আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বিশ্বের বিস্ময়।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আমরা দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) বাস্তবায়ন করছি এবং একটি সমৃদ্ধ রাজস্ব ভাণ্ডার গড়ে তোলার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, যুগোপযোগী ও জনবান্ধব রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) লাইফলাইন হিসেবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এর পরও কিছু খবর ও নিদারুণ বাস্তবতা আমাদের ব্যথিত করে। বিশেষত, যখন দেখি জনগণের করের টাকার এডিপি বাস্তবায়নে নয়ছয় বা ধীরগতিতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রতি মাসে দেশের চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের তথ্য হালনাগাদ করে। তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বাস্তবায়নের এ হার গত ১৪ অর্থবছরের একই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত অর্থবছরে একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরগুলোর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গত ১৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধের হিসাবে বিভিন্ন হারে এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে গত ১৪ অর্থবছরের কোনো অর্থবছরেরই প্রথমার্ধে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশের কম হারে বাস্তবায়ন হয়নি। আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, মোট ৬১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে।
ডলার সংকটে বিদেশী ঋণ সহায়তার প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। তবে আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, অর্থবছরের অর্ধেক পার হয়ে গেলেও প্রকল্প সাহায্যের এক টাকাও ব্যয় করতে পারেনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এছাড়া আটটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এ উৎসের ব্যয় ১১ শতাংশের কম। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এখনো খরচের খাতা খুলতে পারেনি সরকারি কর্মকমিশন। আটটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়ন হার এখনো ৮ শতাংশেরও কম। চলতি অর্থবছর এডিপির মোট আকার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে দেয়া হচ্ছে ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। বিদেশী ঋণের উৎস থেকে ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ ১১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। মোট ১ হাজার ৩৪০টি প্রকল্পের বিপরীতে এ বরাদ্দ রয়েছে।
প্রতি বছর বিশাল আকারের এডিপি নেয়া হয়। এর দরকারও আছে। কেননা, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়া। সেই হিসেবে দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, রাজধানী শহর থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে এসব প্রকল্পের দরকারও আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বছর শেষে এই এডিপি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আর বাস্তবায়ন করা যায় না। এমনকি দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছরই প্রায় অর্থবছরের মাঝপথে সেই এডিপির আকার ছোট করা হয়। আরো দুঃখজনক, শেষ পর্যন্ত সংশোধিত এডিপিও বাস্তবায়ন করা যায় না। এটাই এডিপি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নিয়মিত চিত্র হয়ে গেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে এই ধীরগতি কেন? দেখা যায়, যখন বছরের শুরুর দিকে এডিপি ঘোষণা করা হয়, অথবা নতুন প্রকল্প অনুমোদনে একনেকে উপস্থাপন করা হয়, তখন বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষ থেকে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয়া হয়। এডিপি কাটছাঁট করার পক্ষে কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবেও যে প্রকল্পের অর্থ খরচ করা যাচ্ছে না, এটা স্বীকার করা হয় না। আবার বছরের শেষ দিকে এসে তাড়াহুড়া করে যে প্রকল্পের টাকা খরচ করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শেষ ভাগে তাড়াহুড়ার কারণে প্রকল্পের গুণগত মান বজায় থাকে না। উন্নয়নের সুফল নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
অনেক প্রকল্প আছে, দেখা গেছে তিন বছরের প্রজেক্ট, সেটা শেষ করতে সাত-আট বছর লেগে যাচ্ছে। অথচ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতায় জনগণের ভোগান্তি ও হয়রানি যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়তি বাজেট গুনতে হয়, যা গরিবের রক্তচোষা অর্থ। এদিক থেকে একটু আশার দিক হচ্ছে, বাংলাদেশে জাপানিদের নেয়া প্রজেক্টগুলো যথাসময়েই শেষ হয়। তারা অর্থ বাঁচায় এবং তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়। যথাসময়ে প্রজেক্ট শেষ না হওয়ার ফলে বাংলাদেশের এ পর্যন্ত কত হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই, তার কোনো হিসাব আছে কিনা দেখতে হবে। এ অর্থের হিসাব প্রকাশ হলে দেশবাসী প্রজেক্ট সংশ্লিষ্টদের ধিক্কার দেবে এবং ঘৃণা করবে এবং তার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের পরিবার তার জন্য লজ্জা পাবে বৈকি।
প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, ঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এডিপি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাব আর নতুন প্রকল্প পাসের দিকে ঝোঁক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। কর্মকর্তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান না থাকা যা ইচ্ছাকৃত গাফিলতির জন্য বা তাদের অদক্ষতায় সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নানা কারণে অনেক সময় তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নেয়ার রীতিও সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দরকার নেই, অথবা গুরুত্বহীন প্রকল্পে নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে বছরের পর বছর প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। সময়মতো প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় অর্থের অপচয় হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বরাবরই কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ এবং তা নির্ধারিত সময়ে শেষ করার তাগিদ দেন। নির্ধারিত সময়ে ও বাজেটে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট জেনারেল পার্কের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। সেই সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে সুষম গতি নিয়ে আসা আর উন্নয়নের সুফল ঠিকমতো নিশ্চিত করতে দেশটিতে একটি মডেল অনুসরণ করা হয়। সেটি হলো, যখন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বা পরিচালক নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতে পারবে না, তাকে তখন শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। তার অক্ষমতার জন্য তাকে পদে অবনমিত করা, তাকে জরিমানা এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জেল-জুলুম ও চাকরিচ্যুত করা হয়। আর তিনি যদি ঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তার ইনক্রিমেন্ট, প্রমোশন বা বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার রীতি চালু করা হয় এবং জেনারেল পার্কের অনুরূপ ব্যবস্থা নেয়ার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো প্রকল্প সম্পন্ন হতে অহেতুক দেরি বন্ধ হয়ে যায় এবং জনগণের হয়রানি কমে এবং টাকাও বাঁচে। বাংলাদেশেও এমন রীতির প্রয়োজন।
যদিও মানসম্মত উন্নয়ন কার্যক্রম নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ার প্রবণতা ও ব্যয় বৃদ্ধি এড়াতে দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে প্রকল্প পরিচালকদের একটি পুল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নির্দেশনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে হবে। এখন সব থেকে বেশি যেটা দরকার, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেটা আমাদের বেছে নিতে হবে। এগুলো চিহ্নিত করতে হবে, কোন প্রকল্পগুলো সামান্য কিছু টাকা দিলেই আমরা শেষ করে ফেলতে পারব। প্রকল্পগুলো যত দ্রুত শেষ করে ফেলা যায় ততই ভালো। কারণ, একটি প্রকল্প শেষ হলে তার ফল আসে। আমরা লাভবান হই এবং নতুন প্রকল্প নিতে পারি। নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে সেটা তাৎক্ষণিক গ্রহণ না করে প্রতিটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে এটাই মাথায় রাখতে হবে সেখানে আমাদের কী পরিমাণ টাকা ব্যয় হবে, আমরা কী পরিমাণ ঋণ নিচ্ছি এবং সুদসহ কী পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং সেটা করার মতো আমাদের সক্ষমতা আছে কিনা এসব যাচাই-বাছাই করা একান্তভাবে দরকার। অযথা ঋণ করে নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ ঋণের অর্থ সুদসহ আমাদেরকেই পরিশোধ করতে হয়। তাই এই বোঝা যাতে আমাদের কাঁধে না পড়ে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি যে প্রকল্প আমরা নেব সেটা আমরা ওই কাজের বা ওই এলাকার জন্য কার্যকর কিনা এবং এর থেকে সাধারণ মানুষ কী পরিমাণ লাভবান হবে সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া অর্থনীতিতেও কেমন গতি সঞ্চার হবে তাও দেখতে হবে। তাছাড়া প্রকল্প সম্পাদনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করলে কাজটি ত্বরান্বিত হবে এবং সেই সঙ্গে ঘুস-চুরি-দুর্নীতি কমতে পারে।
২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ, বিশ্ববাজারে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হারানোর আশঙ্কার বিপরীতে নতুন নতুন সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, প্রজেক্টগুলো কীভাবে অন-টাইম সম্পন্ন করা যায় ইত্যাদি সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী