সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাসে যান চলাচল হতে হবে পুরোপুরি আইন ও নিয়মভিত্তিক

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আগস্টে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য জানাচ্ছে, গত মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫০২ জন। এর মধ্যে ১৭৬ জন মোটরসাইকেলচালক কিংবা আরোহী ছিলেন। অর্থাৎ নিহতদের ৩৫ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এটি কেবল গত এক মাসে সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার চিত্র। কিন্তু সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং মৃতের সংখ্যা যে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে সেটি অন্যান্য সংস্থার পরিসংখ্যানে লক্ষ্য করলেও বোঝা যায়।

পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত, ১৩ মাসের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র সম্প্রতি প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৩২ দশমিক ১৪ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী ছিলেন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২০-২০২৪ সালের তথ্য বলছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ মোটরসাইকেলের আরোহী। এ পরিসংখ্যাগুলো একটা বিষয়কে স্পষ্ট করে যে বর্তমানে সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যান মোটরসাইকেল। সুতরাং সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হলে মোটরসাইকেল চলাচল নিয়মনীতির মধ্যে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি অন্যান্য যান চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মের পরিপালন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

দেশে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এছাড়া আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। বর্তমানে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সড়ক যাত্রী ও পথচারীদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক মাত্রায় সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু সড়কে যান চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির কোনো বালাই নেই। নানা বৈশিষ্ট্যের, বিভিন্ন গতিসম্পন্ন যানবাহন একই সড়কে চলাচল করছে। বিশেষ করে মিশ্র যানবাহন চলাচলের কারণে সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে ঢাকার সড়ক।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক তথ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক, ১৩২টি দুর্ঘটনার কথা উঠে এসেছে। এর পেছনেও শহরটিতে মোটরসাইকেল ও রিকশা-ভ্যানের মতো অযান্ত্রিক যানের আধিক্য বেড়ে যাওয়া অন্যতম কারণ। ‘আপডেটিং দ্য রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ফর ঢাকা’ নামক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার সড়কে মোট যানবাহনের ৪৯ শতাংশ অযান্ত্রিক বাহন (সড়ক পরিবহন আইনে ব্যাটারিচালিত রিকশা-অটোরিকশার মতো বাহন ‘মোটরযান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত নয়)।

গত এক দশকে রাজধানীতে মোটরসাইকেলের আধিক্য বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ রাইড-শেয়ারভিত্তিক পরিবহন হিসেবে মোটরসাইকেলের বাড়তি চাহিদা। আবার তুলনামূলক বেশি গতির কারণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যাও বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকাসহ পুরো দেশের সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বাহনগুলোর চলাচল নিয়ম-নীতির মধ্যে নিয়ে আসা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে কেবল মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, নিরাপত্তা জোরদার করা যাবে, এমন নয়। বরং বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রয়োজন মোটরসাইকেল বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা। এ যানগুলোর চলাচল বন্ধ করা যৌক্তিক নয়। কারণ এগুলোর সঙ্গে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রসঙ্গ জড়িত। আবার দেশব্যাপী গণপরিবহনের মান উন্নত না হওয়ায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে এ যানগুলোর প্রতি মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন যানগুলোর ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বাড়ানো।

অযান্ত্রিক যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা এক লেনে চলতে দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, এ দুই বাহন এক লেনে চলার কারণেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। তাই ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে দুই যানের গতির বিষয়ে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। নজর রাখতে হবে যেন কোনো মোটরসাইকেল ফুটপাতে না ওঠে। এ প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব নিয়মকানুন যদি কোনো চালক লঙ্ঘন করে তাহলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।

মূলত সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিতে যান চলাচল হতে হবে পুরোপুরি নিয়ম ও আইনকানুনভিত্তিক, যেখানে জানমালের নিরাপত্তা প্রাধান্য পাবে। নিরাপত্তা জোরদার করতে কোন সড়কে কেমন গতিসম্পন্ন যান চলবে- সেটি নির্ধারণ করতে হবে। এর বাইরে জরুরি হলো, পুরনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ করা। লক্কর-ঝক্কর যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

বিআরটিএ তথ্য বলছে, দেশে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়া যানবাহন আছে ৮০ হাজারের বেশি। আর ৬ লাখ ২৬ হাজার যানবাহনের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। দুঃখজনক বিষয় হলো, নানা সময়ে বিভিন্ন সরকার এসব যান অপসারণের উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। পরিবহন মালিকদের চাপে সরকারকে বারবার পেছনে সরতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা-বিশৃঙ্খলার আরেকটি কারণ হলো অদক্ষ চালক। বিআরটিএর হিসাবে, দেশে একটি বড় সংখ্যক পেশাদার ও অপেশাদার পরিবহনচালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আবার যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তাদের দক্ষতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে সড়ক-মহাসড়কে অননুমোদিত যানবাহন চলাচল, অদক্ষ চালক, সড়ক আইন প্রয়োগে শিথিলতা এ দেশে খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা পথেও নেমেছে। সে আন্দোলনের পর একটি আইন প্রণয়ন হলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি।

এত সমস্যাসংকুল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দেশের সড়ককে নিরাপদ করতে চাইলে সরকারের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। কাজের ধারাবাহিকতা ঠিক করা দরকার। এর শুরুটা হতে পারে মোটরসাইকেল ও রিকশা-অটোরিকশা চলাচল ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা। পাশাপাশি আরেকটি সমস্যার সমাধান জরুরি। রাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কম সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকে। এ সময়ও দুর্ঘটনা ঘটে। এ সমস্যা কীভাবে বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রশমন করা যায়, সেটি নিশ্চিতেও সরকারের মনোযোগ কাম্য।

আরও