২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক যুগান্তকারী ও অবিনশ্বর দিন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছিল এক নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে। আপাতদৃষ্টিতে একটি অজেয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সর্বব্যাপী এবং প্রশাসনিকভাবে সুসংগঠিত শাসন ব্যবস্থা কীভাবে স্রেফ কয়েক সপ্তাহের গণ-আন্দোলনে চোখের পলকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তা কেবল তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক চরম মহাবিস্ফোরণ।
৫ আগস্টের ঘটনা প্রবাহকে কেবল একটি আকস্মিক রাজনৈতিক রদবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পতন ছিল একচ্ছত্র ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া শাসন ব্যবস্থার এক অনিবার্য পরিণতি। চরম জনবিচ্ছিন্নতার কারণে পতিত সরকার উন্নয়নের জয়গান যত উঁচু স্বরেই প্রচার করুক না কেন, তা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের সব আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করতে পারলেও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তার মিত্রদের বশে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় শাসক শ্রেণীর অস্বস্তি ছিল প্রকট। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার বিরামহীন ও আপসহীন সংগ্রাম এবং সব ধরনের বর্বর ও নির্মম নির্যাতনের মুখেও সরকারকে বৈধতা দিতে তার অস্বীকৃতি শাসকগোষ্ঠীকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে রেখেছিল। ফলে শাসক শ্রেণীর বৈধতার সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব তাদের কাজে এবং আচরণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। বিরোধী দল ও বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে অকারণে নিম্নমানের ভাষা ব্যবহার প্রমাণ করে যে তারা ভেতরে ভেতরে কতটা অসহায় ও অস্থির ছিল। অধিকন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাথমিক উপাদান তথা ভোটের প্রক্রিয়া থেকে জনগণকে শক্তি প্রয়োগে দূরে সরিয়ে রেখে শাসকশ্রেণী নিজেরাই তাদের পতনের বিজ বপন করে।
পতনের অন্তরালে: বহুমাত্রিক সংকটের বিস্ফোরণ
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পেছনে কাজ করেছে বহুস্তরী সংকট, যা বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে ঘনীভূত হয়েছিল।
ভোটাধিকার হরণ ও রাজনৈতিক বৈধতার শূন্যতা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে জনগণের অব্যাহত সম্মতির ওপর। কিন্তু ২০১৪ সালের একতরফা ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘আমি আর তুমি’ মার্কা ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার ফলে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা শূন্যে নেমে আসে। যখন কোনো শাসক দল জনগণের প্রকৃত গণরায় এড়িয়ে চলার কৌশল নেয়, তখন তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম অনুযায়ী, সরকার যখন নিজেকেই রাষ্ট্র মনে করতে শুরু করে, তখন সরকারের প্রতি গণমানুষের অসন্তোষ সরাসরি রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর গিয়ে আঘাত করে।
অলিগার্কিক পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠন: জিডিপি প্রবৃদ্ধির চটকদার পরিসংখ্যান ও মেগা প্রজেক্টের চমকপ্রদ প্রচারণার আড়ালে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছিল চরম অসাম্য ও নৈরাজ্য। ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট, সীমাহীন অর্থ পাচার, মেগা প্রজেক্টে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তথাকথিত কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির ফলে শিক্ষিত যুবসমাজের একটি বিশাল অংশ চরম হতাশা ও বেকারত্বের ভার বয়ে বেড়াচ্ছিল। শাসকশ্রেণী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অসীম সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার তীব্র বৈপরীত্যই ছিল এ গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক প্রণোদনা।
ভয়ের সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার সংকোচন: কালো আইন, গুম, বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও মুক্তচিন্তার প্রকাশকে কঠোরভাবে দমনের মাধ্যমে দেশে এক ভয়াল ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী ধরে নিয়েছিল, এ ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক নিপীড়নই তাদের ক্ষমতার চিরস্থায়ী ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বলে, ভয়ের একটি চরম সীমা থাকে; যখন দমনপীড়ন সেই সীমা অতিক্রম করে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে গ্রেফতারের আতঙ্ক বা মৃত্যুর ভয় উবে যায় এবং তা রূপ নেয় বেপরোয়া সাহসিকতায়।
জেন-জি ও তরুণদের বিচ্ছিন্নতা অনুধাবনে ব্যর্থতা: কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে সূচনা হলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের এ গণ-আন্দোলন কেবল সরকারি চাকরির দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; দ্রুতই তা ব্যাপক জনভিত্তি লাভ করে নাগরিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবিতে রূপ নেয়। আন্দোলনের শুরু থেকেই শাসক মহলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং আন্দোলনকারীদের ঢালাওভাবে ‘রাজাকার’ বা ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয়ার চেনা কৌশল নতুন প্রজন্মের কাছে চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে এবং ডিজিটাল যুগের ‘জেন-জি’ প্রজন্মকে আধুনিক রাজনৈতিক কৌশলে বোঝার বদলে পুরনো কায়দায় সামরিক ও প্রশাসনিক বল প্রয়োগ করে দমানোর চেষ্টা সরকারের জন্য চরম আত্মঘাতী হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জমে থাকা গণরোষ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয় এবং কোটা আন্দোলন মূলত ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তির মূল উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ও জনসম্পৃক্ততা: ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের উপস্থিতি কেবল সমর্থন জুগিয়েছে তা নয়, বরং আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিতে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের জুলাই ‘২৪ আন্দোলন তা থেকে কোনো ব্যতিক্রম নয়।
ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও খাবারের অভাবের বিরুদ্ধে ১৭৮৯ সালের অক্টোবরে প্যারিসের নারীদের ঐতিহাসিক ‘মার্চ অন ভার্সাই’ বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া ওলাঁম্প দ্য গোজের মতো নারী নেতৃত্বরা রাজনৈতিক অধিকারের দাবি তুলেছিলেন।
বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান (২০২৪): ফরাসি বিপ্লবের সূচনা পর্বের ছায়া জুলাই আন্দোলনের মাঝে দৃশ্যমান ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেশের নারী শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই রাজপথে প্রথম সারিতে ছিলেন। পুলিশের দমনপীড়ন, টিয়ারশেল ও গুলির মুখে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে অভিভাবক, শিক্ষক, গৃহিণী ও শ্রমজীবী নারীরাও এতে সরাসরি যুক্ত হন। আন্দোলনে গৃহিণীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মূল কারণ ছিল নাড়ির টান—নিজের সন্তান যখন রাস্তায় নিষ্ঠুরভাবে আক্রান্ত বা শহীদ হচ্ছে, তখন মায়েরা ঘরে বসে থাকতে পারেননি। একইভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরাও অভূতপূর্বভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়ে সহমর্মিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক অংশ এ আন্দোলনকে বেগবান করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
রাজনৈতিক তত্ত্বের আয়নায় ৫ আগস্ট: তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
শেখ হাসিনাবিহীন বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক রূপান্তরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের গভীর কিছু প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের আলোকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:
অ্যাসেমোগ্লু ও রবিনসন: ‘শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান’: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও জেমস এ রবিনসন তাদের যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘হোয়াই ন্যাশনস ফল’-এ দেখিয়েছেন, কোনো রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃতির ওপর। প্রতিষ্ঠান প্রধানত দুই ধরনের—‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ এবং ‘শোষণমূলক’। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন) চরমভাবে ‘শোষণমূলক’ রূপ নিয়েছিল। এ ব্যবস্থায় সম্পদ, সুযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবল একটি ক্ষুদ্র শাসকগোষ্ঠী ও অলিগার্কদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়। শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদে কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি দেখালেও তা ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রকে এতটাই দুর্বল করে তোলে যে সামান্য রাজনৈতিক আঘাতেই পুরো ব্যবস্থাটি ধসে পড়ে।
জিন শার্প: ক্ষমতার স্তম্ভ ধস: স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক জিন শার্প তার From Dictatorship to Democracy গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন, কোনো একনায়ক একাকী শাসন চালাতে পারে না। তার ক্ষমতা টিকে থাকে কয়েকটি মূল ‘স্তম্ভ’র ওপর, যেমন পুলিশ, আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়ী সমাজ ও বিচার বিভাগ। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা কেবল শাসকের বিরোধিতা করেনি, বরং শাসকের ক্ষমতার এ স্তম্ভগুলোকে একে একে অকার্যকর করে দিয়েছিল। যখন সিভিল প্রশাসন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, পুলিশ বাহিনী চরম নৈতিক সংকটে পড়ে এবং শেষ মুহূর্তে সামরিক বাহিনী জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন ক্ষমতার মূল স্তম্ভগুলো ধসে পড়ে এবং শাসকের বিদায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ম্যাক্স ওয়েবার: নব্য-প্যাট্রিমোনিয়ালিজম: সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের প্রশাসনিক তত্ত্বের আধুনিক রূপ হলো ‘নব্য-প্যাট্রিমোনিয়ালিজম’। এটি এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো যেখানে খাতা-কলমে আধুনিক আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান থাকে, কিন্তু বাস্তবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হয় শাসকের ব্যক্তিগত আনুগত্য, রাজনৈতিক সুবিধা ও স্বজনপ্রীতির ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে দেড় দশকে প্রশাসনিক পদোন্নতি, বড় বড় ব্যবসায়ী লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধার বণ্টন পরিচালিত হয়েছে দলীয় ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের মানদণ্ডে। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র তার পেশাদারত্ব হারিয়ে ভেতরে ভেতরে একটি কাচের পাত্রের মতো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল, যা সাধারণ গণচাপ সহ্য করতে ব্যর্থ হয়।
জেমস সি. স্কট: প্রচ্ছন্ন অসন্তোষ (Hidden Transcripts): প্রখ্যাত রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট তার Domination and the Arts of Resistance গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কঠোর দমনপীড়নের মুখে সাধারণ মানুষ যখন প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে না, তখন তারা আপাতদৃষ্টিতে বাধ্য আচরণ করলেও মনের গভীরে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ জমিয়ে রাখে। শাসকগোষ্ঠী সাময়িক নিস্তব্ধতাকে তাদের ‘জনপ্রিয়তা’ বা ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণ’ বলে ভুল করে। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে এ প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে রাজপথে প্রকাশ্য গণদাবিতে রূপ নেয়, যা যেকোনো রাষ্ট্রক্ষমতাকে স্তম্ভিত করে দেয়।
আন্তোনিও গ্রামশি: ‘হেজিমনি’ ও সহমর্মিতার সংকট: ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছেন, শাসক শ্রেণী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনীর বলপ্রয়োগ (Coercion) করে টিকে থাকতে পারে না; তাদের প্রয়োজন হয় জন ‘সম্মতি’ (Consent)। শেখ হাসিনা সরকার যখন তার নৈতিক ও রাজনৈতিক সম্মতি হারিয়ে ফেলে, তখন তারা কেবল নগ্ন বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
হ্যানা আরেন্ট: ক্ষমতা বনাম সহিংসতা (Power vs. Violence): রাজনৈতিক দার্শনিক হ্যানা আরেন্ট তার On Violence গ্রন্থে লিখেছেন—‘ক্ষমতা’ ও ‘সহিংসতা’ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি উপাদান। ক্ষমতা উদ্ভূত হয় জনগণের ঐক্য থেকে। শাসক যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তখনই সে চরম ‘সহিংসতা’র আশ্রয় নেয়। জুলাই-আগস্টে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগে শত শত মানুষকে হত্যার ঘটনাটি প্রমাণ করে, সরকার তার নৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে কেবল সহিংসতার ওপর ভর করে টিকতে চেয়েছিল, যা জনতার অদম্য সংকল্পের কাছে হেরে যায়।
৭. স্যামুয়েল হান্টিংটন: প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের তত্ত্ব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন ব্যাখ্যা করেছেন যে যখন সমাজে রাজনৈতিক সচেতনতা দ্রুত বেড়ে যায় কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সেই নাগরিক দাবি সামলাতে বা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষিত: ইতিহাসজুড়ে স্বৈরাচার পতনের একই চিত্রনাট্য
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা বৈশ্বিক ইতিহাসের ধারায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শাসক, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা কালখণ্ড ভিন্ন হলেও শাসন ব্যবস্থার পতন প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে প্রায় একই বৈশ্বিক নীতি মেনে চলেছে:
ইন্দোনেশিয়ার ‘নিউ অর্ডার’ ও সুহার্তোর পতন (১৯৯৮): সামরিক জেনারেল সুহার্তো দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ায় ‘নিউ অর্ডার’ নামের একচ্ছত্র শাসন বজায় রেখেছিলেন। তার আমলে স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং অলিগার্কি চরম আকার ধারণ করে। ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করলে ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে। ত্রিশক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলে পুরো দেশ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। যখন সুহার্তোর নিজস্ব অনুগত মন্ত্রী ও সামরিক জেনারেলরা তার নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান, তখন দীর্ঘ ৩২ বছরের প্রতাপশালী শাসনের পতন ঘটে।
ফিলিপাইনের ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’ (১৯৮৬): দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরাচারী শাসন ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের অবসান ঘটেছিল লাখ লাখ মানুষের রাজপথে নেমে আসার মাধ্যমে। বিতর্কিত নির্বাচন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নিপীড়নের জবাব ফিলিপাইনের জনগণ দিয়েছিল অহিংস অথচ অপ্রতিরোধ্য ‘জনগণের শক্তি’ প্রদর্শনের মাধ্যমে।
সার্বিয়ার ‘ওতপোর’ (প্রতিরোধ) ও মিলোসেভিচের বিদায় (২০০০): স্লোবোদান মিলোসেভিচ জাতীয়তাবাদী জিকির তুলে এবং বিরোধীদের ওপর চণ্ডনীতি প্রয়োগ করে দীর্ঘ এক দশক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। ২০০০ সালের নির্বাচনে কারচুপি করলে ‘ওতপোর’ বা ‘প্রতিরোধ’ নামে তরুণ-আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা অহিংস কৌশল ও সৃজনশীল প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের মন থেকে ভীতি দূর করে। ৫ অক্টোবরের ‘বুলডোজার বিপ্লবে’ সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষ রাজধানী বেলগ্রেড অভিমুখে যাত্রা করলে সামরিক ও পুলিশ বাহিনী নতিস্বীকার করে।
ইউক্রেনের ‘ইউরোমাইদান’ ও ইয়ানুকোভিচের পলায়ন (২০১৪): ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের পতন প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতার দাপট শেষ রক্ষা করতে পারে না। ইউক্রেনের তরুণ সমাজ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত হতে চাইলেও ইয়ানুকোভিচ রাশিয়া বলয়ে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিয়েভের মাইদান চত্বরে ক্ষুব্ধ জনতা নেমে এলে সরকার স্পেশাল পুলিশ পাঠিয়ে শতাধিক প্রতিবাদকারীকে গুলি করে হত্যা করে। এ নৃশংসতা আন্দোলনকে গণবিপ্লবে রূপ দেয় এবং রাজপ্রাসাদ ঘেরাওয়ের মুখে ইয়ানুকোভিচ রাতের অন্ধকারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
সুদানের রুটি আন্দোলন থেকে বশিরের পতন (২০১৯): দীর্ঘ ৩০ বছর সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা ধরে রাখা ওমর আল-বশিরের পতন ঘটেছিল স্রেফ রুটি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের মাধ্যমে। পেশাজীবী ও তরুণদের অবিরত রাজপথ দখলের মুখে সামরিক বাহিনী বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য হয়।
শ্রীলংকা ও মিসরের শিক্ষা: ২০২২ সালে শ্রীলংকায় চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে মাহিন্দ্র রাজাপাকসে সরকারের পতন কিংবা ২০১১ সালে মিসরের তাহরি স্কয়ারে হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান—প্রতিটি ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ করে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী হতে পারে না।
৫ আগস্টের বার্তা ও আগামীর পথরেখা
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ক্ষমতার মোহে অন্ধ শাসকরা ইতিহাস থেকে কখনো শিক্ষা গ্রহণ করে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি এ ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চায়, তবে ৫ আগস্টকে কেবল একটি বিশেষ ব্যক্তি বা দলের বিদায় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে দেখতে হবে এক আমূল ‘পদ্ধতিগত পরিবর্তনের’ ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে।
৫ আগস্ট আমাদের যে চিরন্তন রাজনৈতিক সত্যগুলো শিক্ষা দেয়
সম্মতিই শাসনের ভিত্তি: জনগণের প্রকৃত সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়া কেবল প্রশাসনিক চাপ, গোয়েন্দা নজরদারি বা ভূরাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো: অর্থনৈতিক উন্নয়ন যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয় এবং তার পেছনে যদি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও জবাবদিহিতা না থাকে, তবে তা কেবল একটি ‘বালির বাঁধ’ হিসেবে প্রমাণিত হয়।
প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও ভারসাম্য: বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো অবস্থাতেই দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা যাবে না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগের পেশাদারি আচরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
স্মরণ রাখা আবশ্যক, ৫ আগস্ট কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের জুলুম, গুম, খুন ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ। স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অগণিত অকুতোভয় নাগরিক ও বীর শহীদদের যে আত্মত্যাগ, তাকে ধারণ করে সব ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য, অর্থনৈতিক সমতা ও মানবাধিকারের শক্ত ভিতের ওপর নতুন বাংলাদেশ গড়াই হোক শহীদদের রক্তের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন আর কখনই নিজ দেশের নাগরিকদের মুখোমুখি অস্ত্র হাতে না দাঁড়ায়—৫ আগস্টের এ অমোঘ পাঠ ও শহীদদের পরম ত্যাগই হোক আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের চিরন্তন প্রেরণা।
শামীম আল মামুন: প্রজাতন্ত্রের সাবেক কর্মচারী এবং লোকপ্রশাসনের অধীতি