আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। টিকে থাকার প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। নিজেদের স্বার্থে দেশগুলো জোটও গঠন করে। এর পেছনে থাকে বাণিজ্য ও রাজনীতি। সে কারণে বৈদেশিক বিভিন্ন ঋণ, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা আসে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ ও সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রয়েছে। বরং দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়েছে ও বাণিজ্য আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে প্রায় সব বড় অর্থনীতির দেশের সঙ্গেই রয়েছে বাংলাদেশের কারবার। দেশের রফতানি পণ্যের দুটি প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশের মোট আমদানির সবচেয়ে বেশি আসে চীন থেকে। দুই নম্বরে রয়েছে ভারত। এরপর সবচেয়ে বেশি আমদানি পণ্য আসে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া। এফডিআইয়ের উৎস হিসেবে পিছিয়ে রয়েছে চীন, ভারত ও রাশিয়া। তবে দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পে ঋণ দেয়া ও বাস্তবায়নে তারা এগিয়ে রয়েছে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীন। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেস ও কর্ণফুলী টানেলসহ বেশকিছু অবকাঠামো নির্মাণে দেশটির অর্থায়ন রয়েছে। আবার, ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা এখন বাংলাদেশ। রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মাণ হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া থেকে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার ঋণ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঋণ ও সহযোগিতা দেয়ার তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে জাপানও। বিগ বি কৌশলের আওতায় মাতারবাড়ীতে জাপান বড় বিনিয়োগ করেছে।
রফতানি পণ্য ও এফডিআইয়ের উৎস হিসেবে এগিয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ বাংলাদেশকে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। দেশের সুবিধাবঞ্চিত, বস্তিবাসী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য এসব দেশ অর্থ ব্যয় করে। কভিড মহামারীর সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে দিয়েছিল।
আমদানি, রফতানি, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা ছাড়াও দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও যুক্তরাজ্যের ওপর। অর্থনৈতিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রতি বছর দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব দেশে পড়তে যান। তাদের অনেকেই সেখানে থেকে গিয়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন।
যুক্ত বিশ্বে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিকাশে উন্নত দেশগুলো অবদান রাখে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ‘নির্ভরশীলতা’ উন্নয়নমূলক সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী এ জি ফ্রাংকের নির্ভরশীলতা তত্ত্ব রয়েছে। তার দাবি, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এসব দেশের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আসার অর্থ হলো ক্রমাগত অনুন্নয়ন। আরেক সমাজবিজ্ঞানী জন জে ম্যাকিওনিসের মতে, ‘নির্ভরশীলতা তত্ত্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের একটি মডেল, এর মাধ্যমে ধনী দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে গরিব দেশগুলোকে শোষণ করে এবং বৈশ্বিক অসমতাকে স্পষ্ট করে। দস সান্তোসের ভাষায়, ‘নির্ভরশীলতা এমন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণকারী অবস্থা, যেখানে একই গ্রুপভুক্ত দেশের অর্থনীতি অন্যান্য দেশের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।’
অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব সোসিওলজিতে নির্ভরশীলতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নির্ভরশীলতা কয়েকটি তত্ত্বের সমষ্টি, এর মাধ্যমে পুঁজিবাদী উন্নত বিশ্বে নির্ভরশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পর্যাপ্ত ও টেকসই উন্নয়নে ব্যর্থ হয়।’ তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ তত্ত্বের বাস্তবতা কম। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন ঘটছে ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ রয়েছে। ব্যবসার খরচও কম। কম মজুরিতে অধিক শ্রমশক্তি পাওয়া যায়। দেশ থেকে উন্নত বিশ্বে পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইল রফতানি হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা জানান দিতে সরকার বাস্তবায়ন করেছে বেশকিছু বড় প্রকল্প। পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল ছাড়াও দৃশ্যমান হয়েছে কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তিন নম্বর টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্প। এসব প্রকল্প দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা বদলে ভূমিকা রাখছে।
উন্নয়ন পরিক্রমায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ, রফতানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০’ অধ্যাদেশে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য এটি সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। ২০৩০ সালের মধ্যে বেজার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান ও ৪ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রফতানির লক্ষ্য রয়েছে। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও উন্নত রাস্তঘাটের কথা মাথায় রেখে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থাপন করা হচ্ছে। এসব জায়গায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কম মূল্যে জমি পেতে পারেন। এছাড়া ১০ বছরের জন্য আয়কর ছাড়, কাঁচামাল, তৈরি পণ্যের শুল্কমুক্ত আমদানি, নির্মাণসামগ্রী, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও লভ্যাংশ কর থেকে অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে।
আধিপত্য লড়াইয়ে ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন বড় ফ্যাক্টর। একদিকে চীন-রাশিয়া, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাংলাদেশ নিয়ে কঠিন হিসাব-নিকাশে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর নজর এখন ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের যথেষ্ট কদর রয়েছে। শুরু থেকেই ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর কৌশল (আইপিএস) নিয়ে অনেক দেশ বাংলাদেশকে কাছে টানতে চাইছে। যদিও চীনকে ঠেকাতে আইপিএস গঠন করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চীনকে ঠেকাতে ২০০৭ সালে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত সামরিক জোট কোয়াড গঠন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কোয়াডের পর যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে অকাস নামের আরেকটি জোট। চীনবিরোধী এসব জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় তারা। এজন্য বাংলাদেশকে কিছু চাপের মধ্যে পড়তে হয়। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরাবরই বিচক্ষণতায় পরিচয় দিয়ে আসছে। আবার বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প ও ব্রিকসেও (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও সাউথ আফ্রিকা)। আগামীতে সৌদি আরব, ইউএই ও ইন্দোনেশিয়াসহ প্রায় আটটি দেশের এ জোটে শামিল হওয়ার আভাস রয়েছে।
আঞ্চলিক ও পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের নির্বাচন সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর পেছনে রয়েছে রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কারণ। বর্তমানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রমনীতিকে বাংলাদেশের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব বিষয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য রÅাবের ওপর স্যাংশন দিয়েছে। শ্রম অধিকার হরণ করলে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার হুমকিও আছে। জাতিসংঘও বাংলাদেশকে সতর্ক করছে। আইএমএফের আশঙ্কা, জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচন অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে। এর পেছনে পুশ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি। চীন-ভারতের যতই বৈরিতা থাকুক না কেন, বাণিজ্যিক স্বার্থে তারা এ দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। তাদের কাছে আওয়ামী সরকারই কাম্য এবং এটি যত সহজ ও নির্বিঘ্ন গঠন করা যায়। রাশিয়াও তা-ই সমর্থন করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কঠোর ও উদ্বিগ্ন হলেও হয়তো সে অবস্থান থেকে সরে আসবে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ‘পাতানো নির্বাচন’-এও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
এদিকে খাদ্য নির্ভরশীলতা, বৈদেশিক ঋণ, ক্ষীয়মাণ রিজার্ভ, বাজার কারসাজি, সিন্ডিকেট, মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। দেশে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। এছাড়া রিজার্ভ কমে আসার পাশাপাশি দুর্বল হয়েছে বিদেশী ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও বিদেশী ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিশোধের সক্ষমতা ছিল বাংলাদেশের। এখন এ সক্ষমতা এক-চতুর্থাংশেরও নিচে নেমে এসেছে ।
আমরা কেবল আশা করতে পারি, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট প্রশমিত হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে ও ডলার সংকট কেটে যাবে। অচিরে হয়তো বিদেশী ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়বে। দেশের রফতানি বাড়াতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের বাইরেও আরো কিছু অভিনব পণ্যের ওপর নজর দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সবার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। ভুল আচরণ কিংবা সিদ্ধান্তে কোনো একটি দেশের জাঁতাকলে পড়লে তা বাংলাদেশের জন্য অশুভ হবে।
পাপলু রহমান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা