দেখতে দেখতে শেষ হলো কাতার বিশ্বকাপ। ফুটবলের
এ মহান প্রতিযোগিতার প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই বিভিন্ন সমালোচনা আকৃষ্ট করেছে দোহা।
প্রথমেই রয়েছে অর্থের বিনিময়ে ফিফার কাছ থেকে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ বাগিয়ে নেয়া।
তার পরই রয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ। কয়েক বছর ধরেই বিশ্বকাপের মঞ্চ
নির্মাণের কারিগরদের মৃত্যু ও নিপীড়ন নিয়ে রোমহর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব মিডিয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে
দাবি করা হয়, স্টেডিয়াম ও বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে গত এক দশকে অন্তত সাড়ে
ছয় হাজার শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। তবে কাতার কর্তৃপক্ষ ডিসেম্বরের শুরুতে দাবি করে,
গত এক দশকে ৪০০-৫০০ শ্রমিকের মৃত্যু হতে পারে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে শ্রমিকদের
মৃত্যুর সংখ্যা গণহারে ধরা হয়েছে। এতে অনেক কর্মী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যারা প্রকল্পের
সঙ্গে জড়িত নন। অবশ্য তারা বলেছেন, প্রতিটি জীবনই মূল্যবান, প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত
বেদনাদায়ক।
শ্রমিকদের মৃত্যু এড়িয়ে স্রেফ ফুটবল দিয়ে
তাকালে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সেরা ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ আয়োজন দাবি করতেই পারে
কাতার। ফুটবলের সবচেয়ে অভিজাত এ আয়োজনে ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি উড়িয়েছে তেল সমৃদ্ধ
দেশটি। শুরু থেকেই এবারের বিশ্বকাপ যেন ছিল লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্ব পাকাপোক্ত করার
বিশ্বকাপ। অন্তত একুশ শতকের সেরা ফুটবলার হিসেবে মেসিকে একবাক্যে মেনে নিচ্ছে ভক্ত-সমালোচকরা।
তবে সামনের দশক যে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারা মাতাবেন এটাও জানান দেয়ার বিশ্বকাপ
ছিল এটি। মানবাধিকার পরিস্থিতি বাদ দিলে আয়োজক হিসেবে কাতার বেশ সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
সামনের দিনগুলোতে বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজনের শক্তিশালী দাবিদার দোহা।
বিশ্বকাপের সফল আয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে
আনন্দ ছড়িয়ে দিতে পারলেও অনেকেই তাতে যুক্ত হতে পারছেন না। সে তালিকায় আছে ৪ লাখের
মতো নেপালি শ্রমিক। বিশ্বকাপের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রায় এক যুগ ধরে চলা এ কর্মযঞ্জে অনেক শ্রমিকের হয়তো পরিবারে স্বস্তি এসেছে, বাচ্চাদের
ভালো স্কুলে পাঠাতে পারছেন বা নতুন ঘর বানাতে পেরেছেন। তবে উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য
কাতার বিশ্বকাপ তিক্ত স্মৃতি হিসেবেই থাকবে। তাদেরই একজন থাগেন্দ্র অধিকারী। লুসাইল
স্টেডিয়াম নির্মাণে কাজ করা এ শ্রমিক দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, স্টেডিয়ামটি অনেক সুন্দর।
আকর্ষণীয় তার নকশা। কিন্তু এখানে আমার অনেক তেতো স্মৃতি রয়েছে। আমিসহ অনেকেই ন্যায্য
বেতন পাইনি। আমি ফুটবল অনেক পছন্দ করি কিন্তু কাতারে এ কালো দিনগুলো কখনো ভোলার নয়।
মেসিভক্ত এ নেপালি শ্রমিক আরো বলেন, এ বিশ্বকাপ আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়নি। আমাদের রক্ত,
ঘাম ও চোখের জলে বিশ্বকাপের এ ঝাকঝমকপূর্ণ আয়োজন। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ন্যায্য মজুরি
মেলেনি।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, নেপাল ও বাংলাদেশের
শ্রমিকরা যে বেতন পায় একই সময় কাজ করে ভারতীয় ও ফিলিপিনোরা বেশি বেতন পাচ্ছে। মানবাধিকার
সংস্থা ইকুইডেম তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানায়, জাতীয়তাভিত্তিক বৈষম্যের শিকার
হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম নির্মাণে কাজ করা প্রায় অর্ধেক কর্মী। তবে
সবকিছুর জন্য কাতারি কর্তৃপক্ষ যে দায়ী এমন নয়। অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার পেছনে দায়ী
অন্য অভিবাসী শ্রমিক। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদকের কাছে বেশিরভাগ শ্রমিক জানান, তাদের
ম্যানেজারদের বড় অংশই ভারত কিংবা মিশরের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, কাতারের
মানুষজন বেশ ভালো তবে তারা এমন লোকদের কাছে দায়িত্ব দিয়েছেন যারা মানুষের মূল্য দেয়
না।
তবে কাতারি কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না।
শ্রমিক নিপীড়নের জন্য উপসাগরীয় দেশটির সমাজ কাঠামোও দায়ী। এখানে অধস্তন কেউ ঊর্ধ্বতনের
ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে না। কাতারি ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েছে অনেক ইউরোপীয় কোম্পানিও।
২০১৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়, টুর্নামেন্ট আয়োজনে ১৫০ কোটি পাউন্ডের
চুক্তি ভাগিয়ে নিয়েছে বেশ কিছু ব্রিটিশ কোম্পানি। ফিফাও শ্রমিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার
ইস্যুতে চুপ থাকার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। এবারের আয়োজনে তাদের পকেটে গিয়েছে ৭৫০ কোটি ডলার।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কাতার অফিসের
প্রধান ম্যাক্স টুনন বলেন, কাতার প্রায়ই কর্মীদের মৃত্যুর প্রয়োজনীয় তথ্য ন্যূনতম বিবরণ
ছাড়াই প্রকাশ করে। আইএলওর পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়, গার্ডিয়ানের প্রকাশিত মৃতের সংখ্যার
মধ্যে নির্মাণ শ্রমিক ছাড়াও সাধারণ অভিবাসীর মৃত্যু সংযুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অবকাঠামো
নির্মাণে হতাহতের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজকদের ডেলিভারি অ্যান্ড
লিগ্যাসি সুপ্রিম কমিটির দাবি, ২০২২ সালের বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত
প্রবাসী শ্রমিকদের মাত্র তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে যারা
এ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
সুপ্রিম কমিটির মহাসচিব হাসান আল থাওদি ব্রিটিশ
সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে কথা বলেন।
তিনি দাবি করেন, বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোয় প্রবাসী শ্রমিকের
মৃত্যুর সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ ৫০০-এর মধ্যে।
বিশ্বকাপ ফুটবল অবকাঠামো নির্মাণে শ্রমিক
মৃত্যু নিয়ে ২০২১ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য গার্ডিয়ান। সেখানে বলা
হয়, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক
মারা গিয়েছেন। ২০১১ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের প্রস্তুতি শুরুর পর এ প্রাণহানির ঘটনা
ঘটে।
মজার ব্যাপার, ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বকাপ ফাইনালের
দিনটি আবার আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস এবং কাতারের জাতীয় দিবস। বিশ্বমঞ্চে কাতারের সবচেয়ে
উজ্জ্বল দিনটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নিন্দাবাক্য শুনতে হচ্ছে আয়োজকদের।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হেড অব ইকোনমিক
অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিস স্টিভ ককবার্ন সিএনএনকে জানান, এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ যতই
সফল হোক না কেন এর জন্য অভিবাসী শ্রমিকদের অনেক মূল্য চুকাতে হয়েছে। অনেককে বেআইনি
নিয়োগ ফি দিতে হয়েছে, কারো বা বেতন মেরে দেয়া হয়েছে আবার অনেককে প্রাণ হারাতে হয়েছে।
অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবার কাতার কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
সাবিদিন
ইব্রাহিম: সাংবাদিক ও লেখক