‘চন্দ্রা: কত দিনে তোমাদের কাজ ফুরাবে?
বিশু: পাঁজিতে তো দিনের শেষ লেখে না। এক দিনের পর দুদিন। দুদিনের পর তিনদিন। সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি। তাল তাল সোনা তুলে আনছি। এক তালের পর দু তাল। দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অংকের পর অংক সার বেঁধে চলেছে। ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, শুধুই সংখ্যা। ফাগু ভাই তুমি কোন সংখ্যা?
ফাগু লাল: পিঠের কাপড়ে দাগা আছে, আমি ৪৭ ফ।
বিশু: আমি ৬৯ ঙ। গাঁয়ে ছিলুম মানুষ। এখানে হয়েছি দশ-পঁচিশের ছক। আমাদের বুকের ওপর দিয়ে জুয়ো খেলা চলছে।’
সর্বনাশা লোভের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির এই খণ্ডচিত্রটি ‘রক্তকরবী’ নাটকে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
যতই ঝড়ঝাপটা আসুক। দুনিয়া উল্টে যাক, পাল্টে যাক; এই লোভ থেকে বেরুতে পারে না মানুষ।
করোনাকালে শুধু বিপর্যস্তই নয়, সংকটের মুখে মানুষের অস্তিত্ব। এমন দুঃসময়ে সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি সংবাদের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।
দেশব্যাপী লকডাউনের মধ্যে লাখো লাখো গার্মেন্টস শ্রমিককে টেনে আনা হলো রাজধানীতে। ট্রান্সপোর্ট বন্ধ। এক-দেড়শ কিলোমিটার পথ হেঁটে শ্রমিকরা এলেন ঢাকায়। প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলো। দেশের অন্য সবকিছুর মতো বন্ধ ঘোষণা করা হলো গার্মেন্টস। মানে আবার লকডাউনের মধ্যেই শ্রমিকদের ফিরতে হবে বাড়িতে। তাদের শ্রম ছাড়া আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। কেননা শ্রমিক যাবে শ্রমিক আসবে- কে মরল, কে বাঁচল হিসাব কষার সময় কোথায়? কেননা শ্রমিক তো শেষ পর্যন্ত সংখ্যাই।
আমাদের দেশে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রায় বন্ধ। ডাক্তাররা চেম্বার করছেন না। প্রাইভেট মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট চিকিৎসাসেবা চালু রাখাটাকে লাভজনক মনে করছেন না।
গরিবের জন্য পাঠানো ত্রাণ পাওয়া গেছে জনপ্রতিনিধির গোডাউনে। অসহায় মানুষের হক কেড়ে নেয়ার সংবাদ প্রকাশ করার দায়ে সাংবাদিককে পেটানোর সংবাদও এসেছে মিডিয়ায়।
গতকাল মারা গেছে পাঁচ হাজার। আজ ছয় হাজার। আগামীকাল সাত হাজার। গরিব-ধনী, শ্রেণী, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা বয়স করোনার থাবায় কোনো ভেদ নেই। এই মহামারীর সময়েও লাভের গুড়ের আশায় পিঁপড়ের মতো ছোটাছুটি করছি আমরা।
মানুষ ঘরবন্দি। আমাদের মুনাফাখোররা মওকা বুঝে এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন খুব ভালোভাবেই। অনেকেই খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্য মজুদ করেছেন প্রয়োজনের কয়েক গুণ। বাজার অনিয়ন্ত্রিত। যে যার মতো দাম নিচ্ছেন। চালের দাম সকালে এক তো বিকালে আরেক! বিশ্ববাজারে তেল-চিনির দাম কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তার ছিটেফোঁটাও প্রভাব পড়েনি আমাদের দেশে। তেল-চিনির দাম ক্রম ঊর্ধ্বমুখী।
আমরা সবকিছুতেই ছোট (!) বলে আমাদের লোভগুলো বড্ড বেশি দৃষ্টিকটু।
আধিপত্য বিস্তার, আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মিডিয়ার লড়াই কিংবা ব্লেম গেম সবকিছুই আছে আগের মতো। করোনা থামাতে পারেনি কিছুই। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো করোনা-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্ব নিয়ে গবেষণা করছে বিস্তর। আগামী বিশ্বনেতৃত্বে কে থাকবে ইউএস না চীন এসব নিয়ে ভারী ভারী লেখা হচ্ছে। তাতে অবশ্য মানুষের মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই।
চীনে ৫০ হাজারের মতো মানুষ মারা গেছে এমন দাবি ওয়াশিংটন পোস্টের। চীনের ল্যাবরেটরি থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে কিনা, এ নিয়ে চলছে বিতর্ক। চীনের প্রচুর মানুষ মারা গেছে। এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয় তারা। যুক্তরাষ্ট্রেও মানুষের মৃত্যু বেড়ে চলেছে। কিন্তু তাতে দুদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্লেম গেম থেমে নেই। সাধারণ জনগণের মৃত্যুর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের ইগোই হয়ে উঠেছে বড় হয়ে। ধ্বংসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও অস্ত্রে-অর্থে-শক্তিতে শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হতে পারে না মানুষ।
করোনা-পরবর্তী পৃথিবী বাসযোগ্য হবে সবার। শুধু মানুষ নয়, সব প্রাণিজগতের। মানুষ বিভেদ ভুলে জন্ম দেবে এক নতুন জগত্-সংসারের। এভাবে আশাবাদী হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিনই। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের সহায়তা না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। উপকূলে আসা ডলফিন আমরা মেরে ফেলেছি।
অবিশ্বাসের চোরা স্রোতে আমরা ক্ষতবিক্ষত। মানুষের ঐক্যের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে আমরা জমায়েতের নিষেধাজ্ঞা ভুলে ছুটছি উপাসনালয়ে। করোনার কাছে আলাদা কোনো গুরুত্বই বহন করে না দেবালয়ও। উপাসনালয় থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ আসছে নিয়মিতই। ব্যক্তিগত বিশ্বাস যে সমষ্টির বিপদের কারণ, সেটা বুঝতে চাইছি না আমরা। ভারতে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তাবলিগ জামায়াতে অংশ নেয়া বেশ বড় সংখ্যার মানুষ। এটা নিয়ে বিজেপি মুসলিম-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। সেই পুরনো রাজনৈতিক লাভালাভের হিসাবটাই হয়ে উঠেছে মুখ্য।
লোভের পাপে পুড়ছে পৃথিবী। বিভেদের বিষবাষ্পে মাটির দুনিয়া আজ নরকতুল্য। সব থাকার পরও মানুষের যেন কিছু নেই। রক্তকরবীতে রবিঠাকুর লিখেছেন, যক্ষপুরীর হাওয়া সুন্দরের পরে অবজ্ঞা ঘটিয়ে দেয়, এইটেই সর্বনেশে। নরকেও সুন্দর আছে কিন্তু সুন্দরকে সেখানে কেউ বুঝতেই পারে না, এইটেই নরকবাসীর সবচেয়ে বড় সাজা।
সীমাহীন লালসার ভারে আমাদের আত্মা পর্যন্ত বুভুক্ষু।