এক.
২০২২ সালে সারা বিশ্বে চলমান ‘মারমুখী মূল্যস্ফীতির’ কথা আমরা সবাই জানি। সম্ভবত ২০০৮ সালের পর এমন ঝরো গতিতে বড় অভিঘাত সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নেই। চলমান মূল্যস্ফীতি কতটা মারমুখী, তা উপলব্ধির জন্য কিছু পরিসংখ্যান দিয়েছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রখাত অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদ এবং পাঠকের জন্য তা তুলে ধরা যায়: একমাত্র আমেরিকায় মূল্যস্ফীতির হার ২০২১ সালের ১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২২ সালের জুনে ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছায়; ইউরোপীয় ইউনিয়নে সেই হার এক বছরের মধ্যে ১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ লাফিয়ে ওঠে। পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডে ২০২২ সালের প্রথম সাত মাসে ৩ দশমিক ২ থেকে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ; ভারতে এক বছরে দ্বিগুণ, বাংলাদেশে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অবস্থান নেয় মূল্যস্ফীতির হার। বিশেষত দেশগুলোর বিদ্যমান পরিবেশ ও নীতি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন মাসে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে মূল্যস্ফীতি চূড়ায় ওঠা প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ সব জায়গায় ভোগান্তি মোটামুটি একই রকম।
দুই.
থাক সে কথা। সাদিকের মতে, মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে ওঠার মূলে আছে দুটি কারণ: (ক) কভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের যৌথ প্রভাবের জন্য জোগানে ঘাটতি এবং (খ) আমেরিকা ও ইউরোপে চাহিদা চাঙ্গা করার লক্ষ্যে প্রদত্ত কভিডবিরোধী প্রণোদনা প্যাকেজ প্রবর্তন। যদিও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী তীক্ষ্ণতার উৎস ছিল জোগানের ঘাটতি এবং সেজন্য পণ্যের দামের উল্লম্ফন, বিশেষত জ্বালানি দ্রব্য, তারপর নীতিনির্ধারকরা চটজলদি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা দুষ্কর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ দ্রুত সুদহার বাড়িয়ে দিয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রেখে আগ্রাসী চাহিদা ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করে। কত আগ্রাসী তার প্রমাণ সুদের হার ত্বরান্বিত হওয়ার কারণে আমেরিকার দুটি ব্যাংকে ধস নামা। এ পদক্ষেপ পদে পদে এবং চাহিদার প্রকৃতিসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। থাইল্যান্ড, ভারত ও ভিয়েতনামও মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে চাহিদা সংকোচন নীতি আলিঙ্গন করেছে। একমাত্র বাংলাদেশ ব্যতিক্রম যেখানে চাহিদা সংকোচন নীতি তো গ্রহণ করেইনি বরং চাহিদার চাপে ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে ব্যক্তি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি। যে দেশে কর-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশেরও কম সেই দেশে ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়া ব্যতীত অর্থায়নের উৎস কোথায়?
বাংলাদেশের মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনার একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য বহু বিতর্কিত ‘ছয়/নয়’ সুদের নীতির অব্যাহত উপস্থিতি যেখানে গেল সাত মাসের গড় ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে ল্যান্ডিং রেট ৯ শতাংশ। এ শূন্য অথবা ঋণাত্মক সুদের হার ব্যক্তিঋণের প্রসার ঘটিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু রাজস্ব ঘাটতি সরকারকে ব্যাংক থেকে গত ১২ মাসে ২৮ শতাংশ হারে ঋণ নিতে বাধ্য করছে।
প্রশ্ন হলো, সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে চাহিদা সংকোচন নীতি কতটা ফলদায়ক অন্তত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে? দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি হ্রাসে বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে সবচেয়ে বেশি কমেছে থাইল্যান্ডে (৫১ শতাংশ), তারপর আমেরিকা ৩৫ শতাংশ, ইইউতে ২০ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ। ভিয়েতনামে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি নীতিগত গুরুত্ব পাওয়ার কারণে চাহিদা ব্যবস্থাপনায় সাফল্যস্বরূপ (যেমন সুদের হার বৃদ্ধি) বিশ্বে উচ্চমূল্যস্ফীতির মাঝেও দেশটি ৫ শতাংশের নিচে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখতে পেরেছে।
মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনায় এ ভালো ফলাফলের বিপরীতে বাংলাদেশের কৃতিত্ব যে তেমন উজ্জ্বল নয় তা বলা বোধ করি বাহুল্য নয়। আগস্ট ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৩ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। বস্তুত সরকারি পরিসংখ্যান তাই বলছে, তাও বৈশ্বিক স্তরে খাদ্যসহ পণ্যের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে। মোট কথা, ২০২২ সালের আগস্টের মূল্যস্ফীতি চূড়া থেকে মাত্র ৭ শতাংশ নেমেছে সংকল্পবদ্ধভাবে স্থিতিশীল রাখার প্রাণান্ত প্রয়াস হিসেবে।
তিন.
মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা সহজেই অনুমেয় এবং কিছু দীক্ষা আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত। প্রথমত, এ ধারণাই ভুল যে যেহেতু মূল্যস্ফীতির উৎপত্তি বাইরে থেকে, সুতরাং কিছুই করা যাবে না এবং তা কিছুটা আত্মপ্রবঞ্চনাপূর্ণ। মূল্যস্ফীতিকে শক্তিশালী চাহিদা ব্যবস্থাপনা নীতির আওতায় পোষ মানাতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুদের হার বাড়িয়ে ব্যক্তি খাতের ঋণের প্রবাহ প্রয়োজন মাফিক রাখা এবং রাজস্ব ঘাটতি সংযত রাখা। আট মাস ধরে চলমান মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ পৌঁছে কঠোর অভিঘাত হানছে দরিদ্র, নিম্ন আয় ও মধ্যম আয়ের মানুষগুলোর ওপর এবং তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা কী করছেন তাও জানা—পুষ্টির অভাব, শিক্ষা –স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হ্রাস, মানসিক অস্থিরতা ধারদেনা করে চলা, সম্পদ বিক্রি ইত্যাদি। অতএব কালবিলম্ব না করে অচিরেই এর মোকাবেলা করতে হবে। বিশেষত রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত উপদেশ হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এটা করতেই হবে।
মূল্যস্ফীতি নিজে নিজে তো যাবে না, বরং তা অনমনীয় হয়ে উঠতে পারে যদি ঋণ বৃদ্ধি আর ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হয়। ঠিক এ মুহূর্তে সব দেশে মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনাকে বিরাজনীতিকরণের লক্ষ্যে অনেক উন্নত দেশে স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে যারা সুদের হার নীতির মাধ্যমে ঋণের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংক তেমন স্বাধীনতা ভোগ করে বলে বেয়াকুফও বিশ্বাস করে না। তার পরও বলতে হয় যে (ক) বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে জরুরি ভিত্তিতে ছয়/নয় সীমা তুলে দিয়ে নমনীয় সুদের হারে ঋণপ্রবাহ ঠিক রাখা; (খ) সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনাকে সহজতর করার জন্য টি-বিলস বাজার উন্নয়ন করা এবং (গ) সরকারের উচিত হবে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি কৌশলকে সাহায্য করা, রাজস্ব ঘাটতি হ্রাসে কম সুদে বিদেশী ঋণ গ্রহণ এবং বড় বড় পুঁজিনিবিড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা।
চার.
পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশে করোনার কারণে কৃত্রিম চাহিদা সংকোচন লক্ষ করা গেছে যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল পড়ন্ত। কিন্তু যেই করোনার করালগ্রাস থেকে ভোক্তা এবং বিনিয়োগকারী অব্যাহতি পেলেন, অমনি বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আছলে পড়ল বাজারে। এমনিতে থাকা অপেক্ষাকৃত কম জোগান, তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চাহিদা-জোগান ব্যবধান বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালছে। সুতরাং বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি একদিকে ডিমান্ড পুল অন্যদিকে কস্ট পুস। অন্তত সুদের হার বৃদ্ধি করে চাহিদা সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে পারলে আপাতত বাঁচোয়া।
ব্যবসায়ী কিংবা বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য অন্য রকম: সুদের হার বাড়লে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমবে। যদি প্রশ্ন করা হয় যে সুদের হার জোর করে নিচে রাখার ফলে গত কয় বছর বিনিয়োগ বৃদ্ধি কতটুকু হয়েছে। এর উত্তর নিশ্চয় উল্লসিত হওয়ার মতো হবে না। আসলে বিনিয়োগ অনেক উপাদানের ওপর নির্ভর করে। তার মধ্যে সুদের হার অন্যতম, এমনকি প্রধান নিয়ামক।
পাঁচ.
পল স্যামুয়েলসনের বিখ্যাত বই ‘ইকোনমিকস’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘দি ইকোনমিক রোল অব গভর্নমেন্ট’ নামে একটা উপ-অধ্যায়ে বলা আছে, বাজারের সুফল সবার কাছে পৌঁছতে হলে সরকারের করণীয় কী। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বাজারে প্রতিযোগিতার প্রতিবন্ধকগুলো দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া, অর্থাৎ কঠোর হস্তে একচেটিয়া ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। ‘অদৃশ্য হাতের’ পেছনে অনুমিত শর্ত হচ্ছে সব বাজার প্রতিযোগিতামূলক থাকবে। এই তো ক’দিন আগে মুরগির দাম হঠাৎ আকাশচুম্বী এবং তার পরই ধপাস মাটিতে। এ দুই প্রবণতা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের লক্ষণ নয়। এবং সবাই জানে মুরগির বাজার অলিগোপলি কিছু বিক্রেতা, বহু ক্রেতা তেমনি চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চাতাল, আড়ত, মিল মালিক।
সুতরাং কেবল আন্তর্জাতিক কারণে নয়, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অভ্যন্তরীণ কারণেও। শিষ্টের লালন আর দুষ্টের দমন বাঁচার একমাত্র উপায়। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক