন করবেন।
যদিও একই ব্যক্তির একাধিক ওপিসি গঠন করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা রয়েছে, তবে একজন ব্যক্তি অসংখ্য ওপিসির নমিনি হতে পারেন, ফলে তিনি পূর্বতন শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হয়ে যেতে পারেন।
ওপিসির নামকরণ: প্রাইভেট ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এতদিন তাদের নামের শেষে ‘লিমিটেড’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল। এক ব্যক্তি কোম্পানি গঠনের বৈধতা দেয়া সবশেষ সংশোধনী এ কোম্পানিগুলোর নামের শেষে ‘ওপিসি’ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। তা সত্ত্বেও অলাভজনক অ্যাসোসিয়েশন এবং নিশ্চয়তার মাধ্যমে লিমিটেড হওয়া কোম্পানির নামকরণবিষয়ক প্রথাগত ব্যতিক্রম বহাল থাকছে।
পুঁজি সম্পর্কিত বাধ্যবাধকতা: ওপিসির পরিশোধকৃত শেয়ার পুঁজি হতে
হবে অন্তত
২৫ লাখ
টাকা, তবে
৫ কোটি
টাকার বেশি
নয়। পুঁজির
ব্যাপারে এমন
বিধান অনেক
সমালোচিত হয়েছে,
কারণ সাধারণ
ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর এত বড় অংকের
পুঁজি থাকে
না। ভারত
তুলনামূলক সুলভ
পুঁজিতে ওপিসি
নিবন্ধন করার
সুযোগ দেয়।
তাদের আইন
অনুযায়ী পরিশোধকৃত পুঁজি প্রয়োজন হয়
অন্তত ১ লাখ ভারতীয়
রুপি এবং
সর্বোচ্চ ৫০
লাখ রুপি।
বাংলাদেশ সরকারের
উচিত এ বিধানটি পুনর্বিবেচনা করা এবং পরিশোধকৃত পুঁজির এ বাধ্যবাধকতা কমিয়ে ২০ লাখ
ও ৫ কোটি টাকার
মধ্যে নিয়ে
আসা।
পাশাপাশি নিবন্ধনের ঠিক আগের
অর্থবছরে ওপিসির
বার্ষিক মুনাফা
অন্তত ১ কোটি টাকা,
সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা
হতে হবে।
যদি কোনো
ব্যক্তি উল্লেখিত অংকের চেয়ে বেশি
পরিমাণ পরিশোধকৃত পুঁজির মালিক হন
এবং বার্ষিক
মুনাফা যদি
উল্লেখিত পরিমাণের চেয়ে বেশি হয়,
তাহলে কিছু
শর্তসাপেক্ষে, ওপিসিকে
প্রাইভেট লিমিটেড
কোম্পানি বা
পাবলিক লিমিটেড
কোম্পানিতে রূপান্তর করা ‘যেতে পারে’। এক্ষেত্রে বাংলাদেশী আইন যদিও
একটা তুলনামূলক শিথিল অবস্থান নেয়,
ভারতের আইন
এক্ষেত্রে বাধ্যতাসূচক ভাষা ব্যবহার করে
এবং নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা
ওপিসিকে প্রাইভেট অথবা পাবলিক লিমিটেড
কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা সেখানে বাধ্যতামূলক। তাছাড়া কোনো ওপিসি
নির্দিষ্ট সীমা
অতিক্রম করেও
নিজেকে রূপান্তরিত না করলেও বাংলাদেশের আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিধান নেই।
ওপিসি নিবন্ধন: ওপিসি নিবন্ধনের জন্য সংঘস্মারকে একজন
নমিনির নাম
ও সম্মতি
অন্তর্ভুক্ত করতে
হবে, যিনি
শেয়ারহোল্ডারের দায়িত্ব
পালনে অসমর্থ
হওয়ার ক্ষেত্রে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন।
প্রাইভেট লিমিটেড
কোম্পানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়াগুলো প্রয়োজনীয় পরিমার্জন সাপেক্ষে ওপিসির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ‘রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক
কোম্পানিজ’ (আরজেএসসি)-এর কাছে সংঘস্মারক এবং সংঘবিধি জমাদান
ছাড়াও আরো
কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে যেগুলো আবশ্যিকভাবে পালন করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, নাম
ছাড়ের আবেদনপত্র, শেয়ারহোল্ডারের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন, কর শনাক্তকরণ নম্বরের কপি, আইনের
তফসিল ৯(ক) অনুযায়ী
পূরণকৃত ফর্ম
দরকার হয়।
বিদেশীদের ক্ষেত্রে তাদের পাসপোর্ট দরকারি।
নিবন্ধনের পর
আরজেএসসি একটি
ইনকরপোরেশন সনদ
প্রদান করবে
যা কোম্পানিকে এর সাধারণ সিলমোহরের দ্বারা নিজের ব্যবসা
পরিচালনা করার
ক্ষমতা প্রদান
করবে।
ওপিসির পরিচালক এবং সভা: একটি ওপিসির একমাত্র
শেয়ারহোল্ডার এর
পরিচালক হবেন।
আইন এমন
কিছু বলে
না যে
ওপিসির পরিচালক
একজনের বেশি
হতে পারবে
না। তাছাড়া
৩ জুন
২০১৮ ‘করপোরেট
গভর্ন্যান্স কোড’
শিরোনামে বিএসইসির জারি করা পরিপত্রবলে যে প্রত্যেক কোম্পানির বাধ্যতামূলকভাবে ‘তাদের বোর্ডে
স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকরী প্রতিনিধিত্ব রাখতে
হবে’। তবে কোনো
ওপিসি স্বাধীন
পরিচালক নিয়োগ
করছে এমনটা
এখনো দেখা
যায়নি।
লক্ষণীয়,
ওপিসিগুলোর জন্য
প্রতি ছয়
মাসে অন্তত
একবার পরিচালকদের সভা অনুষ্ঠিত করা
বাধ্যতামূলক। তার
মানে যদি
ওপিসিতে একের
বেশি পরিচালক
না থাকে
তবে এ সভা নেহায়েত
ছলনা হয়ে
থেকে যাবে।
সুতরাং ওপিসিগুলো একের বেশি পরিচালক
রাখতে পারে।
এ সভাগুলোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরো প্রশ্ন
আছে। উদাহরণস্বরূপ ওপিসির সভায় কোরাম
কীভাবে হবে।
ভারতীয় কোম্পানি আইন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে
যে বার্ষিক
সাধারণ সভা
(এজিএম) সম্পর্কিত নিয়মাবলি ওপিসির জন্য
প্রযোজ্য নয়
এবং কোরামের
ধারণাও ওপিসির
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। বাংলাদেশী আইনেও ওপিসির জন্য
এমন শিথিলতা
আনা উচিত।
ওপিসির
শেয়ার হস্তান্তর: ওপিসির একমাত্র শেয়ারহোল্ডার ওপিসিতে তার সমুদয়
শেয়ার একসঙ্গেই কেবল হস্তান্তর করতে
পারেন। শেয়ার
কেবল একজন
প্রাকৃতিক ব্যক্তির কাছেই হস্তান্তর করা
যেতে পারে
এবং এ শেয়ার খণ্ডে
খণ্ডে হস্তান্তর করা যাবে না।
যদি ওপিসির
কোনো শেয়ারহোল্ডার তার শেয়ার হস্তান্তর করতে চান, তাকে
সম্পূর্ণভাবেই তা
করতে হবে
এবং তিনি
কেবল আরেকজন
একক ব্যক্তির কাছেই এরূপ হস্তান্তর করতে পারবেন। কোম্পানি আইনের ৩৮ নং
ধারা পরিষ্কারভাবে কোনো বিদেশীর কাছে
শেয়ার হস্তান্তরের নিয়মকানুন প্রণয়ন করে।
সুতরাং ওপিসির
শেয়ার বিদেশীদের কাছেও হস্তান্তর করা
যাবে।
কর: বাংলাদেশ সরকার
২০২১-২২
অর্থবছরে ওপিসির
প্রদেয় করের
হার আগের
৩২ দশমিক
৫ থেকে কমিয়ে
২৫ শতাংশ
করেছে। এর
উদ্দেশ্য হলো
মানুষ যেন
অধিক আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন না
করে সম্ভাবনাময় ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ
করতে পারে।
প্রতিপালন: অর্থবছর শেষ
হওয়ার ১৮০
দিনের মধ্যে
ওপিসির আর্থিক
বিবরণী রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দিতে
হবে। আইনগত
বাধ্যবাধকতা আছে
যে রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেয়ার
আগে একক
শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক
বিবরণীতে স্বাক্ষর করবেন।
উপসংহার: ব্যবসার বাহন
হিসেবে ওপিসি
বাংলাদেশে উদ্যোগের জন্য একটা বড়
সহযোগিতা হিসেবে
প্রণয়ন করা
হয়েছে। তা
সত্ত্বেও এর
‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ইনকরপোরেটেড’ হয়ে
ওঠার সম্ভাবনাও আছে। ওপিসির মূল
লক্ষ্য ছিলেন
দেশীয় উদ্যোক্তারা। কিন্তু বড় অংকের
পরিশোধকৃত পুঁজির
বাধ্যবাধকতার কারণে
সময়ের সঙ্গে
এটি দেশজ
ব্যবসায়ের প্রতি
অনুকূল বলে
প্রমাণিত হয়েছে।
আইন প্রণয়নের পরের এক বছরে
মাত্র তিনটি
ওপিসি নিবন্ধিত হয়েছে, এ তথ্য
ওপিসির সামনে
থাকা চ্যালেঞ্জের সাক্ষ্য দেয়। ওপিসি
এখনো একটি
শিশু উদ্যোগ,
এর সর্বোত্তম প্রয়োগ এখনো গড়ে
ওঠেনি। আইনের
ধূসর এলাকাগুলো ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কীভাবে
প্রয়োগ করা
হবে, সেটাই
দেখার।
মারুফ হাসান তমাল: কো-লিড (রিসার্চ
উইং)
এএস, অজ্ঝাসোসিয়েটস