স্বনির্ভর জ্বালানি খাত ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অধিকাংশ ধাপে জ্বালানি অবকাঠামো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানেই আমাদের দুর্ভাগ্য। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তেমন কোনো স্বনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। দেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখন আমরা সঠিক জ্বালানিনীতি নিয়ে শুধু আলাপ-আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি উৎসের একটি তৈরি পোশাক শিল্প। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত কেন, দেশের অন্য কোনো খাতেরই পূর্ণ বিকাশ জ্বালানিনীতি ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। উপরন্তু উন্নত রাষ্ট্রের তালিকাবদ্ধ হয়ে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে আমাদের শুধু জ্বালানি আহরণ করলেই সমাধান হবে না। বরং আমাদের একটি আদর্শ জ্বালানিনীতি গড়ে তুলতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেমন জ্বালানির প্রাপ্যতার বিকল্প নেই, তেমনি আধুনিক শিল্পায়নের যুগে জ্বালানির বিকল্প চিন্তা করারও অবকাশ নেই। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ তো বটেই, যেকোনো বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় জ্বালানি খাতের ভিত্তি ও স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের পোশাক খাতকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সেসব উন্নত দেশের সঙ্গে, যারা একদিকে জ্বালানিতে তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। জ্বালানি ক্রয়াদেশের সিদ্ধান্ত অনেক সময় নির্ধারণ হয় মাত্র ১-২ সেন্টের ব্যবধানে। ক্রেতারা বর্তমানে নিট জিরোর দিকে এগোচ্ছে। এমন সময় জ্বালানিনীতি নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতাশার।
বাংলাদেশের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট (১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ), গ্যাসভিত্তিক ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট (৩৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ), ভারী জ্বালানি তেলচালিত ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট (১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ), উচ্চগতির ডিজেলচালিত ৭৬৮ মেগাওয়াট (২ দশমিক ৩৭ শতাংশ), আমদানিনির্ভর ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট (৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ), নবায়নযোগ্যভিত্তিক ১ হাজার ৬৯৫ দশমিক শূন্য ২ মেগাওয়াট (৫ দশমিক ২৪ শতাংশ) এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট (৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ)। বহুদিন ধরেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া তুলনামূলক সহজ ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন পথ হিসেবে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতির ফাঁদে। সাশ্রয়ী দেশীয় গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতিকে মজবুত করার বদলে নীতিনির্ধারকরা বারবার দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও নিজস্ব সম্পদ উন্নয়নের চেয়ে দ্রুত লাভজনক আমদানি ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মাশুল এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
গ্যাস খাতে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত অনুসন্ধান এবং নতুন কূপ খননে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন কমেছে, ঘাটতি বেড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম কখনই কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি; ফলে বাধ্য হয়ে দেশকে ঝুঁকতে হয়েছে এলএনজি আমদানিনির্ভরতার দিকে। বর্তমানে প্রতি বছর গ্যাস উৎপাদন গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হারে কমছে। এ ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। সাত বছরে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এলএনজি আমদানি করা হয়েছে এবং এর বিপরীতে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আরো উদ্বেগজনক হলো এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করি। ফলে এ ভূখণ্ডে যেকোনো প্রকার ভূরাজনৈতিক গোলযোগে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই। প্রতি বছর গড়ে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানিতে ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাস্তবে আর বাড়ানো হয়নি। নতুন ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও আশ্চর্যজনকভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। নির্মাণ সম্পন্ন হলে পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেত, দেশীয় মজুদও বাড়ত। প্রযুক্তিগত সংস্কারের মাধ্যমে বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড অয়েল এনে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকলেও সে পথেও এগোনো হয়নি।
বাংলাদেশে ক্যাপটিভ পাওয়ারের বড় সমস্যা হলো বাড়তে থাকা জ্বালানি খরচ ও অনির্ভরযোগ্যতা। গ্যাসের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ ঊর্ধ্বমুখী, আবার গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটরও ঠিকভাবে চলছে না। সরকার ক্যাপটিভ কমিয়ে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিলেও গ্রিডে এখনো নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও স্থিতিশীল ভোল্টেজ নিশ্চিত হয়নি। ফলে শিল্পমালিকরা গ্যাস সংকট ও গ্রিডের অনিশ্চয়তার দ্বৈত চাপে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
আমদানি করা বিদ্যুতের মূল সমস্যা হলো অতিরিক্ত ব্যয়, দুর্নীতি আর পরনির্ভরতা। ভারত থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ এনে ডলারে বিল পরিশোধ করতে গিয়ে ডলার সংকট তীব্র হচ্ছে, বকেয়া পাওনাও ফুলে উঠছে। উপরন্তু আঞ্চলিক রাজনীতি বা নীতি পরিবর্তনে হঠাৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই রয়ে যায়। নিজস্ব জ্বালানি ও উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়াতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো দুর্বল হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও একই আমদানিনির্ভর প্রবণতা বিরাজমান। দেশের পাঁচটি কয়লাখনিতে বিপুল মজুদ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো কার্যত অযত্নে ফেলে রেখে প্রতি বছর প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করা হচ্ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আশা ছিল, তারা এ আমদানিনির্ভর নীতি পুনর্বিবেচনা করে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক একটি জ্বালানি–নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করবে। কিন্তু কিছু আইনি সংস্কার সত্ত্বেও তারা মূল নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আনতে পারেনি; বরং এলএনজি আমদানি আরো বাড়িয়ে আগের পথই প্রায় অব্যাহত রেখেছে। বাস্তবে বর্তমান জ্বালানিনীতি দাঁড়িয়ে আছে ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর এক কাঠামোর ওপর, যা আজ দেশের শিল্প খাত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আবাসিক ব্যবহারকারী ও সিএনজি খাতের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ-সংঘাতে জর্জরিত আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকির মুখে পুরো অর্থনীতিকে বারবার ফেলে দিচ্ছে।
আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব বর্তমানে মাত্র ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ (স্থাপিত ক্ষমতা), যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৪৬ শতাংশ। এটি স্পষ্ট করে দেয়, আমরা কতটা পিছিয়ে আছি এবং এক্ষেত্রে আমাদের আরো কত বেশি উদ্যোগ ও বিনিয়োগ জরুরি। জ্বালানি সংকটজনিত জটিলতা এড়াতে হলে যতটা সম্ভব আমদানিনির্ভর ও জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ও পরিকল্পিত রূপান্তর ঘটাতে হবে—কিন্তু সেটি বুঝতে আমাদের যেন অস্বাভাবিক রকম সময় লেগে যাচ্ছে।
অচলাবস্থা নিরসনে দেশীয় গ্যাস ও কয়লাক্ষেত্র অনুসন্ধান জরুরি। অনুসন্ধানের পর উত্তোলন বাড়ানোর বিষয়েও ভাবতে হবে। জ্বালানি অবকাঠামোর পুনর্গঠনও এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে, বিশেষত শিল্প খাতে, এমন নীতি প্রণয়ন করা, যাতে কম জ্বালানিতে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয় এবং অপচয় কমে। আমদানিনির্ভর সব ধরনের জ্বালানি চুক্তি ও মাস্টারপ্ল্যান জনস্বার্থের আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির একটি স্পষ্ট কাঠামো গড়ে তোলা। জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির উর্বর ক্ষেত্র; তাই এ খাতে বিশেষ নজরদারি ও কার্যকর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে অবশ্যই কঠোর জ্বালানি রেশনিং প্রয়োগ করতে হবে এবং পরিষ্কার খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে, যাতে দেশীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পায়নকে এগিয়ে নেয়া যায়।
আমদানি করা জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা যায় না। বাংলাদেশ এখন সে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে। তাই রাজনৈতিক সাহস ও দূরদর্শিতা দেখিয়ে স্বনির্ভরতার পথে ফিরে আসা শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। বাংলাদেশের মতো এখনো অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হয়ে না ওঠা দেশের পক্ষে হয়তো অল্প সময়ে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর জ্বালানি খাত গড়ে তোলা সম্ভব নয়; তবে বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সুদূরপ্রসারী, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ থাকা এখন আর বিলাসিতা নয়, একান্ত প্রয়োজন।
মো. মহিউদ্দিন রুবেল: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক