গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেল আর গ্যাসের দাম বাড়তে থাকে। রাশিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার পর ইউরোপের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আমেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে কাতার থেকে এলএনজি গ্যাসের আমদানি বাড়িয়ে দেয় ইউরোপ। ইউরোপের এ অপ্রত্যাশিত এলএনজি-নির্ভরতা বাংলাদেশসহ অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জ্বালানি সংকটের একটি মূল কারণ।
ঐতিহাসিকভাবে তেল আর গ্যাসের বাজারের একটি মূল পার্থক্য ছিল। তেলের বাজার হলো বিশ্বব্যাপী। কারণ তেল সহজেই এক দেশ থেকে আরেক দেশে পরিবহন করা যায়। কিন্তু গ্যাসের বাজার ছিল অনেকটা আঞ্চলিক যেমন কানাডার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি আর রাশিয়ার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করা। আর বাকি গ্যাসের চাহিদা এলএনজি দিয়ে পূরণ হতো। এ ‘বৈশ্বিক’ বনাম ‘আঞ্চলিক’ বাজারের ভিন্নতার জন্য তেলের দাম প্রধানত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড নামে পরিচিত, কিন্তু একেক অঞ্চলের জন্য একেক গ্যাসের দাম বিদ্যমান ছিল। যেমন নর্থ আমেরিকায় গ্যাসের দাম কম কারণ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। আবার জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায় দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি করে। আর ইউরোপে গ্যাসের দাম ছিল নর্থ আমেরিকা আর এশিয়ার মাঝামাঝি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রথম শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো গ্যাসের বাজার এখন আঞ্চলিক থেকে অনেকটা বৈশ্বিক হয়ে গেছে এবং এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাসের দামের মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য তা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। আগে যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে গ্যাসের বাণিজ্য বেশি হতো, এখন দাম বৃদ্ধির ফলে এলএনজির বাণিজ্য স্পট বাজারে বেশি হচ্ছে। আগামী কয়েক বছর গ্যাসের চড়া দাম বাংলাদেশকে ভোগাবে। যদিও যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জার্মানি ও চীন তড়িঘড়ি করে এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পন্ন করে, কিন্তু দুর্বল আর্থিক খাতের জন্য বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে এলএনজি রফতানিকারকরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে আগ্রহী নয়। এটা উল্লেখ করার মতো যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভস্বল্পতার জন্য সময়মতো পাকিস্তান এলএনজি আমদানি করতে ব্যর্থ হয় এবং ফলস্বরূপ পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশ বেড়ে যায়।
এ কারণেই ব্যাংকিং এবং আর্থিক সেবা খাতকে রাজনৈতিকীকরণ এবং অদক্ষতার হাত থেকে দূরে রাখতে হয়, কেননা দেশের সব মানুষের কল্যাণ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়টি অনেকটা ব্যাংক ক্যাপিটালের মতো। ঠিক যেমন একটা ব্যাংকের ক্যাপিটাল কম থাকলে যেকোনো সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকটি অপ্রস্তুত বা অক্ষম থাকে, সেভাবেই একটি দেশের আর্থিক খাতে অনিয়ম এবং সুশাসন না থাকলে বহির্বিশ্বের অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না।
মূল কথায় আসি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে খুচরা গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ মাসিক গ্যাস বিলের পরিমাণের ওপর একটি সর্বোচ্চ সীমা (প্রাইস ক্যাপ) নির্ধারণ করে দেয়। বিষয়টি বিতর্কেরও সৃষ্টি করে। এ দেশগুলোর সরকারের শঙ্কা ছিল, জ্বালানির দাম নাগালের বাইরে চলে গেলে জনগণের মধ্যে একটা অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা এ যুদ্ধের মধ্যে কাম্য নয়। আর অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের যুক্তি ছিল, জ্বালানির প্রকৃত দামের বার্তা বাজার থেকে তুলে নিলে ভোক্তারা জ্বালানি সংরক্ষণ থেকে বিরত থাকবে এবং যে নিম্ন আয়ের পরিবার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর জন্য প্রাইস ক্যাপ বসানো হয়েছে, তাতে সমৃদ্ধিশালী পরিবার এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশি উপকৃত হবে। তার চেয়ে উত্তম হলো আক্রান্ত নিম্ন আয়ের পরিবার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জ্বালানি বিলের ওপর ছাড় (রিবেট) দেয়া, যে কৌশলে দুই দিকই বজায় থাকবে। যেহেতু উন্নত দেশগুলোয় কারা নিম্ন আয়ের পরিবার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অধিকারী এ তথ্যগুলো সরকারের কাছে আছে, তাই সেখানে সংশ্লিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজ।
কিন্তু
রাজনীতিবিদদের বিবেচনা
ভিন্ন। তারা
বিলের ছাড়ের
বদলে দামের
সীমা নির্ধারণের ব্যাপারে অবিচল থাকল
এবং এ কারণেই আগামীতে
ইউরোপের অনেক
দেশেই জিডিপিতে
ঋণের অনুপাত
ফেঁপে উঠবে।
আর যেহেতু
মূল্যস্ফীতি দমানোর
জন্য সুদের
হার বাড়ছে,
সেহেতু ভবিষ্যতে
সরকারের ঋণের
ওপর সুদের
চাপও অনেক
বাড়বে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস
বাজারের এ গাণিতিক ব্যবস্থা
উপেক্ষা করে সমৃদ্ধ গোষ্ঠীর
জন্য বেশি
কর ছাড় দিয়েছিলেন এবং এর পরিণতি
তাকে কঠিনভাবে
দিতে হয়েছিল।
মাত্র ৫০ দিন পর লিজ ট্রাস
প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ
করতে বাধ্য
হলেন। একজন
অর্থনীতিবিদ হিসেবে
আমি প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসকে ধন্যবাদ
জানাই, কারণ
তিনি তার রাজনৈতিক কর্মজীবন
বাজি রেখে
দেখিয়ে দিলেন
যে ভুল নীতি দিয়ে
বাজার ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়া যায় না।
উপরের আলোচনা থেকে দ্বিতীয় শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, বাজারের প্রকৃত দামের সংকেত চাপা না দেয়া, যা জ্বালানি এবং অন্য সব পণ্য ও সেবার জন্যও প্রযোজ্য। মূল্যের বার্তা দমন না করে সরকার তার বিভিন্ন এজেন্সির সাহায্যে যে ফ্যাক্টরগুলো দামের প্রকৃত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে সেগুলো দূর করতে পারে। এ-সংশ্লিষ্ট একটি অনুসিদ্ধান্ত হলো, ক্ষমতার বড়াই ও ভুল অর্থনীতি ক্ষমতা হারানোর কারণ হতে পারে, যা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য ও শ্রীলংকা দেখিয়ে দিয়েছে।
ইউরোপে জ্বালানি সংকটের এ কঠিন সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান একক বা ক্ষুদ্রভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ী বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যেমন এয়ারকন্ডিশনারের কাঁটা ২৬ ডিগ্রির ওপরে এবং শীতকালে অভ্যন্তরীণ উত্তাপকের কাঁটা নিচের দিকে রাখা। যদিও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদক্ষেপ অর্থনীতিতে জ্বালানি চাহিদার ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও পারমাণবিক শক্তির অবদান বৃদ্ধির ওপর আরো বেশি জোর দিচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর (এনার্জি এফিসিয়েন্সি) ওপর সেভাবে কোনো মনোযোগ দেয়া হচ্ছে না। এ অবহেলার একটি কারণ হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি দৃশ্যমান নয়। কেউ তার বাসা বা অফিসের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করলে সেটা অনেকের নজরে আসে এবং প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু কেউ এলইডি বাতি, জ্বালানি কম খরচ করে এ ধরনের ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনার বসালে অথবা বিল্ডিং রেট্রোফিটিং করলে তা খুব কম মানুষের নজরে আসে। এজন্যই রাজনীতিবিদরা সৌরবিদ্যুৎ অথবা ইলেকট্রিক ব্যাটারির কারখানা স্থাপন করতে বেশি গরজ দেখান, কারণ এগুলো ভোটারদের কাছে সহজেই দৃশ্যমান।
আমি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান খাটো করে দেখছি না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু ‘জ্বালানি দক্ষতা’ (এনার্জি এফিসিয়েন্সি) একটি অন্যতম টেকসই উপায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য। মোদ্দা কথা হলো, যে বিনিয়োগ জ্বালানির চাহিদা কমায় কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত করে না সেটার কার্যকারিতা সহজেই বোধগম্য। ইউরোপের জ্বালানি সংকট থেকে তৃতীয় শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চেয়ে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সময়ে বাংলাদেশও বেশকিছু বিদ্যুৎসাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
পক্ষান্তরে, জ্বালানি দক্ষতার সুফল অনেকটা প্রমাণিত এবং এ খাতে ভর্তুকি বা বিনিয়োগ কর অব্যাহতির মতো নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে। জো বাইডেনের ৩৬৯ বিলিয়ন ডলারের ‘ইনফ্ল্যাশন রিডাকশন অ্যাক্ট’-এর মূলে আছে জ্বালানি দক্ষতা শিল্পের ওপর ভর্তুকি। ইউরোপ আর চীন এখন অনেকটা শঙ্কিত যে এ ভর্তুকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে। ইউরোপ আর চীন যদিও
ভর্তুকির এ বিষয়টি ডব্লিউটিওকে অবহিত করছে। খুব সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব লক্ষ্যে অটুট থাকবে। তবে গোটা বিশ্বের জন্য এ প্রতিযোগিতা ভালো ছাড়া মন্দ হবে না।
অবশেষে একটু ভিন্ন তথ্য দিয়ে শেষ করি। পৃথিবীর প্রথম জ্বালানি সংকট বলতে আমরা সাধারণত ১৯৭৩ সালে তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা জানি। বস্তুত, প্রথম জ্বালানি সংকট যেটা ১৬ শতকের শেষের দিক থেকে ১৮ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, সেটা হলো জ্বালানি কাঠ। কপার, ব্রোঞ্জ, ইটের ভাটা থেকে রুটি বানানোর চুলার উদরপূর্তি হতো কাঠ দিয়ে। কিন্তু শুধু খুচরা কাঠই পর্যাপ্ত ছিল না, ইস্পাতের তলোয়ার বানানোর জন্য লাগত পুরো বনের কাঠ। ইস্পাত, লোহা এসব ধাতুর রাক্ষুসী ক্ষুধাই ইউরোপের বন উজাড়ের জন্য দায়ী। কাঠের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তখনো জ্বালানি সাশ্রয়ের আশ্রয় নিয়েছিল মানুষ। ১৬১৫ সালে ইংল্যান্ডের সম্রাট প্রথম জেমস গ্লাস উৎপাদনের জন্য কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। ১৭ শতকের শুরুতে জার্মানি পিট আর কয়লা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে উদ্ভাবন করল এবং নতুন মেশিন উদ্ভাবন করল যা কম কাঠ দিয়ে বেশি তাপ উৎপাদন করতে পারে।
পেছন ফিরে তাকালে আমরা জানতে পারি, কীভাবে মানুষ আগের জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এবং শক্তির পরিবর্তন (এনার্জি ট্রানজিশন) থেকে বেঁচে গেছে। সংকট অনেক সময়ই সংস্কারের জনক। আশা করি, এ সংকটের অভিঘাতে আমাদের জ্বালানি নীতি ও কর্মপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের জরুরি কাজটি সম্পন্ন হবে।
ড. সৈয়দ আবুল বাশার: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি