উন্নয়ন যাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ

গত ২৩ জানুয়ারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংক্ষেপে বিআইজিডির উদ্যোগে একটা পাবলিক লেকচার আয়োজন করা হয়েছিল। এ পাবলিক টকের মূল বক্তা ছিলেন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের প্রফেসর থমাস শেক্সপিয়ার।

গত ২৩ জানুয়ারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংক্ষেপে বিআইজিডির উদ্যোগে একটা পাবলিক লেকচার আয়োজন করা হয়েছিল। এ পাবলিক টকের মূল বক্তা ছিলেন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের প্রফেসর থমাস শেক্সপিয়ার। পাশাপাশি অন্য আলোচকরা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রতিবন্ধিতা’ নিয়ে আলোচনা করেন। এমন আলোচনায় উপস্থিত থেকে যে বিষয়টা অনুধাবিত হয় তা হলো, প্রতিবন্ধিতা একটি জটিলতর বাস্তবতা, যার বহুমাত্রিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অসংখ্য বিষয় সামনে চলে আসে। প্রচলিত সামাজিক মানসিকতায় প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যে ধারণাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সীমাবদ্ধতা আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবন্ধী শব্দটা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাওয়া যায়, একজন ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতা মূলত তার চারপাশে বিরাজমান বাস্তবতার মাঝে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোর ভিত্তিতে তৈরি হয়। সেই ভিত্তিতে প্রত্যেকেরই প্রতিবন্ধিতা আছে। আর একজন ব্যক্তিকে যখন চারপাশের বাস্তবতার (ভৌত ও অভৌত) পরিপ্রেক্ষিতে তার সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়, তখন নানা মাত্রার প্রতিবন্ধিতা সামনে আসে। এটা কেবলই দৈহিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদার সঙ্গে জড়িত নয়। ফলে প্রতিবন্ধী হয়ে ওঠার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির এক ব্যাপক যোগসূত্রতা আছে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সমাজে যে প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, সেটা কোনোভাবেই একটা মানবিক সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে না। এক্ষেত্রে বর্তমান জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ও তার যথাযোগ্য প্রয়োগ যেমন একটা প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে, পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডও বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ফলে প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তিমূলক একটা সমাজ তৈরি করতে হলে উভয় দিক থেকে একযোগে কাজ করাটা জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে আমলে নিলে এটার জরুরত আরো প্রকট হয়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে বড় একটা চ্যালেঞ্জ হলো, তার নাগরিকদের সঠিক মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করা আর এ উন্নয়ন যাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উন্নয়নের যে মহাসড়কে হাঁটছে, সেখানে নিজেকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমডিজি বা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলগুলো ভালোভাবে টপকিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে হাঁটছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সময়ের চাহিদা। এ লক্ষ্যে সমাজে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ বা প্রতিবন্ধীদের মূলধারার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে একীভূতকরণের ক্ষেত্রে নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটা সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা অত্যন্ত জটিল বিষয়, কেননা প্রতিবন্ধিতা স্বয়ং একটা জটিলতর বিষয়বস্তু। বর্তমান বাজারনির্ভর অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই তার অভিযোজন সহজতর হয়। তবে এখন পর্যন্ত সমাজে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, এ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে অক্ষম, তাই তাদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে নিয়ে এসে টিকিয়ে রাখার বিকল্প নেই। অনেকটা সামাজিক বোঝা হিসেবে প্রতিবন্ধীদের দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এটা হলো সামাজিক মানসিকতার সীমাবদ্ধতা বা এক ধরনের সামাজিক প্রতিবন্ধিতা। বিশ্বজুড়ে   প্রতিবন্ধিতা নিয়ে নানা গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখা যায়, প্রতিবন্ধীদের জন্য যদি তাদের বিশেষ চাহিদাগুলো মাথায় রেখে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনে পদক্ষেপ নেয়া যায়, তবে তাদের কর্মক্ষমতা ও সক্ষমতা প্রচলিত ধারণার সুস্থ শরীরের থেকে কোনোভাবেই খাটো নয়। প্রতিবন্ধীবান্ধব ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণ প্রদান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো দূরীকরণে এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এ লক্ষ্যে সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন ব্র্যাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কিছু উদ্যোগ এক্ষেত্রে আলোচনায় আসতে পারে উদাহরণ হিসেবে। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ব্র্যাক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে কাজ করে আসছে তার নানা সামাজিক উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় জনশক্তি উন্নয়নে ব্র্যাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম কাজ করছে স্কুল ঝরে পড়া দরিদ্র কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে। এক্ষেত্রে  প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের ইনফরমাল সেক্টরে কর্মসংস্থানের যে সুযোগ রয়েছে, সেটিকে মনোযোগে এনেছে। এখানে বিভিন্ন ট্রেড, যেমন মোবাইল মেরামত, গাড়ি মেরামত, ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামত, দর্জি এমনকি বিউটিশিয়ান হিসেবে এই দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত যুবসমাজকে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে আসছে। ব্র্যাকের উদ্ভাবনীমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের বাংলা হতে পারে ‘দক্ষতা ও সক্ষমতা জোরদারকরণ কর্মসূচি’। ব্র্যাক ‘স্থানীয় সমাজভিত্তিক যে বাজার চরিত্র’, সেটাকে আমলে নিয়ে পিছিয়ে পড়া শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য স্থানীয়ভাবে কাজ করছে। এখানে ব্র্যাক প্রশিক্ষণার্থীদের শ্রেণীকক্ষভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি তাদের ওস্তাদের সঙ্গে ওয়ার্কশপে বা প্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনেও তদারকি করছে, আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছে। ছয় মাসের বৃত্তিমূলক এ প্রশিক্ষণে একজন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ শেষে তার ওস্তাদের দোকানে বা অন্য কোনো দোকানে বেতনভিত্তিক কাজে লেগে যায়। ব্র্যাক স্থানীয় বাজারে শ্রমের সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বাজার কমিটি ও স্থানীয় মানুষদের নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া নারীবান্ধব স্থানীয় বাজার পরিবেশ-প্রতিবেশ তৈরিতেও কাজ করছে। কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ, যেমন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণবিষয়ক সচেতনতামূলক সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে থাকে। ব্র্যাকের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রশিক্ষণার্থীরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে স্থানীয় সমাজভিত্তিক শ্রমবাজারে তাদের যে সামাজিক যোগাযোগ বা সামাজিক পুঁজি থাকা প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। ব্র্যাকের প্রশিক্ষণটির প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব ও ব্র্যাকের সম্পৃক্ততা প্রশিক্ষণার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখে। এ দুই ধরনের পুঁজি স্থানীয় শ্রমবাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। একজন কর্মী হিসেবে স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার ক্ষেত্রে মালিকের  আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

এ দক্ষতা ও সক্ষমতা জোরদারকরণ কর্মসূচি ২০১৪ সাল থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টি নিয়ে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের একীভূতকরণের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ মূল স্রোতের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তিকরণের নিমিত্তে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে তাদের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করে। আর এ প্রশিক্ষণার্থীদের জীবনপ্রবাহে প্রশিক্ষণ চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে কী ধরনের পরিবর্তন হয়, তা বোঝার জন্য ২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত একটা বর্ণনাত্মক গবেষণার সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে দেখতে পাই যে এ প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সম্ভাবনার বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। এ গবেষণায় কাজ করার অভিজ্ঞতালব্ধ অনুধাবন হলো, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ এই অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত, সামাজিকভাবে উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ জীবনপ্রবাহে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে প্রত্যাশার নতুন দিগন্তের সূচনা করে। জীবনের সম্ভাবনা ও বিকাশের স্রোতে নতুন এক অনুনাদ তৈরি করে।

পরিশেষে যে বিষয়টা প্রতিভাত হয়, টেকসই লক্ষ্যমাত্রার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে এ রকম প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কেবল সামাজিকভাবে উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণে কাজ করছে না, বরং দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখছে। প্রতিবন্ধিতা ও আর্থসামাজিকভাবে উপেক্ষিত হওয়ার সঙ্গে দারিদ্র্যের এক চিরন্তন যোগসূত্র রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে সামাজিক সম্মানবোধ, আত্মসম্মানবোধ সর্বোপরি মানবাধিকারের। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার যুগে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সমন্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি অত্যন্ত জরুরি। আর এ ধরনের কর্মসূচিগুলোকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া বা সর্বজনীনতার জন্য উদ্ভাবনী গবেষণা অত্যন্ত আবশ্যক বলে অনুভূত হয়।

 

তানভীর শাতিল: উন্নয়ন গবেষক

বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও