উন্নয়নের ‘গিনিপিগ’

এই এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে লকডাউনের মধ্যে প্রথম দফায় গার্মেন্টস চালু রাখার সিদ্ধান্তের ফলাফল কতটা ভয়াবহ ছিল সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গণপরিবহন বন্ধ। যানবাহন নাই। এরই মধ্যে কাজ হারানোর শঙ্কায় ঢাকায় এসেছিলেন লাখো শ্রমিক। এদের অনেকেই ৬০/৭০ তো বটেই একশ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছেছিলেন ঢাকায়। করোনাকালে জীবন বাঁচাতে সব মানুষকে যখন ঘরবন্দী হয়ে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে , এমন সময়ে ঢাকায় টেনে আনা হয়েছিল পোশাক শিল্প শ্রমিকদের। দলে দলে গাদাগাদি করে ঢাকা অভিমুখী হয়েছিল তারা। করোনা ঝুকির মধ্যে শ্রমিকদের বাঁচা -মরা নিয়ে ভাবার সময় কোথায় সংশ্লিষ্ট কর্তব্যক্তিদের! ওই যাত্রায় প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ

২৪ এপ্রিল তারিখটি এখনো অনেকের স্মৃতিতেই টাটকা। রানা প্লাজা ধসে মারা গিয়েছিল সহস্রাধিক পোশাক শিল্প শ্রমিক। মাত্র সাত বছর আগের ঘটনা। পৃথিবীতে শিল্প কারখানার ইতিহাসে মানুষ সৃষ্ট এত বড় বিপর্যয় আর আছে কি-না জানা নাই। তবে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের বাংলাদেশে কি চোখে দেখা হয় সেটা সবারই জানা। করোনা প্রকোপের কারণে ৫ মে তারিখ পর্যন্ত গণপরিবহন বন্ধ। এরই মধ্যে গার্মেন্টস কারখানা চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হল। ২৪ এপ্রিল তারিখের ৪৮ ঘণ্টা না পেরোতেই নেয়া হল গার্মেন্টস চালুর সিদ্ধান্ত। লকডাউনের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দফায় গার্মেন্টস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত।

এই এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে লকডাউনের মধ্যে প্রথম দফায় গার্মেন্টস চালু রাখার সিদ্ধান্তের ফলাফল কতটা ভয়াবহ ছিল সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গণপরিবহন বন্ধ। যানবাহন নাই। এরই মধ্যে কাজ হারানোর শঙ্কায় ঢাকায় এসেছিলেন লাখো শ্রমিক। এদের অনেকেই ৬০/৭০ তো বটেই একশ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছেছিলেন ঢাকায়। করোনাকালে জীবন বাঁচাতে সব মানুষকে যখন ঘরবন্দী হয়ে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে , এমন সময়ে ঢাকায় টেনে আনা হয়েছিল পোশাক শিল্প শ্রমিকদের। দলে দলে গাদাগাদি করে ঢাকা অভিমুখী হয়েছিল তারা। করোনা ঝুকির মধ্যে শ্রমিকদের বাঁচা -মরা নিয়ে ভাবার সময় কোথায় সংশ্লিষ্ট কর্তব্যক্তিদের! ওই যাত্রায় প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

এখানেই শেষ নয়। গণপরিবহন না থাকায় একই ভোগান্তির মধ্য দিয়েই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল পোশাক শিল্প শ্রমিকদের।  দেশব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে নেয়া হয়নি বিবেচনার মধ্যে। এখনো গণপরিবহন বন্ধ। আবারো সেই চিত্র। শুধু ঢাকার আশপাশ থেকেই নয় দূরদুরান্ত থেকে পোশাক শিল্প শ্রমিকরা ছুটে আসছেন ঢাকায়। কিছুটা পথ ইজিবাইক , ভ্যান যোগে আর  পায়ে হেঁটে দূরত্বকে পরোয়া না করে কাজে এসেছেন তারা। 

এ যেন ,ইচ্ছা হলেই পোশাকশিল্প শ্রমিকদের নিয়ে আসা যায়। আবার ইচ্ছা হলেই একটিমাত্র ঘোষণাতেই তাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া যায়।  যানবাহন আছে কি নাই , কীভাবে শ্রমিকরা আসবে কিংবা বাড়ি ফিরবে, এ প্রশ্নগুলোই অবান্তর! ওরা পোশাকশিল্প শ্রমিক , ওদের বাঁচা -মরা হিসাবের মধ্যে আসবে কেন? করোনা ঝুঁকি সবার জন্য সমান , এটি গার্মেন্টস শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে না!  আগে উন্নয়ন পরে শ্রমিকদের জীবন - মরণ! 

উন্নয়নের ধারাবাহিকতার স্বার্থে প্রজন্ম পরম্পরায় এক অলিখিত দাসখত যেন লিখে দিয়েছে পোশাক শ্রমিকরা। দেশের বেহাল শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বেআব্রু অর্থনীতির সম্ভ্রম রক্ষার দায় তাদের। বিপরীতে প্রাপ্তি পোড়া মাথা, ছিন্ন ভিন্ন দেহ, হাত - পা নিয়ে শেয়াল কুকুরের টানাটানি। গার্মেন্টস কারাখানায় অগ্নিকাণ্ডকে অনিবার্য নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে শ্রমিকরা। 

বাংলাদেশে গার্মেন্টস একটা শিল্প বটে! সব কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। বিদেশী যন্ত্রপাতি। বিদেশী অর্ডার। এক্সপার্টও  বিদেশী।  বাকি থাকল চিপ লেবার (সস্তা শ্রম)। চার দশক ধরে আমাদের সেলাই দিদিমনিদের সস্তা শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত এই ইন্ডাস্ট্রি! 

যুগ পরম্পরায় আমাদের নারীদের সুচীকর্মের যে দক্ষতা তা যেন মূল্যহীন! কথিত আছে, ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের নারীদের সুচীকর্মের দক্ষতা। মসলিন শিল্পের মূল কারিগর ছিলেন আমাদের নারীরা।  মসলিন শিল্পকে শেষ করার জন্য , ব্রিটিশ রাজের সিপাহীরা আঙ্গুল কেটে নিয়েছিল আমাদর নারীদের। তবে শিল্পবিপ্লব সম্ভব হলেও আমাদের নারীদের কাছ থেকে সুচীকর্মের দক্ষতাকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি ব্রিটিশ রাজ শাহী। সেই রক্তই বহন করছে আমাদের হালের সেলাই দিদিমনিরাও । আর্থিক মূল্য নাই, সামাজিক মূল্যের তো প্রশ্নই ওঠে না, তবুও পরমযত্নে উত্তরাধিকার সেই রক্তের দায় বহন করে চলেছে আমাদের এসময়ের সেলাই দিদিমনিরা।  

বিজিএমইএর প্রোটিনসমৃদ্ধ কর্তাব্যক্তিরা দেশের সবচেয়ে বড় ভিভিআইপি। তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছাই সব।  পোশাক শ্রমিকদের সুচীকর্মের দক্ষতাকে তো কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছেন তারা। ইংরেজদের মতো তো আর আঙ্গুল কেটে দিচ্ছেন না তারা! এই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ (!) প্রজন্ম পরম্পরায় জীবনীশক্তির সবটুকু আমাদের সেলাই দিদিমনিরা গার্মেন্টস মালিকদের দিচ্ছেন , এটা নিয়ে আবার কথা বলার কী আছে? শ্রমিকরা থাক তাদের সেলাই ফোঁড়াই নিয়ে, ডলারে মালিকানা, ব্যাংক - বীমা প্রণোদনা সবই  উন্নয়ন ফেরিওলাদের.....।

মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যবহার করা হয় গিনিপিগকে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই গিনিপিগের শরীরের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার পর তা কাজে লাগানো হয় মানুষের জন্য। আমাদের সেলাই দিদিমনিরা তথা পোশাক শিল্প শ্রমিকরা যেন সেই উন্নয়নের গিনিপিগ। চাইলেই এক ঘোষণাতেই তাদের ঢাকা থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া যায়। গণপরিবহন বন্ধ তাতে কী? আবার এক ঘোষণা দিয়েই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় টেনে আনা যায়। লকডাউন , করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এসব সেলাই দিদিমনিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেননা ওরা তো উন্নয়নের গিনিপিগ! সুতরাং উন্নয়নের প্রয়োজনে তাদেরকে ‘যেমন খুশি তেমন সাজাও’।  

লেখক: নাজমুল হক তপন, সাংবাদিক

আরও