জাতীয় বাজেট শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট দেশের জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জনের হাতিয়ার। সরকারের ভিশন ও লক্ষ্য অর্জনে বাজেট শুধু দিকনির্দেশনার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং সরকার দেশের প্রবৃত্তি অর্জনে, সম্পদ আহরণে বা অন্যান্য সমস্যা সমাধানে কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে বা নেবে এবং দেশবাসীর প্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করছে বা করবে তার দিকনির্দেশনা থাকবে। এবারে বাজেট পেশের পরপরই বাজারে অস্থিরতা লক্ষ করা হচ্ছে। যার অর্থ, সরকারি কর্মচারীরা যে বাজেট তৈরি করেছেন তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বা আস্থা অর্জনে সফলকাম এখনো হয়নি। বরং সৎপথে যারা অর্থ উপার্জন করবে তাদের ওপর ট্যাক্স ধার্য হয়েছে ৩০ শতাংশ এবং যারা অসৎ উপায়ে বা ঘুস-চুরি করে উপার্জন করবে তাদের ট্যাক্স হচ্ছে ১৫ শতাংশ বা কালো টাকার অর্ধেক। জনগণ মনে করে এর মাধ্যমে দুর্নীতি আরো বাড়বে, টাকা পাচারও আরো বাড়বে।
বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে বাজেট তৈরি করা মোটেই সহজ নয়। দেশে এখন বেশ কয়েকটি বড় সমস্যা আমাদের মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যেমন (১) মুদ্রাস্ফীতি কমানো, (২) অধিকতর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, (৩) রাজস্ব বৃদ্ধি, (৪) ব্যাংক ঋণ কমানো যাতে ক্রাউডিং-আউট ইফেক্ট না দেখা দেয়, অর্থাৎ সরকার ব্যাংক থেকে সব ঋণ নিয়ে নিলে ব্যবসায়ীরা কোনো ঋণ পাবে না। অথচ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করা হলে কর্মসংস্থান বাড়ত। সরকার বড় অংকের ঋণ নিয়ে গেলে বেসরকারি খাতের জন্য তেমন কিছু থাকবে না, (৫) এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ছিল তা ধরে রাখা বা বাড়ানো, (৬) দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো, (৭) ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থা ফেরানো, (৮) মানুষের প্রত্যাশা পূরণ ইত্যাদি। এবারের বাজেটে এগুলো আলোচনায় এসেছে, তবে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেই যার ফলে জনমনে এত নিরাশা।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অনেকগুলো বাজেট দিয়েছেন এবং তার বাজেটগুলোয় লক্ষ্য, দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া তাতে নতুন নতুন ইনোভেশন বা চমক ছিল। যেমন জেন্ডার বাজেটিং, জেলা বাজেট, শিশুদের বাজেট, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি, বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা চান, অর্থাৎ জনগণকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্পৃক্ত করা তা তার বাজেটে ছিল। তিনি একাধিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট প্রস্তুত করতেন। এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় তা লক্ষিত হয়নি। এ প্রতিকূল পরিবেশেও কোনো চমক নেই বা আশার দিকনির্দেশনা নেই।
দেড় বছর ধরে দ্রব্যমূল্য কমানোর জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে পারছে না। আগামী ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে তা জনগণ বিশ্বাস করতে পারছে না। তাছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন দরকার তা এ বাজেটে অনুপস্থিত। প্রচলিত নিয়মে যারা আয়কর দেয় তাদের ওপর আরো অধিকতর করের বোঝা আরোপিত হবে এবং দেশের বৃহত্তর জনগণ এ বাজেটে করের আওতামুক্ত থাকবে এটা দেশের জন্য মঙ্গলকর নয়। করের পরিধি এবং রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন—যাদেরই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আছে তাদেরকেই ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করা এবং বর্তমান টিআইএন নম্বর কোম্পানিগুলোর জন্য বরাদ্দ করা। এ নিয়ম চালু হলে কর আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে এবং রাজস্ব আয়ের পরিমাণও অনেক গুণ বাড়বে বৈকি। তাহলে সরকারকে অধিকতর ঋণের বোঝা বহন করতে হবে না। বর্তমান নিয়মে রাজস্ব আয়ের ২৩ শতাংশ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয়িত হবে যা দেশের জন্য সুখকর নয়।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী