ধনী
রাষ্ট্রের পাশাপাশি
বিশ্বের দরিদ্রতম
দেশ থেকে
বিভিন্ন গবেষক
ও নীতিনির্ধারককে
একত্রে একটি
প্লাটফর্মে যুক্ত
করার জন্য
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক
সংস্থার ত্রিবার্ষিকী
সম্মেলন ওয়ার্ল্ড
কংগ্রেস দীর্ঘদিন
ধরেই অর্থনীতিবিদদের
কাছে অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ এক
বৈশ্বিক সমাবেশ।
চলতি মাসের
শুরুতে অনুষ্ঠিত
হয়েছে সম্মেলনটির
১৯তম সংস্করণ।
সরাসরি নয়,
হয়েছে জুমে।
এছাড়া তেমন
কোনো ব্যতিক্রম
অবশ্য ঘটেনি।
বৈশ্বিক অর্থনীতি
আর পুঁজিবাদ
যে একটি
গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে
উপস্থিত, তা
নিয়ে আলোচনার
পুনরাবৃত্তি ঘটেছে
এবারের সম্মেলনে।
স্বাভাবিকভাবেই এর
কারণ হিসেবে
আমরা কভিড-১৯
সংকটের কথাই
বলব। অবশ্য
এর সঙ্গে
যোগ রয়েছে
আরো কয়েকটি
বিষয়েরও। যেমন
জলবায়ু পরিবর্তন
কিংবা ডিজিটাল
প্রযুক্তির উত্থানের
ফলে শ্রমবাজারের
অন্তর্নিহিত পরিবর্তন,
যা ক্রমেই
প্রকট হয়ে
উঠছে। মহামারীটি
যদিও এ
পরিবর্তন জোরদারের
পাশাপাশি স্বস্তিদায়কভাবেও
এগিয়ে নিচ্ছে।
একটা বিষয়
যেমন, কভিড-১৯
পরিস্থিতি কিন্তু
আমাদের অনেক
কিছুই ‘করতে
করতে শিখতে’
বাধ্য করেছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
কেনেথ জে.
অ্যারো অনেক
আগেই বিমূর্ত
এ ধারণার
প্রতি জোর
দিয়ে বলেছিলেন,
অনেক শিক্ষাই
‘অভিজ্ঞতার
ফসল’।
আমরা যেমন
জুমের মাধ্যমে
বক্তৃতা দেয়া
ও সম্মেলন
পরিচালনার মতো
কাজগুলো শিখে
নিয়েছি। ওয়েবেক্সের
মাধ্যমে মিটিং
করে কঠিন-জটিল
সব বিষয়ে
সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
লোকেরা ইদানীং
উপলব্ধি করছে,
অফিসে তারা
প্রয়োজনের তুলনায়
অনেক বেশি
সময় ব্যয়
করত, এখন
তারা বাড়িতে
থেকেই অফিসের
এ কাজগুলো
করতে পারে।
তাছাড়া ডিজিটাল
প্লাটফর্ম ব্যবহার
করে আমরা
এখন ঘরে
বসে কেনাকাটা
করাটাও শিখে
গেছি।
তাই মহামারী
শেষ হওয়ার
পর অফিস
বা এ
ধরনের জায়গার
চাহিদা কমে
যাবে। যেহেতু
বেশির ভাগ
মানুষেরই দূর
থেকে কাজের
স্বাধীনতা থাকবে,
তারা তাই
বাড়িতে বসেই
কাজ করতে
চাইবে। সেজন্য
আগে যেসব
জায়গায় বাসাবাড়ি
বা জমির
মূল্য কিংবা
ভাড়া তুলনামূলক
কম ছিল,
তা ধীরে
ধীরে বৃদ্ধি
পাবে এবং
অধিক ব্যয়বহুল
জায়গার মূল্য
ক্রমে হ্রাসের
মাধ্যমে এক
ধরনের সমন্বয়
ঘটবে।
অন্যদিকে বৃদ্ধি
পাবে বেতনবৈষম্য।
কারণ শ্রমবাজার
দক্ষ ও
মেধাবীদের নিয়োগ
দিয়ে উচ্চ
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি
‘কমন
পুলের’ দিকে
ঝুঁকবে। আরো
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হচ্ছে, প্রাথমিক
অবস্থায় ধাক্কা
খাওয়ার পর
বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া
ক্রস-কান্ট্রি
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে
দ্রুত ত্বরান্বিত
হবে। যা
শ্রমবাজার, জাতীয়
রাজনীতি আর
সংঘাতের প্রকৃতির
ওপর উল্লেখযোগ্য
প্রভাব ফেলবে
বলে মনে
করা হচ্ছে।
আমরা জানি,
অর্থশাস্ত্র এগিয়ে
চলে সুস্পষ্ট
অনুমান ও
স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিযোগিতার
ওপর ভিত্তি
করে। যদিও
বিজ্ঞানের সব
শাখাতেই এ
ধরনের অনেক
অনুমান বিদ্যমান।
এগুলো এতটাই
স্বাভাবিক যে
আমরা তা
নিয়ে খুব
একটা আলোচনার
প্রয়োজন বোধ
করি না।
মনে করি,
এগুলো তো
রোজকার ঘটনা।
১৯৫০ সালে
কেনেথ জে.
অ্যারো ও
জেরার্ড ডেব্রু
এক গবেষণায়
অ্যাডাম স্মিথের
‘অদৃশ্য
হাত’ ধারণাটিকে
বেশ ভালোভাবে
ব্যাখ্যা করতে
সমর্থ হন।
তারা মূলত
প্রথাগত একটি
কাঠামোর মাধ্যমে
স্মিথের ওই
ধারণার পক্ষে
প্রয়োজনীয় অনুমান
হাজির করেন।
অনেক অনুমান
আছে, যেগুলো
আগেই প্রমাণিত
বলেই ধরে
নেয়া হয়েছে।
যেমন ক্রেতা-বিক্রেতার
মধ্যকার অসম
অভিজ্ঞতার। আধুনিক
অর্থনীতির অন্যতম
অভিজ্ঞানের একটি
হচ্ছে, সবার
জ্ঞান বা
অভিজ্ঞতা সমান
নয়; যা
মূলত অদৃশ্য
হাতের ধারণাটিকে
সম্পূর্ণ ব্যর্থ
প্রমাণিতও করতে
পারে।
২০০১ সালে
জোসেফ স্টিগলিত্জ,
জর্জ আকেরলফ
ও মাইকেল
স্পেন্স তাদের
যুগান্তকারী গবেষণা
ফলাফলের মাধ্যমে
অর্থনীতিতে নোবেল
পুরস্কার পান।
গবেষণাটির মাধ্যমে
তারা বাজার
নিয়ন্ত্রণের নতুন
ধারণা প্রবর্তনের
মাধ্যমে আধুনিক
অর্থনীতিকে সম্ভব
করেছেন। পণ্য
ও মান
নিয়ন্ত্রণের মতো
অনেক বিধিবিধানের
জন্য আমরা
তাদের ওই
যুগান্তকারী গবেষণার
কাছে ঋণী।
তাদের গবেষণাটি
সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে,
অসম তথ্যের
ওপর ভিত্তি
করে বাজারের
অদৃশ্য হাত
কখনই মান
নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত
করতে পারে
না।
তাই বলা
যায়, অর্থনীতি
পেশার নতুন
বুদ্ধিবৃত্তিক আবিষ্কারগুলো
কেমন হবে
এবং তা
প্রয়োগের জন্য
আমাদের কী
ধরনের নিয়ম
প্রবর্তনের প্রয়োজন,
তা দেখার
প্রয়োজন। তবে
এটিও পরিষ্কার
যে পরিবেশের
ওপর মানুষের
চাপ বৃদ্ধির
বিষয়টি কোনোভাবেই
টেকসই হওয়ার
নয়। যা
আমরা এরই
মধ্যে উপলব্ধি
করতে সক্ষম
হয়েছি। তবে
এর মানে
এটিও নয়
যে আমাদের
কম প্রবৃদ্ধির
সঙ্গে মানিয়ে
চলতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে, আমি
মনে করি
অতীতে আমরা
যেমনটা দেখেছি,
আগামীতে প্রবৃদ্ধি
তার চেয়ে
অনেক দ্রুত
হবে।
উল্লেখ্য, জিডিপি
কিংবা জাতীয়
আয়বিষয়ক সাধারণ
ভুল বোঝাবুঝি
থেকে কম
প্রবৃদ্ধির বিষয়টি
উদ্ভূত। উচ্চ
জিডিপি প্রায়
ক্ষেত্রেই অধিক
অপচয় ও
ভোগবাদিতাকে সমর্থন
করে। আর
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে
অবশ্যই এমনটা
আর করা
যাবে না।
শিল্প, সংগীত,
নতুন নতুন
বিষয় শেখার
পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য
এবং দীর্ঘায়ুবিষয়ক
ব্যয়গুলো সবই
জিডিপির উপাদানের
মধ্যে পড়ে।
তাছাড়া এরা
পরিবেশগতভাবে অনেক
বেশি নিরাপদও।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার
সংস্কারের মাধ্যমে
দ্রুত জিডিপি
প্রবৃদ্ধি বাড়ানো
যেতে পারে,
কিন্তু এখন
সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপের
দিকে ঝোঁকার
প্রবণতার কারণে
জিডিপির উপাদানের
নাটকীয় পরিবর্তন
হচ্ছে। তাই
নতুন বিশ্ব
গঠনের জন্য
কী ধরনের
সংস্কার কার্যক্রম
গ্রহণ করা
উচিত, বিশ্বজুড়ে
তা এখন
আলোচনার বিষয়।
এদিকে নীতিনির্ধারকদের
এখন থেকেই
কিন্তু সৃজনশীলতাকে
ধারণ করে
এমন ধরনের
পাঠ্যক্রমের দিকে
মনোনিবেশ করতে
হবে। কারণ
রোজকার কাজগুলো
অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই
সম্পন্ন হবে।
তাই প্রচলিত
শিখন-পঠন
ব্যবস্থা হবে
অনেকটাই অকার্যকর।
পাশাপাশি আরো
যে দুটি
বিষয়ের ওপর
জোর দিতে
হবে, তা
হচ্ছে পরিবেশের
ওপর ক্ষতির
মাত্রা বেশি
এমন ধরনের
পণ্যের ব্যবহার
কমাতে হবে
এবং বৈষম্য
কমানোর জন্য
সম্পদ বণ্টনের
পরিবর্তন আনতে
হবে।
সম্প্রতি আমি
গ্রুপ মোরালিটির
ওপর একটি
গবেষণা কার্যক্রম
পরিচালনা করি।
‘দলগত
নৈতিকতা’-বিষয়ক
আমার গবেষণাটি
একটি সতর্কবার্তা
প্রদান করে।
আমি মনে
করি, আমাদের
তা মোকাবেলা
করা জরুরি।
বিষয়টি হচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তন
কিংবা বর্তমান
বৈশ্বিক বৈষম্য
নিয়ে আলোচনার
সময় আমাদের
মানুষকে অন্যান্য
বিষয়েও সচেতন
হওয়ার আহ্বান
জানাতে হবে।
অন্য কথায়,
শুধু নিজেদের
আজকের মঙ্গলের
দিকগুলো নিয়ে
চিন্তা করা
নয়, দরিদ্র
জনগোষ্ঠী আর
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
কল্যাণের বিষয়গুলোও
বিবেচনা করতে
হবে, কেননা
এরা সবাই
আমাদের সিদ্ধান্ত
দ্বারা প্রভাবিত
হবে।
নৈতিক দার্শনিকরা
কিন্তু অনেক
আগে থেকেই
জানেন যে
‘দলগত
নৈতিকতা’ খোদ
একটি সমস্যাযুক্ত
ধারণা। সামারিটান’স
কার্স বা
সামেরীয় অভিশাপ
নামে আমি
আমার সাম্প্রতিক
গবেষণাটিতে তুলে
ধরার চেষ্টা
করেছি যে
বর্তমান প্রজন্ম
যদি শুধু
নিজেদের কথা
বিবেচনা করে,
তবে তা
থেকে ভবিষ্যৎ
প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত
হবে। সমস্যাটি
অনেকটা ‘প্রিজনার্স
ডিলেমা’র
মতো। তাই
নৈতিক ক্ষেত্রে
এটি আমাদের
শোভন উদ্দেশ্যকে
পরাস্ত করতে
পারে।
সামনে এগিয়ে
যাওয়ার রাস্তাটা
খুব একটা
মসৃণ নয়।
পরিবর্তিত বিশ্বের
সঙ্গে তাল
মিলিয়ে চলার
জন্য অর্থনীতিবিদ
এবং সামগ্রিকভাবে
সমাজকে প্রগাঢ়
বুদ্ধিবৃত্তিক ও
নৈতিক চ্যালেঞ্জ
মোকাবেলা করতে
হবে। মানবজাতি
আগেও তা
করেছে। তবে
এবার আমরা
শুধু এটাই
আশা করতে
পারি যে
নিজেদের বোধবুদ্ধি
আর দৃঢ়
সংকল্প দিয়ে
আবার এটি
করতে আমরা
সফল হব।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
কৌশিক বসু: কর্নেল
ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির
অধ্যাপক
বিশ্বব্যাংকের
সাবেক প্রধান
অর্থনীতিবিদ ও
ভারত সরকারের
সাবেক প্রধান
অর্থনৈতিক উপদেষ্টা
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস