নিরাপদ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জন কতদূর?

বাংলাদেশের মৎস্য খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে। বিগত তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৪২ দশমিক ৬৭ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে ৫ হাজার ১৯১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মৎস্য খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে। বিগত তিন দশকে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৪২ দশমিক ৬৭ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে ৫ হাজার ১৯১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ। এছাড়া স্বাদুপানির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে দেশটির অবস্থান ২য়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে ৩য়, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে ৫ম, বিশ্বে ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম, তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ এবং এশিয়ার মধ্যে ৩য় স্থানে রয়েছে। এসব পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাপী মৎস্য শিল্পে বাংলাদেশকে একটি রোল মডেলে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে শুধু মৎস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিই হয়নি বরং বলা যেতে পারে, মাছ ও মাছজাত পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে নিরাপদ মাছ উৎপাদনে যে অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আমাদের অর্জনগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করা এবং এখনো সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যায় তার দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত।

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মৎস্য উৎপাদনে নিরাপত্তার মান বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সরকার মাছের খামার, মাছ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট সামুদ্রিক খাবারের বাজার নিরীক্ষণের জন্য কঠোর আইন চালু করেছে। এ নিয়মগুলোর ফলে পানির গুণ-মান ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য ব্যবহার, রোগ নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলনের মতো দিকগুলোর উন্নয়ন হয়েছে, উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকে মাছচাষী মাছ প্রক্রিয়াকারীদের নিরাপদ মাছজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি সম্পর্কে জানানোর জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণ উদ্যোগ চালু করা হয়েছে।

নিরাপদ মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা তাদের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত আধুনিক পরীক্ষাগারগুলো মাছের নমুনাগুলোর গুগত মান কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে পেরেছে। ফলে মাছ ও মাছজাত পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্বারা নির্ধারিত সুরক্ষা মানগুলো অর্জন করতে পেরেছে। এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের মৎস্যজাত পণ্যের সামগ্রিক মানোন্নয়নে সফল হয়েছে, যা শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবহারই শক্তিশালী করেনি, বরং বাংলাদেশের মৎস্য খাতের রফতানি সম্ভাবনাও বাড়িয়েছে।

এছাড়া সরকার মাছপণ্যের সমগ্র সরবরাহ শৃঙ্খল নিরীক্ষণের জন্য ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম প্রয়োগ করেছে। এ সিস্টেমগুলোর ফলে মাছগুলো কোন উৎস থেকে এসেছে, সে সম্পর্কে জানা যায়। পাশাপাশি ভোক্তাদের মাছ ধরার পদ্ধতি নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে ভোক্তাদের আস্থা তৈরি করতে পেরেছে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের সুনাম বাড়িয়েছে

উল্লেখযোগ্য অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশে নিরাপদ মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিক রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহার। যদিও সরকার এ-জাতীয় পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তার পরও সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার জন্য কঠোর প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এছাড়া অতিরিক্ত পরিমাণে জলাশয়ে ভারী ধাতু এবং দূষকদের উপস্থিতি একটি চিন্তার বিষয়, যা নির্মুলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রতিকারের প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ মাছ উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে মাছচাষী ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। টেকসই মাছ ধরার অভ্যাস, মাছের সঠিক পরিবহন ও সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিক্ষামূলক প্রচারাভিযান সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। মৎস্যচাষীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের শিক্ষিত করে বাংলাদেশ সারা দেশে নিরাপদ মাছ উৎপাদন ও ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।

নিরাপদ মাছ উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী মাছ চাষের কৌশল, রোগ প্রতিরোধ টেকসই জলজ চাষ পদ্ধতির ওপর গবেষণা পরিচালনা করতে একই সঙ্গে কাজ করা উচিত। তারপর এ ফলাফলগুলো মাছচাষীদের কাছে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে, যাতে তারা উন্নত পদ্ধতি দ্রুত গ্রহণ করতে সক্ষম হন, যা উৎপাদনশীলতা নিরাপত্তা উভয়ই বাড়ায়।

নিরাপদ মাছ উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। টেকসই মৎস্য চাষে দক্ষতার জন্য পরিচিত দেশগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা, প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের মৎস্য খাত আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে বাংলাদেশের নিরাপদ মাছ উৎপাদনের অর্জনগুলো আরেকটু গুরুত্ব দেয়া উচিত। একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি কঠোর বিধিবিধান প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ ও টেকসই মাছ উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম উদাহরণ হওয়ার পথের যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে। আসুন আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করি, যেখানে নিরাপদ মাছ উৎপাদন বাড়বে, মানুষ ও পরিবেশ উভয়েরই উপকার হবে এবং একটি স্বাস্থ্যকর ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

মো. রাজিবুল ইসলাম: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষক, জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও