বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান নিম্নমুখী চাপের সূত্রপাত হয়েছিল কভিড মহামারীর আগেই। কভিড মহামারী কেবল বিদ্যমান কাঠামোগত ফাটল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতাকে উন্মুক্ত করে তুলে ধরেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
মহামারী শুরু হওয়ার আগে থেকেই বাংলাদেশ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। দারিদ্র্য বিমোচন এরই মধ্যে ধীর হতে শুরু করেছিল। দেশের প্রবৃদ্ধি হলেও তার সাথে কর্মসংস্থান বাড়ছিল না। শ্রমের তুলনায় মূলধনের ওপর উচ্চতর রিটার্নের কারণে বৈষম্যও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সমতার পরিমাপ হিসেবে ব্যবহৃত জিনি সহগ সূচকের মান ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ৪৮২, ২০১০ সালে শূন্য দশমিক ৪৫৮ ছিল। বিষয়টি আসলেই উদ্বেগজনক। ধনীদের শীর্ষ ৫ শতাংশ দেশজ মোট আয়ের ৯৫ শতাংশ দখল করে রেখেছে। এখন শূন্য দশমিক ৪৯৯; খুবই উদ্বেগজনক।
মহামারী সমাজের প্রান্তিক অংশের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, বয়স্ক, বেকার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার অনুপস্থিতিতে, মূল্যস্ফীতির চাপে অনেককেই প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়েছেন, যা বাধ্য করেছে পুষ্টির মাত্রা কমাতে। কেউ কেউ আবার চিকিৎসা ও শিশুদের শিক্ষার মতো বিষয়েও ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাত বেড়েই চলছে। বিশিল্পায়নের মধ্য দিয়ে এই অনানুষ্ঠানিকীকরণের উৎপত্তি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক খাতে, বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা কমে গেছে। তদুপরি রফতানি একটি খাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে ও আরো ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
দূরদর্শিতার অভাব জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। মৌলিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য আমদানিনির্ভরতা, গ্যাস উত্তোলনের অভাব, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে ধীর অগ্রগতি এবং উচ্চ ভাড়া উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা সত্ত্বেও ট্রান্সমিশন সিস্টেমে অপর্যাপ্ত পরিমাণের বিনিয়োগের কারণে এ খাতটি তাৎক্ষণিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারছে না।
সবুজ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে কৃষিতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেনি। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সারের বাজারও অস্থিতিশীল। ঋণ পরিশোধে সেরা ট্র্যাক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের অর্থায়ন প্রয়োজন। প্রচলিত ভূমি সংস্কার এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের নীতি ক্ষুদ্র অর্থনীতির বৈষম্য এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত জবরদস্তি ও দুর্দশার পটভূমিতে অকার্যকর। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেও অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। আর সেবা খাত দক্ষ জনবলের চরম ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে।
১২ বছরের মধ্যে গত মে মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির যুক্তি ছিল দুটি: কভিডকাল ও ইউক্রেন যুদ্ধ। এই দুটি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্বাভাবিক হয়ে এলে এখানেও স্বাভাবিক হবে। অনেক দিন ধরে তেলের দাম স্বাভাবিক হয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭০-৮০ ডলারে নেমে এসেছে, কিন্তু দাম কমেনি। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত যে আটটা পণ্যের দাম ঠিক করে দেয়া হয়েছিল, সেখানেও দাম কমেনি। এবারে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে যেসব দেশের উত্তরণ ঘটেছে, যেমন ইউরোপে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; সেখানে রাষ্ট্র বড় ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই ভূমিকাটা রাখতে পারছে না। তার সেই সক্ষমতা নেই। কারণ এই রাষ্ট্রের যে কর কাঠামো, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ কর সংগ্রহের যে ক্ষমতা, তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিচে; আফগানিস্তানেরও পরে। একদম তলানিতে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই তার দেনা পরিশোধ করতে পারছে না। যেমন পারছে না জ্বালানির ক্ষেত্রে। এখানে তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় অবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র আরো ঋণ নিচ্ছে। ঋণ নিতে চেয়েছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। কিন্তু দেখা গেল, ব্যাংকগুলো অক্ষম। তখন ঋণ নিতে গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তখন টাকা ছাপাতে হচ্ছে। পত্রিকান্তরে জানা যাচ্ছে, যে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ছাপানো হয়েছে; এখানে অর্থের গুণপ্রবাহ ৫ গুণ বলে, আসলে তা দাঁড়াচ্ছে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার মতো। এটা মূল্যস্ফীতি আরো উসকে দিচ্ছে। তার মানে, রাষ্ট্রের সক্ষমতার অভাবের কারণেও আরেকবার মূল্যস্ফীতি ঘটছে। এর ফলে, জীবনযাত্রায় বড় রকমের হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
গত সাড়ে সাত বছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ করতে হয়েছে। ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত ৪২ বিলিয়ন ডলার। এখন তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে, বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য থাকছে না। ঋণ পরিশোধ ও সুদ টানতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে দিন দিন ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বৈদেশিক রিজার্ভ কমছে। বেসরকারি ঋণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এগুলোতে আবার সভরেইন গ্যারান্টি দেয়া আছে। শেষ বিচারে এগুলো রাষ্ট্রেরই দায়। সে কারণেই মাথাপিছু ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশ যখন আইএমএফের অধীনে যায়, তখন ধরে নেয়া হয়; সেখানে একটা অব্যবস্থাপনা ছিল। মুডি’স রেটিংয়ে ব্যাংকিংয়ের মানের অবনমন সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে সাতটা ব্যাংকের ঋণমান অবনমন করা হয়েছে। পাশের দেশের একটা ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের একটা ব্যাংক বলেছে, ঋণমান অবনমনের কারণে বাংলাদেশে ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেশি।
২০১৪ সালে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ছিল ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৪২ শতাংশ। ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে গেছে। মাথাপিছু ঋণ আগে ২৫৭ দশমিক ৪৭ ডলার ছিল। এখন ৫৫৭ দশমিক ৫৯ ডলার। স্বল্পমেয়াদি ঋণ আগে ছিল ২৩ শতাংশ; তা এখন ৩০ শতাংশ। অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ঘাটতি । বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থামানো যাচ্ছে না। এ কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়েছে। একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। প্রথমত, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা দরকার ছিল। বিপরীতে সেটা কাটছাঁট করা হচ্ছে। কারণ তহবিলে অর্থ নেই। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ জোগান দেয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ স্থবিরতায় কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। এই চারটি নিয়ে দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। তার ফলে সমাজের ভাঙন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ বলেছে, শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের ৫১ শতাংশই নতুন করে গরিব হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
কর-জিডিপি অনুপাতের উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। দেশকে আরো বেশি ঋণ গ্রহণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১ ট্রিলিয়ন টাকার ওপরে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ায় মুদ্রিত অর্থ বাজারে প্রবেশ করছে। ভোক্তা মূল্যের মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। এরপর মূলধনি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কিছু প্রকল্প ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা হয়ে উঠেছে। মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ে মন্থরগতির প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোগ করের সামান্য সংযোজন হয়েছে। আমদানি কঠোর হওয়ার সঙ্গে আমদানি শুল্ক আদায় কমতে শুরু করেছে এবং ব্যাংকগুলোয় বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের জন্য আন্ডার রাইট করছে লেটার অব ক্রেডিট।
যখন পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, তখন কর ফাঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাণিজ্যে উচ্চ তীব্র মাত্রার কারণে এটি ঘটে। ওভার-ইনভয়েসিং আকারে অর্থ পাচারের খবর পাওয়া গেছে। ব্যাপক কর ফাঁকি রোধে সরকারের রাজস্ব অর্জনের সর্বোত্তম উপায় হলো কর সংস্কার কর্মসূচির ওপর দৃষ্টি দেয়া। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের এক নম্বর উৎস হিসেবে আয়কর থেকে আদায়ের অনুমোদিত লক্ষ্য অর্জন করা সবচেয়ে জরুরি।
আর্থিক খাত বেশ কিছুদিন ধরেই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই খেলাপি নয়, কিন্তু নন-পারফর্মিং ঋণের সিংহভাগ গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে। অনেক সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও বৃহৎ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ পুনরুদ্ধার করা এখনো সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রবেশ তো আছেই। এজন্যই গত ১০ বছরে দেশে নন-পারফর্মিং ঋণের পরিমাণ বেড়েছে তিন গুণ।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করেছিল। পতন ঠেকানোর জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায় রিজার্ভ কমছে। গত বছরের মার্চে ৪৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ২৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ বাদ দেয়ার পর নিট রিজার্ভ দিয়ে সর্বোচ্চ আমদানি তিন মাস পর্যন্ত চালাতে পারবে।
নিম্নগামী চাপের মূল কারণসমূহ রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে জড়িত। জীবনযাত্রার সংকট, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতাই হলো বড় তিন চ্যালেঞ্জ। এসবের কারণে উন্নয়নের মডেল মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন আর বাংলাদেশ মডেল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। আলোচনা রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে মোড় নিচ্ছে ।
কোনো দেশ পৃষ্ঠপোষকমূলক-ক্লায়েন্ট রাজনীতির দ্বারা আবর্তিত হলে বাহ্যিক ধাক্কা সহ্য করতে পারে না। রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বেশির ভাগ মানুষের জন্য না হলে পৃষ্ঠপোষকমূলক-ক্লায়েন্ট শেকড় জন্মায়। ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের সেবা প্রদানে পিছিয়ে পড়ে এবং একটি নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণাটি সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন