মোবাইল আসক্তি বদলে দিচ্ছে শিশুর বিকাশ ও পরিবেশ

অভিভাবকদের নজরদারি বৃদ্ধি ও সরকারি বিধিমালা দরকার

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ কখনই তাদের ফোন বন্ধ করেন না।

একসময় শিশুকে খাওয়াতে কিংবা ঘুম পাড়াতে মা-বাবা, দাদা-দাদি বা পরিবারের অন্য সদস্যরা গল্প শোনাতেন। রূপকথা, ঠাকুরমার ঝুলি, পাখি-প্রাণীর গল্প কিংবা নিজেদের শৈশবের নানা অভিজ্ঞতা ঘিরে তৈরি হতো শিশুর কল্পনার জগৎ। একটু বড় হলে বিনোদনের জায়গা ছিল বাড়ির উঠান, পাড়া-মহল্লার মাঠ কিংবা স্কুলের খেলার জায়গা। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই তৈরি হতো বন্ধুত্ব, যোগাযোগ ও সামাজিকতার বোধ। বর্তমানে এগুলোর বড় অংশ দখল করে নিয়েছে মুঠোফোন তথা স্মার্টফোন।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ কখনই তাদের ফোন বন্ধ করেন না। প্রযুক্তি যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, এ তথ্য তারই প্রতিফলন। শিশুদের ক্ষেত্রেও স্মার্টফোন এখন অনেকটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান, যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের জন্য তারা এটি ব্যবহার করছে। তাছাড়া বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রয়োজনের জায়গা ছাড়িয়ে যখন ফোনই হয়ে ওঠে শিশুর প্রধান বিনোদন ও অবসরের সঙ্গী, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। শিশুদের নিয়ে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। তাদের ২৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি। অথচ মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আরো উদ্বেগের বিষয়, প্রতি ১০ জন মায়ের চারজনই সন্তানের স্মার্টফোন আসক্তি সম্পর্কে অবগত নন। অর্থাৎ শিশুর হাতে যে ডিভাইস তুলে দেয়া হচ্ছে, তার ব্যবহার কতটা এবং কী উদ্দেশ্যে হচ্ছে—এ বিষয়ে পরিবারের বড়রা যথেষ্ট সচেতন নয়।

বাংলাদেশের শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের প্রায় তিন গুণ বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মনোযোগ, ঘুম, শরীর, বিশেষত দৃষ্টিশক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগে প্রভাব ফেলছে। ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করা শিশুদের ২৮ দশমিক ৩ শতাংশের আচরণগত সমস্যা এবং ৩১ শতাংশের অন্তত একটি মানসিক সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে।

পড়াশোনার ওপরও এর প্রভাব স্পষ্ট। এক গবেষণায় স্মার্টফোন ব্যবহার শুরুর পর ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের মনোযোগ কমে যাওয়া এবং ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ খারাপ ফলের কথা জানিয়েছে।

শুধু শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়, তুলনামূলকভাবে বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে। ১ হাজার ৭৭৩ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত ওই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৭২ দশমিক ২ শতাংশ জীবনে কখনো না কখনো মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন, এসব সমস্যার পেছনে ইন্টারনেটের কোনো না কোনো ভূমিকা রয়েছে। পড়াশোনার কাজে ৯৪ দশমিক ১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও পড়াশোনার ফাঁকে অনলাইনে ঢোকার পর ৫২ দশমিক ৬ শতাংশের মনোযোগ নষ্ট হয় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটকে দায়ী করার সুযোগ কম। প্রযুক্তির ভালো-খারাপ উভয় দিকই রয়েছে। কোনটি নেয়া হবে তা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর ওপর। তাই শিশু-কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্করা কী উদ্দেশ্যে, কতক্ষণ এবং কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস, গেম কিংবা অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এক বিষয় নয়। এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নজরদারি করা কঠিন কাজ। কিন্তু শিশু-কিশোরদের মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার দায়দায়িত্ব অভিভাবকদের ওপর বর্তায়।

অভিভাবকদের নজরে রাখতে হবে সন্তান কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করছে, কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একেবারে অল্প বয়স থেকেই ফোন ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি না করা এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করা জরুরি। ফোন ব্যবহারের পাশাপাশি গল্প বলা, বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে। তবে অভিভাবকের নজরদারিও যথেষ্ট নয়। শিশু ঘরের মধ্যে বসেই এমন কনটেন্টের সংস্পর্শে আসতে পারে, যা তার বয়সের উপযোগী নয়। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, যৌন ও সহিংস কনটেন্ট, প্রতারণা কিংবা অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এ ঝুঁকিকে আরো দৃশ্যমান করেছে। তাই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রেরও সুস্পষ্ট ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুদের বয়স অনুযায়ী অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা, শিশুদের তথ্য ও গোপনীয়তা সুরক্ষা, ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ এবং অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর জবাবদিহির বিষয়ে কার্যকর বিধিমালা থাকা দরকার। বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শিক্ষার প্রয়োজন ও বয়স বিবেচনায় স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

এরই মধ্যে বিশ্বের অন্তত ১১৪ দেশ বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ ১৬ বছর বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্যই আলাদা। তাই অন্য দেশের নীতি হুবহু অনুসরণ না করে শিশুদের বয়স, শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে শিশুদের জন্য বিকল্প পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, নিরাপদে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সীমিত—এমন বাস্তবতায় শিশুর হাতে স্মার্টফোন দিয়ে পরে তাকে সেটি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হবে না। শিশুদের খেলাধুলা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিশুর হাতে ফোন না দেয়ার কথা বলার পাশাপাশি ফোনের বাইরে তাকে দেয়ার মতো একটি আকর্ষণীয় পৃথিবীও তৈরি করতে হবে।

আরও