কভিড-১৯

হার্ড ইমিউনিটির এপাশ-ওপাশ

[গতকালের পর] বিবেচনা করা যাক দ্বিতীয় উপায় অর্থাৎ সফল ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি কার্যকর করার বিষয়। যেকোনো সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা জোগাতে ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে এরই মধ্যে বেশকিছু সংক্রামক রোগ, যেমন ফ্লু, হাম, বসন্ত, ইবোলা ইত্যাদির বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মানবেতিহাসে SARS-CoV-2 দ্বারা ঘটিত কভিড-১৯ রোগটি মানুষ প্রথমবারের মতো মোকাবেলা করছে। প্রথম শনাক্ত থেকে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি চূড়ান্ত কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন। তাই বলে থেমে নেই বিজ্ঞানের যাত্রা, বসে নেই গবেষণা। আন্তর্জাতিক গবেষক দল একাট্টা হয়ে মহামারী সৃষ্টিকারী এই একটি মাত্র রোগ থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচানোর তাগিদে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে এরই মধ্যে ১০৮টির অধিক কভিড-১৯ ভ্যাকসিন পরীক্ষাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আটটিকে চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে বেশ ঢাকঢোল বাজিয়েই। চলছে অধীর অপেক্ষা। আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) পর্যন্ত কভিড-১৯ জরুরি পরিস্থিতিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিধি সাময়িক শিথিল করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এতসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন মানুষের হাতে পৌঁছতে নিদেনপক্ষে আরো কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেখা মিলবে বহুল প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিনের। অস্ট্রেলিয়ান রোগতত্ত্ববিদ Gideon Meyerowitz-Katz-সহ অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতে, কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেই কেবল আমরা হার্ড ইমিউনিটির কথা সক্রিয়ভাবে ভাবতে পারব, তার আগে কোনোভাবেই নয়। কার্যকর হার্ড ইমিউনিটি সফল করতে আমাদের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার বিকল্প নেই।

[গতকালের পর]

বিবেচনা করা যাক দ্বিতীয় উপায় অর্থাৎ সফল ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি কার্যকর করার বিষয়। যেকোনো সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা জোগাতে ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে এরই  মধ্যে বেশকিছু সংক্রামক রোগ, যেমন ফ্লু, হাম, বসন্ত, ইবোলা ইত্যাদির বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মানবেতিহাসে SARS-CoV-2 দ্বারা ঘটিত কভিড-১৯ রোগটি মানুষ প্রথমবারের মতো মোকাবেলা করছে। প্রথম শনাক্ত থেকে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি চূড়ান্ত কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন। তাই বলে থেমে নেই বিজ্ঞানের যাত্রা, বসে নেই গবেষণা। আন্তর্জাতিক গবেষক দল একাট্টা হয়ে মহামারী সৃষ্টিকারী এই একটি মাত্র রোগ থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচানোর তাগিদে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে এরই মধ্যে ১০৮টির অধিক কভিড-১৯ ভ্যাকসিন পরীক্ষাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আটটিকে চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে বেশ ঢাকঢোল বাজিয়েই। চলছে অধীর অপেক্ষা। আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) পর্যন্ত কভিড-১৯ জরুরি পরিস্থিতিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিধি সাময়িক শিথিল করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এতসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন মানুষের হাতে পৌঁছতে নিদেনপক্ষে আরো কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেখা মিলবে বহুল প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিনের। অস্ট্রেলিয়ান রোগতত্ত্ববিদ Gideon Meyerowitz-Katz-সহ অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতে, কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেই কেবল আমরা হার্ড ইমিউনিটির কথা সক্রিয়ভাবে ভাবতে পারব, তার আগে কোনোভাবেই নয়। কার্যকর হার্ড ইমিউনিটি সফল করতে আমাদের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার বিকল্প নেই।

এখন প্রশ্ন, কার্যকর ভ্যাকসিন হাতে আসা পর্যন্ত এ সময়টা আমরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? এর উত্তর খুব সোজা, ‘অবশ্যই না।’ তাহলে করণীয়টা কী? পাঠক বন্ধুদের নিশ্চয়ই সংক্রামকতার পরিমাপক R0-এর কথা মনে আছে? কোনো একটি রোগের জন্য R0-এর মান সময় ও স্থানের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। R0-এর মান কমিয়ে আনার অর্থ আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বারা নতুন সংক্রমিত লোকের গড় সংখ্যা কমে যাওয়া এবং এর ফলে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ডও কমে যাবে। রোগতত্ত্ববিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এমন প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে R0-এর মান হ্রাস পায়।

R0-এর মান কমানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনসহ অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞরা বেশকিছু কৌশল বাতলে দিয়েছেন। কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো:

১. ‘সামাজিক দূরত্ব’ বা ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখা: এর মাধ্যমে আমাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা লোকের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। বেশি বেশি বাড়িতে থাকা এবং ভিড় এড়িয়ে চলা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অন্যতম কৌশল। ২. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: এর মাধ্যমে নিজেকেসহ সংস্পর্শে আসা লোকদের সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ কমিয়ে আনা হয়। যেমন ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করা, কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা ইত্যাদি। ৩. আইসোলেশন: এর মাধ্যমে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তিদের সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে আলাদা করা হয়। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া বাধাগ্রস্ত হয়।

কভিড-১৯-এর সামগ্রিক সংক্রমণের লাগামহীন গতি মন্থর করতে প্রায় গোটা বিশ্বেই সামাজিক লকডাউন জারি করা হয়েছে। এতে মানুষে মানুষে শারীরিক যোগাযোগ কম হওয়ায় রোগ ছড়ানোর সুযোগ অনেক কমে যায়। কভিড-১৯-এর সূতিকাগার চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া এরই মধ্যে কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণ অনেকটাই দমিয়ে দেয়ার ফল ঘরে তুলেছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় মহামারী ঠেকাতে বাংলাদেশেও চলছে সাধারণ ছুটি এবং লকডাউন। দ্রুত লকডাউনের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ উপকৃত হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস। নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর লকডাউনের যেমন সুফল আছে, তেমনি এই অচলাবস্থার কারণে লাখো কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। এ কারণেই করোনার প্রকোপ শেষ না হতেই ক্রমে লকডাউন ওঠাতে শুরু করেছে কিছু দেশ। এ নিয়ে বিতর্কও চলছে যথেষ্ট। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছ থেকেও দাবি উঠছে লকডাউন তুলে নেয়ার। কিন্তু আশঙ্কার কথা, এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সফল কোনো প্রতিষেধকও আবিষ্কৃত হয়নি ভাইরাসটি রুখতে। তবে আশার কথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এফডিএ কভিড-১৯ রোগীর গুরুতর শ্বাসকষ্টে ‘রেমডেসিভির’ প্রয়োগের জরুরি অনুমোদন দিয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশেও দেশীয় আটটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেমডেসিভির উৎপাদনের অনুমোদন নিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে। এই ওষুধ উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে জাপানও। কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার হলে লকডাউন তুলে নিলেও ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমবে।

প্রতিষেধক অথবা প্রতিরোধকের (ভ্যাকসিন) একটিও হাতে না পেয়ে লকডাউন সম্পূর্ণভাবে তুলে নিলে ব্যাপক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই বলে কি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে এই লকডাউন? না, সেক্ষেত্রেও অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। আছে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষুধা আর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা। এমনকি খুব দ্রুত সময়ে যদি কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত না হয়, তবে গবেষণা চালিয়ে নেয়ার তহবিলেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে ধীরে চলো নীতিই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এক্ষেত্রে লকডাউন হুটহাট করে একবারে সম্পূর্ণ না তোলে, সীমিত আকারে শিথিল করে এর ইম্প্যাক্ট পর্যবেক্ষণ করতে হবে। লকডাউন সীমিত বা সম্পূর্ণ তুলে নেয়া কিংবা এর বদলে সহনীয় কোনো বিকল্প তৈরির ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আরো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নেয়া দরকার বিশেষজ্ঞ মতামত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত অধিক ফলপ্রসূ হবে। যে জনগণের জীবন রক্ষার জন্য এত সব প্রচেষ্টা, সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে তাদেরকেও। রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো সক্রিয়ভাবে মেনে চলতে হবে। মেনে চলতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনসহ স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলি। আমরা আশাবাদী যে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কভিড-১৯-এর কার্যকরী প্রতিষেধক এবং/অথবা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হবে। ভ্যাকসিন প্রয়োগে একবার হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হওয়া মাত্র আমরা সাধারণ জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারব। আর তখনই আমাদের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই ভয়াবহ কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষিত হবে। তার আগে অজানা পরিণতির অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না কিছুতেই। [শেষ]

 

ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান: অধ্যাপক, ফার্মেসি ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও