সাম্প্রতিক নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণখেলাপি—বিষয়টি জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি করেছে তা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক ঝুঁকির প্রশ্ন। তার ওপর গত এক দশকে ব্যাংক খাতে বড় আকারের ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা, বিশেষ করে বেশকিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের ব্যাংক থেকে নজিরবিহীন লুটপাট ও সম্পদ পাচার এবং শেষ পর্যন্ত ঋণ অপরিশোধের যে মহামারী পর্যায়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটি অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে শুধু দুর্বলই করেনি, বরং সমগ্র অর্থ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। এ প্রেক্ষাপটে একজন ব্যবসায়ী-ব্যাকগ্রাউন্ডসম্পন্ন এবং সুপরিচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
প্রথমত, আস্থার প্রশ্নটি বোঝার জন্য আমাদের অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। ব্যাংক খাতের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস—আমানতকারী বিশ্বাস করেন তার অর্থ সুরক্ষিত, ঋণদাতা বিশ্বাস করেন চুক্তি মানা হবে এবং বাজার বিশ্বাস করে যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। যখন বড় ঋণগ্রহীতারা প্রভাবের কারণে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যেতে পারেন এবং সেটি কার্যত একটি ‘প্রত্যাশিত আচরণ’-এ পরিণত হয়, বিশেষ করে দায়বদ্ধতাহীন পরিবেশে, তখন পুরো সিস্টেমে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। এর অর্থ হলো যারা নিয়ম মানেন তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন, আর যারা নিয়ম ভাঙেন তারা সুবিধা পান। এতে সম্পদের দক্ষ ও যথাযথ বণ্টন ব্যাহত হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রবৃদ্ধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের ভূমিকা কেবল মুদ্রানীতি প্রণয়ন নয়; বরং আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। একজন ব্যবসায়ী-ব্যাকগ্রাউন্ডসম্পন্ন গভর্নর নিয়োগ এক ধরনের বড় রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করছে। বিশেষ করে এখন গভর্নরের দায়িত্ব নিছক একটি স্বাভাবিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেয়া নয়, বরং ক্রাইসিস ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা, দৃঢ় সংকল্প ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই তিনি ব্যবসায়ী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা প্রথম গভর্নর নন, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে বিবেচনা করলে বুঝতে কঠিন হওয়ার কথা নয় যে কেন প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং পর্যবেক্ষকরা এ সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপারে আস্থা পুনর্গঠনে বড় রকমের ঝুঁকি বলে মনে করছেন।
নতুন গভর্নর এখানে দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন। একদিকে তার বাজার অভিজ্ঞতা একটি সম্পদ—তিনি জানেন ব্যবসা কীভাবে কাজ করে, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা কোথায়, তারল্যের সংকট কেমন প্রভাব ফেলে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং এ রকম মুখ্য নিয়ন্ত্রক, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যে ধরনের পেশাজীবিতা ও মানসিকতা দরকার তার সঙ্গে লাভমুখী ব্যবসায়ী মনমানসিকতা অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক হতে পারে। অন্যদিকে যদি তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বা অতীত নিয়ে প্রশ্ন থাকে তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছেন না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রতীক। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি স্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে স্বার্থ-সংঘাত এড়ানোর নীতি, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর অবস্থান এবং তদারকি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।
এক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত দিক হলো গত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যেসব সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেমন ঋণ পুনর্গঠন ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত পদক্ষেপ, তাদের কার্যকারিতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আস্থার সংকট কাটানোর পরিবর্তে শুরুতেই তা আরো ঘনীভূত হওয়া এড়াতে নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেতৃত্বকে এ উদ্যোগগুলোর ওপর স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান ঘোষণা প্রাসঙ্গিক হবে—যে পদক্ষেপগুলো কার্যকর এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রাসঙ্গিক, সেগুলো অব্যাহত রাখা হবে; আর কোনো প্রক্রিয়াগত বা নীতিসংক্রান্ত শিথিলতা হবে না। এটি বাজারের জন্য একটি শক্তিশালী আস্থার বার্তা হিসেবে কাজ করবে যে সংস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার ওপর দৃষ্টি রাখছে, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক চাপ নয়।
এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক নীতি প্রাসঙ্গিক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিজেই একটি নীতি উপকরণ। যদি বাজার বিশ্বাস করে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাহলে প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতি কম থাকে, মজুরি ও দামের আচরণ সংযত হয় এবং বাস্তব সুদের হার কার্যকর থাকে। বিপরীতে যদি মনে হয় যে নীতি সিদ্ধান্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে নেয়া হচ্ছে, তাহলে প্রত্যাশা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ফলে নতুন নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষা হবে—তিনি কি প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে নীতিনির্ভরতায় নিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ এবং পারবেন?
প্রাসঙ্গিকভাবেই, যেভাবে সাবেক গভর্নর ড. আহসান মনসুরকে বিদায় নিতে হলো এবং সেই সঙ্গে তার উপদেষ্টা ও কিছু কর্মকর্তাকে যেভাবে ‘মব’সম অবস্থা তৈরি করে বের করা হলো, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো পেশাদার, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের জন্য আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে এক্ষেত্রে দলীয়করণের নতুন ধারার যে আভাস ফুটে উঠেছে এবং ফলে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেছে, তা পর্যবেক্ষকদের অবশ্যই ভাবিয়ে তুলবে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অপেশাদার আচরণ সংস্কৃতিতে পরিণত হলে ভবিষ্যতেও যেকোনো গভর্নরের ক্ষেত্রেই অনুরূপ হতে পারে।
এখন আসা যাক পলিসি সুদের হার হ্রাসের প্রশ্নে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি। অর্থশাস্ত্রীয়ভাবে, যখন মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকে, তখন সাধারণ নীতি-প্রতিক্রিয়া হলো সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা সংকুচিত করা। এতে ঋণগ্রহণ ব্যয়বহুল হয়, ভোগ ও বিনিয়োগ কমে এবং সামষ্টিক চাহিদা কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ হ্রাস পায়। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি পাঠ্যবইয়ের সরল রেখা অনুসরণ করে না। যদি মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহপক্ষীয়—যেমন আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি বা খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি—তাহলে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয় না। আবার দীর্ঘদিন উচ্চ সুদের হার বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কর্মসংস্থান কমতে পারে এবং অর্থনীতি স্থবিরতার দিকে যেতে পারে।
সুতরাং প্রশ্নটি সাদা-কালো নয়; এটি ভারসাম্যের। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে যে চাহিদা এরই মধ্যে যথেষ্ট সংকুচিত এবং অর্থনীতি বিনিয়োগ সংকটে ভুগছে, তাহলে সীমিত ও সতর্কভাবে সুদের হার হ্রাসের যুক্তি থাকতে পারে। তবে এ পদক্ষেপের ঝুঁকি হলো—যদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এরই মধ্যে উচ্চ থাকে, তাহলে সুদের হার কমানোর সংকেত বাজারে ‘সহনশীলতা’র বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে, যা মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং আমদানি ব্যয় আরো বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষত একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বিনিময় হার ও সুদের হার নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহল যারা একটি দেশের সঙ্গে আর্থিক পর্যায়ে মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পৃক্ততা রাখেন, তাদের আস্থার ব্যাপারটাও প্রাসঙ্গিক।
অতএব, সুদের হার হ্রাসের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব হতে পারে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে গতি, ব্যবসায়িক আস্থা বৃদ্ধি এবং ঋণগ্রহণে স্বস্তি। সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক হতে পারে মূল্যস্ফীতি পুনরায় ত্বরান্বিত হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং নীতি-সংকেতের ভুল ব্যাখ্যা। এ দ্বিমুখী বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পলিসি কমিউনিকেশন। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার হ্রাস করে, তবে সেটি একটি সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে করা প্রয়োজন—কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কোন সময়সীমার জন্য এবং কোন শর্তে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে—এসব স্পষ্ট করা জরুরি। এতে বাজার বুঝতে পারে যে সিদ্ধান্তটি স্বল্পমেয়াদি চাপের ফল নয়; বরং তথ্যসমর্থিত কৌশলগত পদক্ষেপ।
সবশেষে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তিনটি মৌলিক লক্ষ্য স্পষ্ট: স্থিতিশীলতা, গতিশীলতা এবং আস্থা। স্থিতিশীলতা মানে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের নিয়ন্ত্রণ; গতিশীলতা মানে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ; আর আস্থা মানে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়সংগততা ও নীতি ধারাবাহিকতা। এ তিন লক্ষ্য একে অন্যের পরিপূরক, কিন্তু সঠিক ভারসাম্য ছাড়া এ লক্ষ্যগুলো সাংঘর্ষিকও হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব হবে এ ভারসাম্য রক্ষা করা—ব্যবসায়ী স্বার্থকে স্বীকৃতি দেয়া, কিন্তু জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া; প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা, কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে অবহেলা না করা; রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়া, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখা।
সমালোচনা বা সমর্থনের আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বলা যায়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। যদি নতুন নেতৃত্ব নৈতিক ঝুঁকি কমাতে, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোরতা প্রদর্শনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং তথ্যনির্ভর স্বচ্ছ মুদ্রানীতি পরিচালনায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেন, তবে আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব। এক্ষেত্রে যদি এ নতুন নিয়োগ কার্যকারিতায় সফল হয়, তা বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রশংসিত করবে। অন্যথায় বা বিপরীত হলে এই একটি সিদ্ধান্তই নতুন সরকারকে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় রকমের সংকটে ফেলতে পারে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রত্যাশা থাকবে—প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি জনগণের আস্থাও অর্জন করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, গতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরে আসুক—এটাই সবার শুভকামনা বর্তমান গভর্নরের জন্য এবং দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বের জন্য।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা