পর্যালোচনা

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিরসনে বিশ্বনেতাদের তৎপরতা যথেষ্ট নয়

নভেম্বরের মাঝামাঝি হালকা শীতের আমেজ দেখে অনেকেই একটু স্বস্তি পেয়েছিলেন এবং আনন্দিত হয়েছিলেন যে শীত মনে হয় আগেই চলে এল। এসি ও ফ্যানের ব্যবহার রাতের দিকে কমে এল। হালকা চাদর বা কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতেও ভালো লাগছিল। কিন্তু নভেম্বরের শেষের দিকে এসে তাপমাত্রা বিশেষ করে দিনের বেলায় বেশ বেড়ে গেল। ৩০ ডিগ্রির ওপরে চলে গেল। এক অস্বস্তিকর গরম। ফ্যান চালালে

নভেম্বরের মাঝামাঝি হালকা শীতের আমেজ দেখে অনেকেই একটু স্বস্তি পেয়েছিলেন এবং আনন্দিত হয়েছিলেন যে শীত মনে হয় আগেই চলে এল। এসি ও ফ্যানের ব্যবহার রাতের দিকে কমে এল। হালকা চাদর বা কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতেও ভালো লাগছিল। কিন্তু নভেম্বরের শেষের দিকে এসে তাপমাত্রা বিশেষ করে দিনের বেলায় বেশ বেড়ে গেল। ৩০ ডিগ্রির ওপরে চলে গেল। এক অস্বস্তিকর গরম। ফ্যান চালালে লাগে ঠাণ্ডা, ফ্যান বন্ধ করলে লাগে গরম। ঢাকায় শুধু নয়, গ্রামেও দিনের বেলা গরম বেড়েছে যা তাদের প্রত্যাশিত ছিল না। 

নভেম্বরের তাপের এ তারতম্য বিশ্বব্যাপী ঘটেছে। কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্যমতে, এ বছর নভেম্বর ২০১২ এবং ২০১৫-২১-এর তুলনায় তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা ছিল, কিন্তু অন্যান্য বছরের নভেম্বরের গরম ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত নভেম্বর মাসের গড় তাপমাত্রার তুলনায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল; এমনকি ইউরোপের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল। এ বছরের নভেম্বর ছিল ১৪৩ বছরের মধ্যে নবম উষ্ণতম মাস। ডিসেম্বরে এসেও তাপ কমেনি। বাংলাদেশেও এ তাপ অনুভূত হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) আশঙ্কা করছে যে ২০২৩ সালেই প্রাক-শিল্প বিপ্লবের তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে, অথচ ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশ্বনেতারা মিলিত হয়ে বছরের পর বছর আলোচনা করে চলেছেন। বিশ্বের এ তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়, স্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদন সব কিছুর ওপর যে প্রভাবে পড়ছে তাকে জলবায়ু পরিবর্তন বলে আখ্যায়িত করে গবেষণা ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ড হচ্ছে। 

এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই শহরে ৩০ নভেম্বর শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনের ২৮তম সম্মেলন (বা কপ২৮), চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখানে অংশগ্রহণ করছেন ১৯৭ দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিরা; আরো আছেন তেল, কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানির কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা পার্টির সংখ্যাও এবার অনেক বেশি, ৪ হাজার ৪০৯ জন (রেজিস্টার করেছেন) এবং অন্যান্য প্রতিনিধি ৭০ হাজারেরও বেশি। প্রতিটি কপ সম্মেলনেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে, অথচ প্রতিটি সম্মেলনই শেষ হচ্ছে মিথ্যা আশ্বাসের মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে তা বিফলতার পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে। এর আগের ২৭টি সম্মেলনে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল এবং ধনী দেশগুলো যারা এ নিঃসরণের প্রধানত দায়ী তারা তাদের কথা রাখেনি। প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ২১-এ যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে (১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখা) সব দেশ একমত হয়েছিল তা ক্রমাগতভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। কেউ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমায়নি কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির সব কোম্পানি তাদেরই। কপ সম্মেলনে তাদের উপস্থিতি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে আশঙ্কা রয়েছে তা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটবে। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। 

এবার আরব আমিরাতে, যেখানে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন হয়, সেই দেশেই সম্মেলন হচ্ছে এবং এ সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট আরব আমিরাতের সুলতান আল জাবের নিজে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের কর্ণধার সিইও। তিনি একই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে আগ্রহী এবং মাসদার নামক নবায়ণযোগ্য জ্বালানি কোম্পানির সিইও। তিনি কপ২৮-এর সভায় ২ ডিসেম্বর ঘোষণা দিয়েছেন যে ১১৭টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তিন গুণ বাড়ানো হবে। 

কিন্তু গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত (৩ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সুলতান আল জাবের বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার দাবির পেছনে কোনো ‘বিজ্ঞান’ নেই। একমাত্র আমাদের গুহার যুগে ফিরিয়ে নেয়া ছাড়া আর কোনো যুক্তি নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের জাতিসংঘের দূত মেরি রবিনসনের সঙ্গে একটি সেশনে অংশগ্রহণ করতে এসে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। মেরি রবিনসন বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর (phase out) সিদ্ধান্ডের ওপর কপ২৮-এর সাফল্য নির্ভর করছে। জাতিসংঘের মহাসচিবও ১ ডিসেম্বর পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, ‘বিজ্ঞান একেবারে পরিষ্কার। আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করলেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লিমিট রক্ষা করা সম্ভব হবে। কমানো নয়, হ্রাস করা নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একেবারে বন্ধ করার দিকে যেতে হবে। 

ইউএইর সুলতান আল জাবেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি এ জলবায়ু সম্মেলনকে জীবাশ্ম জ্বালানির পক্ষে চুক্তি করার জন্য ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রশ্ন এতই বিভেদের সৃষ্টি করেছে যে কপ২৮-এর উপদেষ্টা বোর্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা হাইনে পদত্যাগ পত্র দিয়েছেন। 

শুধু তাপমাত্রা বেড়েছে তা-ই নয়, ডব্লিউএমও বলছে গ্রিনহাউজ গ্যাসের লেভেল রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে, বেড়েছে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা, অন্যদিকে আন্টার্ক্টিক সমুদ্রের বরফ নেমে গেছে রেকর্ড পরিমাণ। বিশ্বনেতারা, বিশেষ করে ধনী দেশের নেতারা তাদের নিজ নিজ দেশের তেল, গ্যাস, কয়লা কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তাদের দেয়া কথা রাখতে পারছেন না কিংবা সেই ইচ্ছাও তাদের নেই। তারা বর্তমান মুনাফার কাছে ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। 

জলবায়ু পরিবর্তন শুধুই বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীতিনৈতিকতার প্রশ্ন এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। জাতিসংঘের সভাগুলোর শুরুতে ভ্যাটিকান পোপের একটি বক্তব্য থাকে। এবার পোপ ফ্রান্সিস, যার বয়স ৮৬, সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি অসুস্থতার জন্য। কিন্তু তিনি বাণী পাঠিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে আছি, কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কোন ধরনের বর্তমান আমরা বেছে নিচ্ছি। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি, কারণ পরিবেশ ধ্বংস করা মানে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করা’। রয়টার্সের খবরে (২ ডিসেম্বর) এ তথ্য জানা গেছে। 

পৃথিবীর অন্য সব ধর্মেও একই কথা বলে। ইসলাম ধর্মে মানুষকে খোদার খলিফা হিসেবে পাঠানো হয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মেও প্রকৃতি রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, সেটা নিজ নিজ ধর্মের মানুষ সবাই জানে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। এখানে সেই অবস্থাই হয়েছে। 

জর্ডানের রাজা আব্দুল্লাহ ২ ডিসেম্বর জলবায়ুও দুর্যোগকে গাজার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, বাস্তুহারা হয়েছে—এরা তো এ জলবায়ু পরিবর্তনের একেবারে সামনের সারিতে অবস্থান করছেন। তাদের অবস্থা যুদ্ধের জন্য যেমন খারাপ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এ সমস্যাকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

কিন্তু যারা পরিবেশ ধ্বংস করছে তাদের কানে কি এসব কথা যাচ্ছে? প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ২১-এর ওয়াদা এখনো পূরণ করা হয়নি। কপ২৮-এ কতটুকু অগ্রগতি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো আমাদের মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য জরুরি হয়ে থাকে তাহলে তেলের দেশ আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত এ জলবায়ু সম্মেলন সফলতার মুখ দেখবে বলে মনে হয় না। তবুও আশা করতে দোষ নেই। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কাজকে ব্যবসা নয় মানবতার প্রশ্নে, আগামীতে মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্নে গুরুত্ব দিয়ে একটা সমাধান নিয়ে আসতে পারবে। তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। এর লাগাম টানতে হলে অবশ্যই কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধনী দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জীবনযাত্রা। দায়িত্ব তাদের নিতেই হবে। তাদের জীবন ব্যবস্থার কারণে আজ বিশ্বের এ অবস্থা। কপ২৮-এর সফলতা নির্ভর করছে সব দেশের অংশগ্রহণে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেয়ার ওপর। 

সম্মেলনে আরো অনেক বিষয় যেমন খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্য সমস্যা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো আলোচিত হচ্ছে। সব বিষয় এখানে আনা হয়নি। 

ফরিদা আখতার: নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)

আরও