অভিমত

শিনজো আবে হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক পরিণতি

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ৮ জুলাই ২০২২ জাপানের প্রাচীন রাজধানী শহর নারায় তার রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনাকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তার এ অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হলো। তিনি তার জীবত্কালে উদার গণতান্ত্রিক এক রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক দলে তার এ প্রভাব তিনি বংশানুক্রমে অর্জন

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ৮ জুলাই ২০২২ জাপানের প্রাচীন রাজধানী শহর নারায় তার রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনাকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তার এ অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হলো। তিনি তার জীবত্কালে উদার গণতান্ত্রিক এক রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক দলে তার এ প্রভাব তিনি বংশানুক্রমে অর্জন করেছিলেন। অর্ধশতক ধরে তিনিসহ তিন পুরুষ পালাক্রমে গণতান্ত্রিক দলের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। তার মাতামহ নবুসুকে কিশি ১৯৫৭-৬০ পর্যন্ত জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার বাবা শিনতারো আবে ১৯৮২-৮৬ পর্যন্ত জাপান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হন। গত দুই দশকে শিনজো আবে তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তবে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং রাজনৈতিক দলেও ছিল তার ব্যাপক প্রভাব। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি তার দেশের স্বার্থে বেশকিছু যুগান্তকারী সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জাপানের সামরিক নীতির অংশ হিসেবে রক্ষণাত্মক সামরিক নীতি থেকে সরে এসে আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি গ্রহণ করেন। সেজন্য তিনি জাপানের জাতীয় সংসদ ডায়েটে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে আহূত অধিবেশনে ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া সংবিধানের নবম অনুচ্ছেদের পুনর্ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন। ফলে জাপানের সশস্ত্র বাহিনী সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিপুল পরিমাণ আধুনিক সামরিক সাজসরঞ্জাম যুক্ত করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি আবেনমিকস (যার অর্থ আবে গৃহীত অর্থনীতি) নামে এক নতুন অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে জাপানের অর্থনীতিতে ব্যাপক মন্দা চলছিল। তার অর্থনৈতিক উদ্যোগের ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম হলো বিপুলসংখ্যক বিদেশী প্রশিক্ষণার্থী শ্রমিক ও কর্মজীবী আমদানি এবং তাদের শ্রমশক্তি কাজে লাগিয়ে জাপানের পণ্য ও সেবার বিপুল উৎপাদন বৃদ্ধি করা; জাপানের সমাজে আত্তীকৃত এসব শ্রমিকের সহায়তায় তাদের উৎস দেশে জাপানের বিনিয়োগে শিল্প স্থাপন করে বিশ্বব্যাপী জাপানের পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও  আমদানি-রফতানির শৃঙ্খল বিস্তৃত করা। শিনজো আবের ওই দুই উদ্যোগের ফলে জাপানের সামরিক পরাশক্তিতে রূপান্তর এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তৃতি দৃশ্যমান হয়েছে।

যে শিনজো আবের দূরদর্শী নীতি জাপানকে অগ্রযাত্রার পথ দেখিয়েছে, সেই শিনজো আবেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তার এ হত্যাকাণ্ডের ফলে জাপানের রাজনৈতিক আকাশের একটি তারকার পতন ঘটল। তার এ হত্যাকাণ্ড ছিল অপ্রত্যাশিত। কারণ কয়েক দশকজুড়ে জাপানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আবহ বিরাজিত। রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভিন্নতা দৃষ্ট হলেও তার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ তেমন একটা দেখা যায় না। তাছাড়া জাপানে কয়েক দশক ধরে আগ্নেয়াস্ত্র ধারণ ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। এসব কারণে জাপানে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য কোনো বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় না। স্বাভাবিকভাবেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সুরক্ষায় বাড়তি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থার এ শিথিলতার সুযোগ কাজে লাগিয়েই আততায়ী তেতসুইয়া ইয়ামাগামি অপকর্মটি অতি সহজে সম্পাদন করতে পেরেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মৃত্যুতে জাপানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুকে ঘিরে জাপানের জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে মনে হলেও জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই ফুঁসছে।

জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে জাপানে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তার কারণ জাপানিদের রক্তে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বে সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটলে জাপানে ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কমে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত আগে ও পরে বেশকিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তার অন্যতম হলো ১৯৩২ সালে সংঘটিত তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইনুকা ত্সুয়োশির হত্যাকাণ্ড। ১৯৩২ সালের ১৫ মে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইনুকা ত্সুয়োশি নিহত হন। অন্য হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় ১৯৬০ সালের ১২ অক্টোবর। ওই হত্যাকাণ্ডে তত্কালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্ধনশীল সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা ইনেজিরো আসানুমা নিহত হন। এ উভয় হত্যাকাণ্ডের পর ধারাবাহিকভাবে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এ দুই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে জাপানের রাজনীতির গতিধারায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সংঘটিত প্রধানমন্ত্রী ইনুকা ত্সুয়োশির হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাপানে ডানপন্থী এবং অতিশয় সাম্রাজ্যবাদীদের উত্থান ঘটে এবং রাজনৈতিক দলে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাজতন্ত্রপন্থী নেতা ইনেজিরো আসানুমার মৃত্যুতে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জাপানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

৮ জুলাই সংঘটিত শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের ফলে নতুন রাজনৈতিক সংকটের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। জাপানের রাজনৈতিক আকাশে ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে কালো মেঘ। এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে একটি প্রশ্ন এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা হলো এ হত্যাকাণ্ড কি ব্যক্তি আক্রোশের কারণে ঘটেছে, নাকি রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিহিংসার ফসল হিসেবে ঘটেছে? কারণ একজন শিনজো আবে মানে শুধু একজন ব্যক্তি শিনজো আবে নন। তিনি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও বটে। যে কারণে ওই প্রশ্নকে সামনে রেখে জাপানের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ড জাপানের সরকারি সংস্থাগুলোকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তারা বিষয়টির সূত্র অনুসন্ধানে তত্পর রয়েছে এবং নানান বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করেছে।

বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার ওই তত্পরতা থেকে সহজেই অনুমেয়, এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এসব সংগঠন ও সংস্থার জল্পনাকল্পনা ও বিচার-বিশ্লেষণ জন্ম দেবে নানান ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের। আর এ ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ডালপালা গজিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রতিশোধ হিসেবে বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। অতঃপর তা নানা তত্পরতার মাধ্যমে দৃশ্যমান হতে শুরু করবে, যার জের হয়তো কয়েক বছর থেকে কয়েক দশক পর্যন্ত চলতে পারে। একসময় হয়তো আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। সে সময় হয়তো জাপানের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে অঙ্কিত হবে। কাজেই এ হত্যাকাণ্ডের পরিণতি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

 

ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক, জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ; পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও