আলোকপাত

নতুন বছরের ভাবনা

করোনায় সম্মোহিত ২০২০ চলে গেল। আজ একুশের অভিষেক। সুস্বাগতম ২০২১। শুক্রবার দিয়ে এই পঞ্জিকাবর্ষের মহরত। শুভ মহরতে অবশ্যই আশা-প্রত্যাশা সবার নতুন বছরটি যেন মঙ্গলময় হয়। সবাই জানে করোনার কারণে অসম্ভব ঘটনাবহুল ছিল ২০২০ সাল। একুশ তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে, সামনের ৩৬৫ দিনের পর, ৮ হাজার ৭০০ ঘণ্টার ঘনঘটা সাঙ্গ করে

করোনায় সম্মোহিত ২০২০ চলে গেল। আজ একুশের অভিষেক। সুস্বাগতম ২০২১। শুক্রবার দিয়ে এই পঞ্জিকাবর্ষের মহরত। শুভ মহরতে অবশ্যই আশা-প্রত্যাশা সবার নতুন বছরটি যেন মঙ্গলময় হয়। সবাই জানে করোনার কারণে অসম্ভব ঘটনাবহুল ছিল ২০২০ সাল। একুশ তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে, সামনের ৩৬৫ দিনের পর, ৮ হাজার ৭০০ ঘণ্টার ঘনঘটা সাঙ্গ করে সেও প্রস্থান করবে, সে সময় বাইশ এসে পাতবে সংসার। কিন্তু এই যে নিত্য চলে যাওয়া-আসা, দেখার বিষয় রেখে যাওয়া যে কালের কপোলতলে কী রেখে গেল বা যাবে এসব পঞ্জিকাবর্ষ প্রবরেরা? সমাজ-সংসার দেশ ও দুনিয়ার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে কী জমবে বা কেমন দাঁড়াবে তার যোগ-বিয়োগের জমা-খরচের জের?

পৃথিবীর আর দশটা দেশের মতো ২০২০ বাংলাদেশে ছিল ঘটনাবহুল। বছরটিতে মানবিক বিপর্যয়, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ভাণ্ডারে অনেক বিস্ময়, বৈপরীত্ব ও বিতর্ক তুলনামূলকভাবে যেন বেশিই ঘটেছে, জমেছে। মার্কিন মুলুকে মাতবরের পরিবর্তন, বাংলাদেশে বুলবুল-আম্পানদের আস্ফাালন, বড় বন্যা, মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয়ে আপতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান ও ভাষানচরে স্থানান্তর, প্রতিবেশী দুই বড় ভাইয়ের ঠাণ্ডা যুদ্ধের মহড়া উত্তপ্ত হওয়া, এসব নিয়ে ২০২০ সাল ছিল অঘটনঘটনপটিয়সী। বিশে অনেক মৃত্যু। আমজনতার সঙ্গে বর্ষীয়ান নেতা-রাজনীতিক, শিল্পপতি, আইনজ্ঞ, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, প্রজ্ঞাবান প্রকৌশলী, লেখক, শিল্পী, অভিনেতা, কলাকুশলী—কে না ছিলেন মৃত্যুর মিছিলে!

২০২০-এ প্রতিষ্ঠিত অনেক সত্য, সার্বিক সুন্দর ও স্বাভাবিকের বাইরে ঘটেছে অনেক কিছুই। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার অব্যাহত অভিযাত্রা যেমন ছিল, অর্থনীতি ও রাজনীতিও তেমন প্রত্যক্ষ করেছে পটপরিবর্তনের নানান আকার, ইঙ্গিত। দেশে-বিদেশে সংক্ষুব্ধ উত্তাল উদ্দামের উম্মিলন সহসা স্থিমিত হয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত বলয়ে চলে গিয়েছে, যেমন বড় ঝড়ের পরে নেতিয়ে পড়ে প্রকৃতি। সে কি ক্লান্ত হয়ে, শ্রান্ত হয়ে, নাকি কোন সে জাদুবলে? নিশ্চয়ই না। তবে সেটি কি বৃহত্তর ব্যর্থতার মরা কাটালে বন্দি না অন্য কিছু? হয়তোবা সেটি একটি দূরবর্তী মন্দার আভাস দিয়ে, নিম্নচাপের আগে তাপমাত্রায় যেমন ঘটে অস্থিরমতিত্বের প্রভাব কিংবা ভালোভাবে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদিগরণের মতো, নব উদ্যমের সর্বনাশের সংগঠনের প্রেরণা।

২০২১-এর জন্য ২০২০ বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে এই সত্যের ও তত্ত্বের জানান দিয়ে গিয়েছে যে অর্থনীতি রাজনীতিকে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন বা অবলম্বনের বাস্তবতা তথাকথিত আবেগকে টপকে যাওয়ার পথ ধরেছে। অন্যের গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধারের সঙ্গে সবসময় থাকতে এখন দ্বিধান্বিত জনতা। যে জনতার কল্যাণের কথা বলে বারবার তাদের মাড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙা হয়েছে, এখন সে প্রবোধ ও উৎসাহে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। সুদূর ইতিহাসের আবেগ ও চেতনা বর্তমানের মহামারীমণ্ডিত বিড়ম্বনাময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনসংগ্রামে মন্ত্রতন্ত্র হিসেবে যান্ত্রিক জীবনে যে আবেগ সৃষ্টি করতে চেয়েছে, নানান খিস্তি-খেউড়ে তা অপাঙেক্তয়  নিস্পৃহভাবতার বলয়ে চলে গিয়েছে সেসব বিব্রতকর ব্যস্তসমস্ত জীবন ও তার কর্মপ্রক্রিয়ার প্রহরে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটেছে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে। অন্তত শতাধিক সাজানো-বানানো ঘটনা এসেছে আকস্মিকতায় বিব্রতকর পরিস্থিতিকে ধামাচাপা দিতে, সংবছরে জাতীয় দৈনিকে লাল অক্ষরের যত শিরোনাম হয়েছে, সেগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে অবারিত অশান্তি, করোনার কারণে করুণ প্রস্থান, বড় দাগের দুর্নীতি, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ, অপব্যয়-অপচয়ে তহবিল তছরুপের অন্তর্ঘাতে রয়েছে অর্থনীতি। ফুরসত মেলার পথ পেয়েও যেন পায়নি পুরনো ঘটনায় মনোনিবেশের।

বিশ্বাস ও আস্থায় ফাটল ধরেছে। অর্থনীতিতে এমন সব বিস্ময়কর উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে সবাই, যা প্রথাগত, প্রতিষ্ঠানগত, প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের বাইরে ঘটেছে। নানান পথ-পদ্ধতিতে অর্থের চোরাচালান বেড়েছে। ইউরোনিয়াম ও স্বর্ণ জব্দের জম্পেস বছর ছিল এটি। বিদেশে পুঁজির উড়াল ঘটেছে এবারে বেশি। দেশে দক্ষজনবলের সংকট দেখিয়ে বিদেশী বুদ্ধিদাতার কর্মসংস্থান অব্যাহত রয়েছে, বিদেশ প্রত্যাগতদের ভারে আরো কাহিল হতে চলেছে বেশি বেকারের ভারে ন্যুব্জ এই অর্থনীতি। ব্যক্তি খাতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়তির পথে তো নয়ই, বরং সনাতন সামর্থ্য ও ধ্রুপদ পুঁজির অস্তিত্ব রক্ষার ধারণা হোঁচট খেয়েছে বারবার। বারবার চাঙ্গা হতে চেয়েছে, হতে পারেনি পুরোপুরি পুঁজিবাজার, যদিও ঘাপটি মেরে বসেছিল প্রথাগত ষড়যন্ত্র।

বিদায়ী বছরে মনিটারি পলিসিগুলো সুশীল শব্দের সৌকর্যে ঐশ্বর্যে ভরপুর থাকলেও বাস্তবায়নতায় সেখানে যেন ‘কেউ কোনো কথা রাখেনি’। নিজস্ব নিয়মে যে যা পেরেছে, সামাল দিতে চেষ্টা করেছে ঘাটতির, তারল্য সংকোচনের। আবার সেই অস্বাভাবিক অবস্থাকে স্বাভাবিকের তকমা পরিয়ে সাফল্য হিসেবে দেখার ভান করেছে অনেকে। স্বাস্থ্য খাতের দৈন্য ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পড়াশোনার পাট চুকে গেছে শত-সহস  শিক্ষার্থীর। বিস্মিত হয়েছে সবাই। পাবলিক মানি মোটাদাগে উৎপাদন-অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয়ে অব্যাহত থাকার বছর ছিল ২০২০। 

যে প্রেক্ষাপটে এসেছে একুশ, তাতে কেমন ধারা সূচিত হবে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতিতে? নিকট ও দূরের দিনগুলোর দিকে তাকাতেই হয়। ব্যাংকের তারল্যে ও তদুৎসারিত সংকট একদিকে ঋণপ্রবাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন, অন্যদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের বলয়ে বন্দি হয়েছে অতি অলস তারল্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অস্বাভাবিক স্ফীতি যেমন অর্থনীতির রক্তে শর্করা বৃদ্ধির আলামত হিসেবে থাকছে, অর্থনৈতিক স্থবিরতায় এ অর্থের প্রায়োগিক প্রতিদান বা প্রতিফল বিপরীত কোনো অভিঘাত সৃষ্টি হয় কিনা, তা দেখার বিষয় থেকে যাচ্ছে। চাল রফতানি বেড়েছিল, বছর শেষে চাল আমদানিও। সেই চালের হিসাব তামিল করা হয়েছে কিনা, চালের সম্মানজনক প্রবেশ ঘটেছে কিনা, তা দেখভালের অবকাশ অনুভূত হয়। ক্যাপিটাল মেশিনারির আমদানির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা উৎপাদন-উেপ্রক্ষার মেলবন্ধন ঘটার আবশ্যকতা অনিবার্য। এভাবে-সেভাবে পুঁজি পাচারের দুর্ভাবনা নতুন বছরের মাথাব্যথা হিসেবে বিদ্যমান থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য যা সহজাত, অ-আমদানিজাত, তার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্য সহনীয় রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে যদি প্রকৃতি সদয় থাকে। স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য দ্রব্যমূল্যের ঘোড়াকে পোষ মানাতে পারবে, কিন্তু আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে দর ও দাম পড়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার দাম কমার নাম যদি না থাকে, তাহলে এটি এক ধরনের অ্যালার্জি হিসেবে গাত্রদাহের কারণ হবে। তেল বা জ্বালানি খাতের এমন কিছু উপাদান উৎপাদনে এবং তার সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে সামষ্টিক উৎপাদনশীলতা ও ব্যক্তি বিনিয়োগের আগ্রহ, সামর্থ্য ইত্যাদি। এটি ধরে রাখতে না পারলে বেপথে চলে যাবে মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ে আমদানি করা সামগ্রী অন্যের সংসারে। ফিসক্যাল পলিসি কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে তার সদয় উপস্থিতি আবশ্যক হবে, অনিবার্য হবে তার সঠিক প্রয়োগ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে—এই আশায় এ খাতে ভর্তুকির নামে অব্যাহত অপচয় অপ্রতিরোধ্য হতে পারে, গজিয়ে ওঠা বিশেষ শিল্প পরিবারের কাছে এ খাত জিম্মি হতে অনিচ্ছুক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

বাংলাদেশের ভূরাজনীতি নতুন বলয়ে প্রবেশ করছে। পূর্ব দিকে তাকানোর নীতি ‘তাকানো’ ও ‘দেখার’ মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে না পারলে কিংবা ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’-জাতীয় দোটানায় বুঁদ হয়ে থাকলে বিশে সৃজিত ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ সহযোগিতা-সহায়তার সংসারে বাড়া ভাতে ছাই পড়তে পারে। বিদেশী বিনিয়োগ নানান কলাকৌশলে যাতে এ দেশের বাজারকে কুক্ষিগত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার পথে না থাকে, সে ব্যাপারে নিজেদের মনোভঙ্গি অবশ্যই সতেজ ও সজীব হওয়ার অবকাশ থাকবে। আত্মস্বার্থ দেখার চেতনা শানিত ও জাগ্রত থাকার আবশ্যকতা আরো বৃদ্ধি পাবে দেশীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রশ্নে।

শুধু ২০২০-এ কেন, সেই ২০১৬-১৭ থেকেই তো রাজস্ব আহরণে নিম্নগতিতে টানটান উত্তেজনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে অনেক যৌক্তিক কারণে। উদ্যোগের কাটতি-ঘাটতি না থাকলেও কাঙ্ক্ষিত-বাঞ্ছিত পর্বে নিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নানান উপায়ে রাজস্ব ফাঁকি, এড়িয়ে চলা, অদক্ষতা-অপারগতাকে দোষারোপ অব্যাহত ছিল ২০২০-এও। ভ্যাট আইন প্রবর্তন নিয়ে যত বাক্যব্যয় ঘটেছে, তাতে অর্থনীতিতে ভ্যালু এডিশন হয়নি তেমন কিছুই। এখনো চলছে এ প্রয়াসের অগ্নিপরীক্ষা। পরস্পর প্রযুক্ত অর্থনৈতিক জীবনযাত্রাকে নির্মল-নিস্কুলষ, নির্বাধ ও নিরপেক্ষকরণের প্রয়াস চলছে। কিন্তু কোথায় যেন বিশেষ প্রত্যয়ের অভাব অনুভব হওয়ার সুবাদে সব ঘাটে, সব মাঠে ও প্রান্তরে ‘কারো বলার কিছু ছিল না’ প্রকৃতির ব্যর্থতার সংগীত শুনতে হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আহরণে যেখানে দৃঢ় প্রত্যয়, সুচিন্তিত পদক্ষেপ এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশিত, সেখানে চোখ-কান বন্ধ রাখার সন্ধ্যা সংগীত বাজানো হচ্ছে সময়ের সেতারে। প্রশাসন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সপ্রতিভ স্বদায়িত্বশীল হওয়ার প্রভাব সংগীত ভিন্ন সুরে ধ্বনিত হচ্ছে। একুশেতে  রাজস্ব আহরণ কর্ম প্রক্রিয়া ও অভীপ্সা অধিকতর অন্তর্মুখী হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ বাড়বে।

২০২০ সাল ছিল এসডিজি বাস্তবায়নের পঞ্চম বছর। করোনায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বাস্তবায়ন মেট্রিক্সের ম্যাপ। মিলেনিয়াম দশটি গোলের বেশ কয়েকটি সামাজিক খাতে আমাদের অগ্রগতি ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণগত সূচক বা শর্তগুলোয় বাংলাদেশের অগ্রগতি যৎসামান্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পরিবেশ সৃজনে, সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেকটাপথ পাড়ি দিতে হবে। আত্মতৃপ্তির ধোঁয়াশে পরিবেশে যেন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়ার আগ্রহ তলিয়ে না যায়।   

 

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও