মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর এজেন্সি বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে

সংবাদমাধ্যমেই বলা হয়েছে, এখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে না। তবে এ নিয়ে আলোচনা চলমান থাকায় কিছুটা আশা রয়েছে। কিন্তু বাজার খোলার আগে কাঠামোগত সংস্কার না হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য

শফিকুল ইসলাম নামের এক শ্রমিক ধার করে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। সেখানে চাকরি মেলেনি, নিয়োগকর্তা উধাও। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুয়ালালামপুরের বাইরে এক পোড়ো বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। ব্লুমবার্গের তদন্ত প্রতিবেদন তার গল্প বিশ্বকে জানিয়েছে। শফিকুলের মতো লাখো মানুষের গল্প এখনো অলিখিত। এখনো অনেকে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। সেক্ষেত্রে মালয়েশিয়া অনেকেরই পছন্দের গন্তব্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষে বর্তমানে তিনি চীনে অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের রেমিট্যান্স খাতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ সফরের এজেন্ডায় শ্রমবাজার আবারো খোলার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, খুব শিগগিরই শ্রমবাজার খুলছে না। কারণ বিগত তিন দশকে বারবার একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে শ্রমিক যায়, সিন্ডিকেট বা মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ন্য বাড়ে, দুর্নীতি বাড়ে এবং বাধ্য হয়ে মালয়েশিয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রতিবারই বাংলাদেশকে অনুরোধ করে আবার শ্রমবাজার খোলার কূটনৈতিক তোরজোর চালাতে হয়। দায়ীদের চিহ্নিত করা হয় ঠিকই কিন্তু শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না। আবারো অতীতের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বারবার এমন অস্বস্তিকর অবস্থা কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতাই বেশি দায়ী। মালয়েশিয়ায় ১৯৮৬ সালে প্রথম শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। ঐ সময় প্রায় ৫০০ শ্রমিক বাগান খাতে কাজ করতে যান। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক নেয়ার জন্য চুক্তি হয়। তখন থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ওই দেশে শ্রম বিনিয়োগ করতে যান। কিন্তু শুরুতেই অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এ বাজারটিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ১৯৯৬ সালে বড় এক কেলেঙ্কারি প্রকাশ পায়। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা পাসপোর্ট নবায়নের নামে পঞ্চাশ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০-৩০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত আদায় করতে শুরু করেন। এভাবে তারা এক থেকে দেড় কোটি টাকা আত্নসাৎ করেন। এ দুর্নীতির ফলে হাজারো শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েন। এত বড় কেলেঙ্কারির পর একজন কর্মকর্তাও শাস্তি পাননি।

পরবর্তীতে কাঠামোগত সংকটের কারণে আবারো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়। ১৯৯৭ সালে এশিয়ান আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে। তারপর থেকে নিষেধাজ্ঞা-প্রত্যাহার-নতুন সিন্ডিকেট-নতুন নিষেধাজ্ঞার এই চক্র প্রতি কয়েক বছরেই ঘুরে এসেছে। ২০০৮-০৯ সালে শ্রমিকদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগে দ্বিতীয় দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা আসে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ মেলে। ২০১২ সালে জিটুজি চুক্তির আওতায় পুনরায় যাত্রা শুরু হয়। ওই সময় শ্রমিকপ্রতি খরচ মাত্র ৩২ হাজার ১০০ টাকায় সীমিত রাখা হয়। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালে জিটুজি ব্যর্থ হলে মাত্র ১০টি বেসরকারি এজেন্সিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এটিই সিন্ডিকেট গঠনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। ২০১৬-১৮ সালে ওই ১০ এজেন্সি তিন লাখেরও বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠায়। তখন জনপ্রতি ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত আদায় করা হয়। ২০১৮ সালে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগে তৃতীয় বড় নিষেধাজ্ঞা আসে। মালয়েশিয়ার মানবাধিকার মন্ত্রী অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন।

আবার ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে আবারো পাঁচ বছর মেয়াদী এমওইউ সাক্ষরিত হয়। তখন আরো ১০০টি এজেন্সিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেটিও আরেকটি সিন্ডিকেটের ভিত্তি গড়ে দেয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে এবং ১০০টির মধ্যে শুরুতে মাত্র ২৫টি এজেন্সি কার্যক্রম শুরু করে। ২০২২-২৪ সালে ১০০ এজেন্সির সিন্ডিকেট ৪ লাখ ৭৬ হাজার শ্রমিক পাঠায়। সরকার নির্ধারিত মাইগ্রেশন খরচ ছিল জনপ্রতি ৭৮,৯৯০ টাকা। শ্রমিকরা প্রকৃতে দিয়েছেন গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। তবে অনুমিত আত্মসাৎ ১৪ হাজার থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা। এই ১০০ এজেন্সি বাছাইয়ের পেছনে কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা ছিল না। অভিযোগ, সব বাছাই করা এজেন্সি আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে। মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ২৫টি মামলা, ৬৪ জন অভিযুক্ত, অভিযুক্ত অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রতিটি কেলেঙ্কারির পর একই প্যাটার্ন দেখা যায়। তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু রায় আসে না। অভিযুক্তরা চিহ্নিত হন, কিন্তু শাস্তি পান না। সরকার বদলালে মামলা থেমে যায় বা ‘মীমাংসা’ হয়। একই ব্যক্তিরা নতুন নামে আবার সক্রিয় হন। ২০২৫ সালের আগস্টে মালয়েশিয়ার মালয়েশিয়াকিনি পত্রিকা রিপোর্ট করে, বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার অনুরোধে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে। এই খবরে ২৩টি সংগঠনের জোট ‘বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্র্যান্টস’ তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

সংবাদমাধ্যমেই বলা হয়েছে, এখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে না। তবে এ নিয়ে আলোচনা চলমান থাকায় কিছুটা আশা রয়েছে। কিন্তু বাজার খোলার আগে কাঠামোগত সংস্কার না হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। প্রথমেই আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ২০২২-২৪ সালের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমস্ত মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দুদকের তদন্ত রাজনৈতিক চাপে যেন স্থগিত না হয়, তার আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে এজেন্সি বাছাইয়ের বিষয়টি একটি বড় সমস্যা। এজেন্সি বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ পয়েন্ট সিস্টেম ও সর্বজনীন অনলাইন প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। এমনকি সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের পরিবার রিক্রুটিং এজেন্সিতে মালিকানা রাখতে পারবেন না, এ বিষয়ে আইন করতে হবে। প্রতিটি শ্রমিকের পরিশোধিত অর্থ কেন্দ্রীয় ডিজিটাল সিস্টেমে বাধ্যতামূলক রেকর্ড। অতিরিক্ত ফি নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেম ফ্ল্যাগ করবে। আমাদের আবার জিটুজি সিস্টেমে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল) শক্তিশালী করে সংশোধিত জিটুজি মডেল চালু করা যায়। এক্ষেত্রে নেপালের মডেল অনুসরণ করা যায় যেখানে নিয়োগকর্তাই মাইগ্রেশন খরচ বহন করেন। এজেন্সি বাছাই নীতি, মাইগ্রেশন খরচ সীমা ও লঙ্ঘনে নিষেধাজ্ঞার ধারা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বেস্টিনেটের মতো একক বেসরকারি কোম্পানি ওয়ার্কার ম্যানেজমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

গত তিন দশকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের শ্রম অভিবাসন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গল্প। এ ব্যর্থতা দূর করার সময় এসেছে। তবে এক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা।

ফেরদৌস বাপ্পী: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

আরও