দেশে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী পড়াশোনার খরচ অভিভাবকদের কাছ থেকে নিয়ে থাকেন। অভিভাবকনির্ভর এসব শিক্ষার্থীর কারো কারো স্নাতক-স্নাতকোত্তর করতে ২৭ বছর শেষ হয়ে যায়। সীমাহীন কষ্ট নিয়ে পড়াশোনা করা একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে নিজের একটা পরিচয় গড়ার, ভালো একটি চাকরি নেয়ার। চাকরির জন্য তার দিকে চেয়ে থাকে সমাজ, পরিবার কিংবা প্রিয়তম কেউ।
পড়াশোনা শেষে একজন শিক্ষার্থী চাকরিতে ঢুকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দিন, মাস, বছর শেষ হয়ে যায়, চাকরি যুদ্ধে লড়তে লড়তে অনেকে বয়স শেষ করে ফেলেন। কপালে আর কাঙ্ক্ষিত চাকরি জোটে না।
জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি ২০২০ (খসড়া)-এর তথ্যানুসারে, দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ তরুণ নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এ উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
‘বিশ্বজুড়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রবণতা ২০২২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জানিয়েছে, মহামারীর ধাক্কায় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। আইএলওস্ট্যাট এক্সপ্লোরারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ মুহূর্তে বাংলাদেশী তরুণদের (১৫-২৪) বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। বলা হয়েছে, কভিড-১৯-এর কারণে তরুণদের বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। করোনার আগে এ হার কিছুটা কম ছিল।
বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ঠিক কত সেটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইএলওর নিয়মে, কোনো ব্যক্তি সপ্তাহে একদিন ১ ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে তাকে বেকার ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বেকার সংখ্যা চার লাখের বেশি। অবশ্য বিবিএসের এ পরিসংখ্যান করোনার আগের। স্বাভাবিকভাবে করোনা-পরবর্তী এ হার কয়েক গুণ বেড়েছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তা অনলাইনে প্রকাশিত ‘সরকারি চাকরি: কিছু পদ শূন্য, আবার কোথাও অতিরিক্ত জনবল’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন গ্রেডে বেসামরিক জনবলের মোট শূন্য পদের সংখ্যা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫টি। এটি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সুখবর হলেও প্রশ্ন থাকে, এত বেকারের দেশে এত শূন্য পদের ছড়াছড়ি কেন? এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, নিয়োগবিধি প্রণয়ন কার্যক্রম শেষ না হওয়া, পদোন্নতি যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া ও আদালতে মামলা থাকায় কিছু শূন্য পদ পূরণ করা যায়নি।
এদিকে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ১২ হাজার ৭৪ পদে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে ব্যাংক খাতে। এছাড়া আটকে থাকা কয়েকটি চাকরির পরীক্ষার তারিখও প্রকাশ করা হয়েছে।
দেশে চাকরিপ্রাপ্তি নিয়ে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান চাকরি বাজারে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যদি অচল কিংবা উপযুক্ত না হয়, তাহলে এর দায় তো শিক্ষার্থী কিংবা চাকরিপ্রার্থীর নয়। শিক্ষা কার্যক্রমকে কীভাবে কর্মমুখী, বাজারমুখী ও বাস্তবমুখী করা যায়, কর্তৃপক্ষ সেই নীতি প্রণয়ন করবে।
আরেকটি বিষয়, সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এর মধ্যে করোনা মহামারীতে অনেকের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। প্রচলিত স্নাতকের সঙ্গে চাকরির পরীক্ষা মিল নেই। চাকরির জন্য শিক্ষার্থীদের আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়। এরপর আবেদন করা ও পরীক্ষায় বসতে বসতেই অনেকের বয়সসীমা শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক মেধাবী সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আবার শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে দেশে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অভাব রয়েছে। দেশে
কোন ধরনের দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, সেটি নিরূপণ করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে কর্মসংস্থান কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছেন অনেকে।
২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করে।
ইশতেহারে আরো বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের তথ্য সংবলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে সুবিধা বিস্তৃত করা হবে। তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ‘যুব বিনোদন কেন্দ্র’ গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে। প্রতি উপজেলা থেকে প্রতি বছর গড়ে এক হাজার যুব/যুব মহিলাকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
ইশতেহারের এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপও নিয়েছিল। কিন্তু করোনা মহামারী তাতে বাধ সাধে। লকডাউনের প্রভাবে অনেকে চাকরি হারান। সেই ধাক্কার মধ্যেই এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা এসেছে। যার ফলে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকে আরো দীর্ঘায়িত করছে। অবশ্য সরকার জনশক্তি রফতানিতে তৎপরতা বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ও ফ্রিল্যান্সার তৈরিতে জোর দিয়েছে। কিন্তু দফায় দফায় বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ায় এসএমই খাতও চাপে পড়েছে।
চলতি অর্থবছর জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি অর্থনীতিকে নতুন চাপে ফেলেছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আরেকদিকে দেশে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ মাত্র ১৫ শতাংশ। কাজেই সরকারের এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান। জনশক্তি সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি এ সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সরকারকে আরো কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
অন্যদিকে যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় কর্ম হারান অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। অথচ দেশে ৮৫ শতাংশ মানুষ এ খাতে জড়িত। জাতীয় অর্থনীতিতে এদের অবদানও বেশি। দেশের এ শ্রমিকদের নিয়েও সরকারকে পরিকল্পিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদেরকে আনুষ্ঠানিকতার আওতায় আনতে হবে। তাদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
২০২২-২৩ বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উল্লেখ করেন, দেশের সব অংশে কর্মসংস্থানের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপন করছে, যেখানে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরকার ২০২৫ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ৩০ লাখে উন্নীতের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ‘রূপকল্প-২০৪১’ ও এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে ৮৭ হাজার ২৩০টি গ্রামের উন্নয়নের জন্য রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন।
তিনি আরো উল্লেখ করেছিলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উপজেলা পর্যায়ে ১০০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। একই অর্থবছরে ৮ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং ৫ লাখ ২০ হাজার জনকে বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থানের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর কথা আশার সঞ্চার করলেও এসব বিষয় বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক প্রস্তাব নেই। কাজেই এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে বেকারত্ব ঘোচাতে এসব পরিকল্পনা সরকারের নিবিড়ভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার।
তরুণরা দেশের মূল্যবান সম্পদ। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রধানতম শক্তি তারাই। দেশের এ তরুণ সমাজকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তরে আরো সোচ্চার হতে হবে। তাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যেন কোনো নিয়মের বেড়াজালে তাদের মেধা ও ইচ্ছাশক্তি আটকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে চাকরির আবেদনের বয়সসীমা বৃদ্ধি করতে হবে।
কর্মসংস্থান নীতি ২০২০ (খসড়া)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশে গড়ে ২৬ লাখ লোক নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। করোনা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের অনেক কর্মী এমনিতেই চাকরি নিয়ে সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অনেকের জন্য আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করাও কঠিন। বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি যেসব পদ শূন্য রয়েছে, সেগুলো দ্রুত পূরণে সরকারকে গতিশীল হতে হবে। এতে অপেক্ষমাণ অনেক বেকারের ‘সোনার হরিণ’
পাওয়া হবে।
পাপলু রহমান: সাংবাদিক