এক
বরিশাল জিলা স্কুল থেকে অর্ধশত বছর আগে ১৯৭৫ সালে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এসএসসি) উত্তীর্ণ হয়ে স্কুল জীবন সমাপ্ত করেছিলাম। আজ সেকথা ভাবতেই মনে হয়, হায় মানুষের জীবন কতোই না সংক্ষিপ্ত! মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজছে। ক্লাসরুম থেকে লাইন করে আমরা বিভিন্ন শ্রেণীর ছাত্ররা স্কুলের মূল ভবনের দক্ষিণ পাশের মাঠে অ্যাসেম্বলিতে সমবেত হচ্ছি। সেখানে কুরআন তেলোয়াত শেষে শপথ গ্রহণ হবে। এরপর হবে সবার সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত। ১৯৬৭ সালে আমরা গেয়েছিলাম 'পাক সার জামিন শাদ বাদ'। আর ১৯৭২ সাল থেকে গাওয়া শুরু করলাম 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি'।
১৮২৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমাদের বরিশাল জিলা স্কুল। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এন ডাব্লিউ গ্যারেট। প্রথমে এর নাম ছিল Barisal English School (বরিশাল ইংলিশ স্কুল)। বরিশালের প্রথম হাই স্কুল হলো বরিশাল জিলা স্কুল। আগামী ২০২৯ সালে স্কুলের বয়স হবে দুইশ বছর। এ স্কুল থেকে পাশ করা ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে কীর্তিমান হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন অবিভক্ত বাঙলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। বরিশাল জিলা স্কুলের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি।
বরিশাল শহরের রাস্তাঘাট, মানুষের বসবাস আজকের মতো এমন কোলাহলময় ছিল না। ১৯৬৭ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে টিকেছিলাম। সেসময়ও জিলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতো। শিশু শিক্ষার্থীদের বাবা-মা, অভিভাবকদের টেনশনের অন্ত ছিল না। বরিশাল শহরে জিলা স্কুলের বাইরে ব্রজমোহন বিদ্যালয়, এ কে স্কুল, নুরিয়া স্কুল, সদর গার্লস স্কুল প্রভৃতি নামে আরো অনেক স্কুল ছিল। তখন বরিশাল জিলা স্কুল ছিল যশোর শিক্ষা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত। সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে মেধা তালিকায় জিলা স্কুলের অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। ফলে এই স্কুলে ছেলেদের ভর্তি করতে অভিভাবকদের আগ্রহ ছিল ব্যাপক।
আমার আগে ভাইয়া (এস.এম. ইমানুল হাকিম) জিলা স্কুলে ১৯৬৫ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। ফলে জিলা স্কুলের পরিবেশ সম্পর্কে আমার অনেকটা ধারণা ছিল। জানা ছিল স্কুলের কঠোর শৃঙ্খলার কথা। আমাদের স্কুল ড্রেস ছিল সাদা প্যান্ট/পাজামা ও সাদা সার্ট/পাঞ্জাবি। পায়ে যতদূর মনে পড়ে কাপড়ের সাদা জুতো (কেডস) পরতে হতো। তখন মাথায় টুপি পড়া চালু ছিল না।
স্কুলজীবনের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা, সহপাঠী বন্ধুদের কথা আজ বেশ মনে পড়ছে। তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত অনেক শিক্ষকের ছাত্রত্ব লাভ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, যারা ছিলেন সুদৃঢ় চরিত্র ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন ছাত্রদের ভেতরে পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করতে। আমরা যাতে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠি এ চেষ্টা অব্যাহতভাবে করে যেতেন। আজকের মতো তখন কোচিং ব্যবসা ছিল না। জিলা স্কুলের শিক্ষকদের যেমন সমাজে উচ্চ সম্মানের জায়গা ছিল, তেমনই বরিশাল জিলা স্কুলের ছাত্র শুনলে বরিশাল শহরের লোকেরা তাদের কদর করতো।
সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্কুল চলতো। মাঝে দুপুর ১টার দিকে টিফিন দেয়া হতো। এরপরে আধ ঘণ্টা ছিল লেজারের সময়। এ সময় ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, এক সঙ্গে হাটা, দৌড়াদৌড়ি, খেলাধুলা এসব চলতো। আমাদের ক্লাসে বন্ধুদের ভেতর হাতাহাতি বা মারামারির ঘটনা ঘটেছে এমন মনে পড়ে না। তবে মাঝে মধ্যে কারো সঙ্গে কারো আড়ি দেয়ার (কথা না বলার) ঘটনা ঘটেছে। তবে তার স্থায়িত্ব ছিল ২-৩ দিন।
আমার স্কুল জীবনে ১৯৬৯ সালে ঘটেছিল মনে রাখার মতো এক ঘটনা। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। পাকিস্তানের মিলিটারি শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব বাঙলায় ( পূর্ব পাকিস্তান) আন্দোলন চলছিল। সে সময় একদিন একটা মিছিল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে দিতে স্কুল চলাকালীন সময় স্কুলে ঢুকে পড়ে। এর ফলে ক্লাস ভেঙে যায়। আমরাও শ্লোগান দিতে দিতে মিছিলে যোগ দেই।
এরপর আসে ১৯৭০ সাল। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক ব্যাপক সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৫ লাখ মানুষ। আমাদের স্কুলের দীনিয়াত শিক্ষক মৌলবি বেলায়েত হোসেন স্যারের পরিবারের সবাই ওই সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে নিহত হন বলে খবর রটে। স্যার দ্রুত বরিশাল থেকে ঘটনাস্থল ভোলায় যান। পুত্র ফখরুলকে (আমাদের সহপাঠী) ফিরে পান জীবিত অবস্থায়।
১৯৭১ সাল ছিল আমাদের জীবনের বিরাট বাক পরিবর্তনের এক বছর। এ বছরের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব বাঙলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালায়। আমি আব্বা-আম্মা ও ভাইয়ার সঙ্গে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই মেঝ ফুপুর টুঙ্গিপাড়ার পারঝনঝনিয়া গ্রামের বাড়িতে মাসখানেক আশ্রয় নিয়ে নিজদের গ্রামের বাড়ি রহমতপুরে ফিরে গেলাম। জুলাইয়ে বরিশাল ফিরে স্কুলে গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাসের দুই সেকশন 'এ' এবং 'বি' মিলে এক সেকশন হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ে সব সময় কলেজ রোডের বাসায় আতংকে দিন কাটাতাম। কেননা পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধনের খবর মাঝে মাঝেই পেতাম। এ সময় একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় মুক্তিবাহিনীর দুজন সদস্য এসেছিলেন, যারা ছিলেন ব্রজমোহন কলেজে আব্বার ছাত্র। অস্ত্র কাঁধে তাদের দেখে সেদিন রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাবালক করে তুলেছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে সহজ করেছিল। বরিশাল জিলা স্কুলের অনেক অগ্রজ ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মৃত্যুবরণ করেছিলেন সেসব স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ মনে রাখেনি।
মনে আছে, ১৯৭৫ সালে আমাদের এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের ক'দিন আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে এক সামরিক ক্যুদেতায় নিহত হন।
আমার স্কুল জীবনের দিন আসলে স্মৃতিময়। সব কথা লেখার স্থান হয়তো এখানে পাওয়া যাবে না। স্কুল কম্পাউন্ডে আমাদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার। আমি স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিনের ছাত্র-প্রতিনিধি হয়েছিলাম প্রিয় শিক্ষক নাজিমউদ্দীন আহমেদ স্যারের স্নেহে। স্যার বলতেন, 'লালা আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি'। স্যারের স্নেহময় ডাক এখনো শুনতে পাই। খুব মনে পড়ে অংক আর জীববিজ্ঞানের অরবিন্দ দাশ স্যারের কথা। স্যার বলতেন, 'তুই অনেক বড় হবি'। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বলতে হয়, 'আমি আর কতো বড় হব?' নবম ও দশম শ্রেণীতে থাকাকালে ক্লাসের ক্যাপ্টেন ছিলাম বলে এখনো বন্ধুরা দেখা হলে ডাকে, 'ক্যাপ্টেন খবর কি?'
দুই
বরিশাল জিলা স্কুলের যে মূল ভবন, যার স্থাপত্যের গাম্ভীর্য আজও আমাকে টানে, সেই নান্দনিক ভবন ভেঙে ফেলেছিল কতিপয় বর্বর চিন্তার মানুষ। ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস করার এ বর্বরতা মেনে নেয়া যায় না। দেশের ও সমাজের আমূল পরিবর্তন ছাড়া এ বর্বরতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
২০১৮ সালে দেশজোড়া ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে বরিশাল জিলা স্কুলের ছাত্রদের ভূমিকা আমাকে গর্বিত করেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন করতে পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশ নৃশংসভাবে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল ১৫শ মানুষ। গত বছরের জুলাইয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের গণহত্যা প্রতিরোধে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক, জনতা সৃষ্টি করেছিল এক ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান। তৈরি করেছে এক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ও সাহস।
বরিশাল জিলা স্কুলের ১৯৭৫ ব্যাচের ৫০ বছর পূর্তিতে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি জানাই আমার গভীর শ্রদ্ধা ও লাল সালাম।
আমার শিক্ষক ও সহপাঠী যারা গত ৫০ বছরে মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
স্মৃতির এপিটাফে তাই লিখে রাখি :
কবি আবুল হাসানের কবিতার কয়েকটি লাইন:
'যতদূরে থাকো ফের দেখা হবে। কেননা মানুষ যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক। মিলে যায় – পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে!'
৫ ডিসেম্বর, ২০২৫