(গতকালের পর)
গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দেশে-বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্র ঋণের মডেল অনুকরণ করে দারিদ্র্য বিমোচনের কাজে নিয়োজিত হতে উৎসাহিত করে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজে সাহায্যকারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো, যারা এর আগে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে সেবামূলক কাজ করত, তারাও একইভাবে আর্থিক সেবা দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বাজার অর্থনীতির যুগে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও এসব এনজিওকে স্বাবলম্বী হওয়ার তাগিদ দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু সমাজসেবামূলক কাজের উদ্দেশ্যে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সেবা দেয়ার জন্য আইনি বৈধতা ছিল না। তথাপি আশির দশকের শেষের দিকে বেশকিছু এনজিওকে ক্ষুদ্র ঋণ দিতে দেখা যায়, যা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিস্তার লাভ করে। সরকার এটাকে আর্থিক সেবা হিসেবে না দেখে জনকল্যাণমূলক সেবা হিসেবে দেখেছে, সে কারণে সরকারি তরফ থেকে এ কাজ কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়নি। বরং দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে তা উৎসাহিত হয়েছে। ২০০৬ সালের আগে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণের সেভাবে কোনো আইনি কাঠামো না থাকায় এসব এনজিও গ্রামীণ ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের তুলনায় এনজিওগুলোর ঋণের সুদের হারও বেশি ছিল। ফলে ১৯৯০-এর পর থেকে দেশের আনাচে-কানাচে অনেক ছোট-বড়, দেশী-বিদেশী, ভালো-মন্দ নানা রকম এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে আর্থিক বাজারে উপস্থিতি সবার নজরে আসে।
ক্রমাগত সবার কাছে ক্ষুদ্র ঋণ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার বলে গণ্য হতে থাকায় বিষয়টিতে চট করে কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। বরং, বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ চালু করার জন্য উৎসাহ দেয়া হতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও দেখা যায় ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে অথবা এনজিওদের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিতে। সরকারকে দেখা যায় তার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনা করতে। এভাবে ক্ষুদ্র ঋণ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সারা দেশে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ফলে এনজিওগুলো গ্রামীণ এলাকায় প্রান্তিক জনগণকে আর্থিক সেবা দেয়ার জন্য প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে একটি নতুন ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যদিও সংস্থাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক নাকি অপ্রাতিষ্ঠানিক সে অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছিল।
দেশী-বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর চিন্তার জগতে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সরকারও দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্র ঋণ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সঙ্গে জড়িত এনজিওগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এদের টেকসইতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছে। এরই ফলস্বরূপ সরকারের উদ্যোগে ও আর্থিক সহায়তায় মে ১৯৯০ সালে কোম্পানি আইনে ‘পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন’ বা পিকেএসএফ নামক একটি অলাভজনক এপেক্স আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভর্তুকি সুদে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ সম্প্রসারণে অর্থের জোগান দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও পিকেএসএফের মাধ্যমে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণে আর্থিক সহায়তা দেয়া সুবিধাজনক মনে করেছে। সম্ভবত দীর্ঘকাল ধরে দাতানির্ভর হয়ে চলা এনজিওগুলোর পক্ষে রাতারাতি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে এভাবে তাদের প্রাথমিকভাবে ভর্তুকি দিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটা একটা প্রক্রিয়া ছিল।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে পিকেএসএফের মাধ্যমে দেয়া এ সস্তা ঋণ আশা, টিএমএসএসসহ অনেক ছোট ছোট এনজিওকে ক্ষুদ্র ঋণে আকৃষ্ট করে, তুলনামূলকভাবে তৎকালীন এসব ছোট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বড় ও প্রতিষ্ঠিত এনজিও যেমন ব্র্যাক ও প্রশিকার মতো বাইরের অন্য কোনো উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পিকেএসএফ প্রায় ছয় হাজার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণের আবেদন পায়। ১৯৯০ সালের পর পিকেএসএফের মাধ্যমে সস্তায় তহবিল পেয়ে (প্রথমদিকে যা মাত্র ২ শতাংশ ছিল) এনজিওগুলো ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে গ্রামীণ ব্যাংকের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। পিকেএসএফ তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাছাই পদ্ধতি, তাদের দেয়া ঋণ আদায় তদারকি করার সুবিধার্থে যেসব নিয়ম-নীতি, গাইডলাইন চালু করে সেগুলোকে বলা চলে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রাথমিক উদ্যোগ। যদিও সব প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল না, যদিও সবাইকে পিকেএসএফের নিয়মনীতির আওতাধীন করার কোনো আইনি ভিত্তিও ছিল না, তবু বলা যায় যে পিকেএসএফের অর্থায়ন এবং প্রাথমিক নিয়মাবলি বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ক্রমান্বয়ে বাজারে হাজার হাজার এনজিও-ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব, তাদের কেউ কেউ দরিদ্র মানুষের সঞ্চয় নিয়ে রাতারাতি পালিয়ে যাওয়া, কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার প্রশ্ন, তাদের মধ্যে সুশাসনের অভাব ইত্যাদি বিষয় প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ নাগরিক ও নীতিনির্ধারকসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রয়োজন অনুভব করেন। সুনামধারী এনজিওগুলোও তাদের মর্যাদা রক্ষার্থে নীতিসহায়তার পক্ষে ছিল এবং দাতারাও তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল। কিন্তু কী ধরনের নীতিমালা, কার কাছে, কীভাবে এবং কতটুকু জবাবদিহিতা, কী প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়—এসব বিষয় স্পষ্ট হতে কয়েক বছর পার হয়ে যায়। উদীয়মান এ সেক্টরকে সরাসরি আর্থিক খাতের প্রচলিত নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসাও সম্ভব ছিল না। এর ক্ষতির দিকটি নিয়েও অনেকে চিন্তিত ছিলেন। তাছাড়া বিপুলসংখ্যক এনজিওর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িয়ে পড়ায় এক্ষেত্রে রাতারাতি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়াও সম্ভব ছিল না। ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের আইন তৈরির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল অনেক জটিল ও বিস্তৃত। সে কারণে বাংলাদেশে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কাজটি দীর্ঘ সময় নিয়ে ধাপে ধাপে করা হয়েছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এনজিওগুলোর দুটি মূল পার্থক্য রয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সিংহভাগ মালিকানায় রয়েছেন দরিদ্র নারীরা, তারাই ব্যাংকটির মালিক ও গ্রাহক। তারাই ব্যাংকটির সদস্য হওয়ার সময়ে ১০০ টাকার একটি শেয়ার নিয়ে পুঁজির বড় অংশের জোগানদাতা, যদিও তাদের মালিকানায় অধিকারের বিষয়টি আইনে অস্পষ্ট। পক্ষান্তরে, এনজিওগুলোর মালিকানা না সরকারি, না বেসরকারি। এনজিওগুলোর সম্পদ কারো ব্যক্তিগত বিনিয়োগ থেকে হয়নি, তা দিয়েছে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, কিংবা দেশীয় সরকার বা সংগ্রহ করা হয়েছে গ্রাহকদের সঞ্চয় অথবা উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে। সে কারণে এনজিওগুলোর সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিকে আমলে নেয়া হলে এ সম্পদকে বলা যায় ‘সীমিত আকারের সর্বজনভোগ্য দ্রব্য বা সামাজিক ব্যবহারের দ্রব্য’। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ব্যাংক আইনসম্মতভাবে জনগণের আমানত সংগ্রহে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হলেও এনজিওগুলোর সে ধরনের কোনো অনুমোদন নেই। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে, এনজিওগুলো তাদের গ্রাহকদের ঋণ দেয়ার শর্ত হিসেবে যে সঞ্চয় সংগ্রহ করে, তাকে সঞ্চয় আমানত বলা যাবে কিনা? এনজিওগুলোর এ সঞ্চয় আমানত বিষয়টি নিয়ে ২০০৬ সালের আগে রাষ্ট্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যার অনুপস্থিতিতে এ নিয়ে বাজারে বিতর্কের সূচনা হয় প্রথম থেকেই।
এ ধরনের আরো অনেক বিষয় অস্পস্ট থাকায় মানুষের মনে এনজিওগুলোর কার্যক্রম নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সে রকমের একটি শব্দ হলো ‘সদস্য’। সমবায় সমিতি বা গ্রামীণ ব্যাংকের ‘সদস্য’ এবং এনজিওগুলোর ‘সদস্য’ শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহার হলেও এর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটির ক্ষেত্রে সমবায়ের ‘সদস্য’ হওয়ার সঙ্গে মালিকানার সম্পর্ক রয়েছে। এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে উপকারভোগীদের ‘সদস্য’ না বলে ‘গ্রাহক’ বলা হলে এ বিভ্রান্তি দেখা দিত না। সে কারণে এনজিওগুলো যখন থেকে নানা নামে তাদের তথাকথিত ‘সদস্য’দের সঞ্চয় আমানত সংগ্রহের দিকে ঝুঁকতে থাকে তখন থেকেই এ সঞ্চয় আমানতের সুরক্ষার বিষয়টি আলোচনায় আসতে থাকে এবং বিষয়গুলোর আইনি সমাধানের প্রশ্নও সামনে চলে আসে।
প্রাথমিকভাবে সরকার ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে প্রধান করে একটি কমিটির কাছে এসব ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা যায় সে পরামর্শ চায়। পরবর্তী সময়ে এ কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপায় বের করার দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতাধীন এমআরআরইউ (মাইক্রোফাইন্যান্স রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেন্স ইউনিট) নামক একটি ইউনিটকে। যদিও এনজিওগুলো ও দাতারা এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল। সরকার এমআরআরইউকে এ কাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করে। প্রথম তিন বছরে ইউনিটটি বাংলাদেশে কার্যরত সব এনজিও-মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে, তাদের ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, হিসাব ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি একক প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনার কাজটি শুরু করে। যদিও তখন পর্যন্ত কোনো আইন তৈরি হয়নি। এ কার্যক্রমকে বলা যায় ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দ্বিতীয় ধাপ। পরবর্তী সময়ে এমআরআরইউর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সমঝোতা করে একটি গ্রহণযোগ্য আইনি কাঠামোর খসড়া তৈরি করতে এ কমিটির আরো প্রায় দুই বছর লেগে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে প্রচলিত ব্যাংকিং আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয় সেটি ক্ষুদ্র ঋণ এবং তাদের আর্থিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোসহ অন্যদের কাছে স্পষ্ট হলেও তাদের কাছে বড় প্রশংসা ছিল কে হবে এদের নিয়ন্ত্রণকারী? তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে দেখতে প্রস্তুত ছিল না। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ক্ষুদ্র ঋণ এবং তাদের আর্থিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রবল আপত্তি উথাপন করা হয়। অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় সরকার ২০০৬ সালে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ভিন্ন একটি আইন (মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি অ্যাক্ট, ২০০৬) পাস করার মাধ্যমে ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি বা এমআরএ’ নামক আলাদা একটি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা তৈরি করে। বিশ্বে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটিই প্রথম।
এমআরএ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম জরুরি কাজ ছিল আইন পাসের আগে কার্যরত সব এনজিও-ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে বৈধতা দেয়া। এর পরের কাজটি ছিল তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিস্তারিত রেগুলেশন তৈরি করা (মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি রেগুলেশন, ২০১০), যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠুভাবে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। গ্রামীণ ব্যাংককে দেয়া সরকারের আইনি সহায়তা একটি উদীয়মান প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণের ভাবমূর্তি তৈরিতে সহায়তা করেছে। ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা তৈরির প্রাক্কালে একটি একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে সরকারের যথেষ্ট দরকষাকষির সুযোগ ছিল। অন্যদিকে ২৩ বছর পর এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণকে আইনি বৈধতা দেয়ার সময়ে সরকারের দরকষাকষির সুযোগ অনেক কম ছিল। সেখানে এনজিওগুলোর মালিকানায় অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। বরং নীতিমালা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালা এমনভাবে করা হয়েছে যেন তাদের চলমান কার্যক্রম কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়। এনজিওগুলো চাইছিল সরকারের নীতিসহায়তা নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চয় সংগ্রহ করে স্বাবলম্বী হতে। বিশ শতকের গোড়ায় প্রায় হাজার খানেক এনজিওর সঙ্গে কয়েক কোটি মানুষের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এসব প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিতকে অনেক মজবুত করেছিল। বাজার অর্থনীতির যুগে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের সামাজিক পুঁজিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করারও অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছিল।
তাই এদের জন্য সহনীয় নীতিমালা তৈরি এবং তা বাস্তবায়ন করতে নিয়ন্ত্রণকারী অথরিটির কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। নতুন নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি এনজিওগুলোর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও সরকারের জনস্বার্থমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমঝোতা থেকে উদ্ভূত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান। অতএব অথরিটিকে আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নে সবসময় এ দুটো দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। এ ভারসাম্য়ের ওপর নির্ভর করছে এ খাতটির ভবিষ্যৎ ও মানুষের কল্যাণ। অথরিটির নীতিমালায় এবং তা বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে এসবের প্রতিফলন লক্ষণীয়।
সবশেষে বলা যায়, ক্ষুদ্র ঋণের প্রতি সরকারের আইনি স্বীকৃতি এ খাতকে বৈধতা দিয়ে মানুষের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে। এ আইনি ব্যবস্থা খাতটিকে কিছুটা হলেও সুসংহত করেছে, সংগঠিত করেছে, যা আগে অনুপস্থিত ছিল। এর মাধ্যমে সেক্টরে বড় ধরনের তিনটি পদক্ষেপ নেয়া আংশিক হলেও সম্ভব হয়েছে। সেগুলো হলো:
১. প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুশাসনের চর্চা করার পরিবেশ তৈরি, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ভেতর কয়েকজন ব্যক্তির প্রাধান্যকে একটি করপোরেট বডির মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা, যদিও এ চেষ্টা সম্পূর্ণ সার্থক করা যায়নি, এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যক্তি ও পরিবারের আধিপত্য বজায় রয়েছে।
২. এনজিওগুলোর অবাধ আমানত সংগ্রহের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করে এর অব্যবস্থাপনা দূর করা ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ এবং
৩. সুদের হারের নীতিমালা প্রবর্তন করে এ হারের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ ও আগের অগ্রহণযোগ্য গণনা পদ্ধতি বাতিল করা। যদিও এখন পর্যন্ত এদের সুদের হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় বেশি, তবে তা মহাজনি ঋণের সুদের হারের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ২০ শতাংশ এবং এনজিওগুলোর ২৪ শতাংশ। (শেষ)
লীলা রশিদ: অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠাকালীন সাবেক পরিচালক, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি