বিগত এক যুগ ধরে সামাজিক
ও অর্থনৈতিক
ক্ষেত্রে ধারাবাহিক
উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ২০১৫
সালে বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী নিম্ন
আয়ের দেশ থেকে নিম্ন
মধ্যম আয়ের
দেশে পরিণত
হয়েছে। আবার
জাতিসংঘের মানদণ্ড
অনুসারে ২০১৮-২১ সালের
পর্যালোচনায় ধারাবাহিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে
উন্নয়নশীল দেশে
উত্তরণের সব শর্ত পূরণ
করে। গত দশকে কভিড-১৯-এর আগ পর্যন্ত
বাংলাদেশ বিশ্বে
দ্রুততম বর্ধনশীল
অর্থনীতিগুলোর মধ্যে
অন্যতম ছিল।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে
ফেলে বাংলাদেশ
মাথাপিছু আয় ও সামাজিক
সূচকগুলোর মধ্যে
প্রায় অধিকাংশ
ক্ষেত্রে এগিয়ে।
এর সঙ্গে
রয়েছে এমডিজি
ক্ষেত্রে প্রভূত
সাফল্য ও দারিদ্র্য নিরসনে
অসামান্য অর্জন।
আমাদের দেশের
প্রথিতযশা ব্যক্তি
ও প্রতিষ্ঠানের মুখে তা খুব বেশি উচ্চারিত
না হলেও
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম,
নামকরা অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চোখ এড়ায়নি। তারা
নির্ধিদ্বায় বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরেছেন।
এত প্রতিকূলতার মাঝে বাংলাদেশের স্বল্প
সময়ে উত্থান
লাভ বিশ্বের
নামজাদা গণমাধ্যমের কাছে এক বিস্ময়
হয়ে ধরা দিয়েছে।
আমেরিকার নিউইয়র্কভিত্তিক অন্যতম সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (৩ মার্চ, ২০২১) বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির ‘বুল কেস’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করে পত্রিকাটি বলেছে, বাংলাদেশের রফতানি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামে যে উন্নয়ন মডেল দেখা গিয়েছে তার সবচেয়ে কাছাকাছি মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশকে। নিউইয়র্কভিত্তিক আরো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাত সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ (৫ জুন, ২০২১) শিরোনাম দিয়েছে, ‘বাংলাদেশ ইজ অন দ্য রাইজ।’ কাজেই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সেদিকে নজর দেয়া উচিত। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ভারতের গণমাধ্যমগুলো তা নিয়ে সরব হলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো মোটেও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, যা ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রতিফলন হতে পারত। বাংলাদেশের উচ্চপ্রবৃদ্ধির পেছনে তিনটি ভিত্তি কাজ করেছে—রফতানি, সামাজিক খাতে অগ্রগতি ও আর্থিক দূরদর্শিতা। ২০১১-১৯ সময়ে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রতি বছর গড়ে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, অন্যদিকে গোটা বিশ্বে তা মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ঋণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি ধনী ছিল, আর বাংলাদেশ এখন ৪৫ শতাংশ বেশি ধনী।
আরো এক খ্যাতনামা
পত্রিকা নিউইয়র্ক
টাইমস (১০ মার্চ, ২০২১)
শিরোনাম লিখেছে
‘বাইডেনের পরিকল্পনা
দারিদ্র্যের জন্য
কি কাজে
লাগতে পারে?
বাংলাদেশের দিকে
তাকাও।’ ৫০ বছর আগে গণহত্যা, অপরিচ্ছন্নতা ও ক্ষুধায় মৃত্যুর
মধ্যে জন্ম
লাভ করে বাংলাদেশকে মনে হয়েছিল আশাহীন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি
দ্রুত বেড়েছে।
করোনার আগের
চার বছরের
গড় প্রবৃদ্ধি
চীনকেও ছাড়িয়ে
গিয়েছে। এর পেছনে অন্যতম
রহস্য হলো মেয়েদের শিক্ষা
ও কর্মে
অংশগ্রহণ। বাংলাদেশে
এখন প্রাথমিক
ও মাধ্যমিক
স্কুলে ছেলেদের
চেয়ে মেয়েদের
সংখ্যা বেশি।
বাংলাদেশ সবচেয়ে
অবহেলিত ও পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর
পেছনে বিনিয়োগ
করেছে। এটা কোনো সহানুভূতি
নয় বরং কোনো জাতিকে
এগিয়ে নিতে
এটি সাহায্য
করছে, যা অন্যান্য দেশের
জন্য শিক্ষণীয়
হতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পত্রিকা
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস
(২৮ জুলাই
২০২২) লিখেছে,
উন্নয়ন বিষয়ে
বাংলাদেশ থেকে
অন্যরা কি শিক্ষা নিতে
পারে? পত্রিকাটি
বলছে, ‘দেশের
বর্তমান আর্থিক
পরিস্থিতির কিছুটা
সমস্যা থাকলেও
এর দ্রুত
অগ্রগতি থেকে
আফ্রিকার দেশগুলো
শিক্ষা নিতে
পারে। বাংলাদেশ
দেখিয়ে দেয় প্রকৃতপক্ষে কী করা সম্ভব
এবং যারা
অতীতের কিছু
পারফরম্যান্সকে ভবিষ্যতের
সম্ভাবনার দিকনির্দেশক মনে করে হতাশা
ব্যক্ত করে তাদের জন্য
এটি বড় ধরনের তিরস্কার।
বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধ
থেকে জন্মলাভের
সঙ্গে সঙ্গে
দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার মুখোমুখি হয়। সে সম্ভাবনাহীন সূচনা
থেকে এ সাফল্যের সংস্করণ।’
নিউইয়র্কভিত্তিক ম্যাগাজিন
নিউজ-উইক বাংলাদেশকে নিয়ে
কয়েকটি আলাদা
প্রতিবেদন প্রকাশ
করেছে। তার মধ্যে একটি
হলো, ‘অদম্য
বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের অগ্রগতি
অসাধারণ উল্লেখ
করে বলা হয়েছে, প্রক্ষেপণ
থেকে দেখা
যাচ্ছে এটা সবে শুরু।
সাম্প্রতিক দশকে
বাংলাদেশ যে অভাবনীয় অগ্রগতি
লাভ করেছে
তাতে অনেকে
যারা এখনো
অতীতের গণ্ডিতে
আবদ্ধ তাদের
বাস্তবতা মেনে
পুনরায় চিন্তা
করতে ম্যাগাজিনটি বলছে। অন্য আরো একটি প্রতিবেদনে ম্যাগাজিনটি বলছে, বাংলাদেশ
বিশ্বের মধ্যে
অন্যতম গতিশীল
ও সম্ভাবনাময়ী দেশ। ২০০৯ থেকে
শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার
পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তর
ঘটেছে এবং আগামী অর্ধশতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের শুধু
আঞ্চলিক পাওয়ারহাউজ নয় বরং বৈশ্বিক
পাওয়ারহাউজ হওয়ার
সম্ভাবনা রয়েছে।
বোস্টন কনসাল্টিং
গ্রুপ বলেছে,
২০৩০ সালের
মধ্যে বাংলাদেশ
১ ট্রিলিয়ন
ডলারের অর্থনীতি
হতে যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ম্যাগাজিন ফরেন পলিসি (১০ এপ্রিল, ২০২১) শিরোনাম লিখেছে, ‘বাংলাদেশের বাস্কেট কেস থেকে উদীয়মান তারকা হওয়ার দীর্ঘ অভিযাত্রা।’ ৫০ বছরে সব বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশ শেষ হাসি দিয়েছে। ম্যাগাজিনটি প্রেক্ষাপট বোঝাতে পুরনো ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ খরার মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে নদীমাতৃক ও বন্যাপ্রবণ দেশটির ঘূর্ণিঝড় হলো নিত্যসঙ্গী। এর ভেতরে সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলোয় বাংলাদেশ বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছে। জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টার ‘ডয়েচে ভেলে’ও (১৬ ডিসেম্বর, ২০২১) প্রায় একই শিরোনামে লিখেছে, ‘বাস্কেট কেস থেকে উদীয়মান অর্থনৈতিক তারকা।’ ৫০ বছরে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। জাপানভিত্তিক পৃথিবীর বৃহত্তম আর্থিক সংবাদ মাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার (২৩ নভেম্বর, ২০২০) শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশ সঠিক কারণে তার সমালোচনাকারীদের হতবাক করে দিয়েছে।’ বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে সঠিকভাবে পূর্ব এশিয়ার মডেল হওয়ার পথে হাঁটছে। মানব পুঁজিতে বাংলাদেশের বড় বিনিয়োগ ঢাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশকে নিয়ে বিষণ্ন পূর্বাভাসের সব ধরনের উপকরণই পর্যাপ্ত ছিল ঘনবসতিপূর্ণ শহর, অপ্রতুল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, কভিড-১৯-এর মতো দুর্যোগের আগমন, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে কভিড-১৯-এর সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ বোধহয় সবচেয়ে বিস্ময়কর। নিক্কেই এশিয়া (৮ জুন, ২০২১) এর আরো একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য কোনো পূর্বনির্ধারিত ছিল না। ওয়াশিংটনভিত্তিক ডিপ্লোমেট ম্যাগাজিন (১৫ মার্চ, ২০২১) লিখেছে, বাংলাদেশ ৫০ বছরে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ম্যাগাজিনটি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের উদাহরণ টেনে বলছে একসময় ক্ষুধায় জর্জরিত দেশটি এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পেছনে শেখ হাসিনাকে কৃতিত্ব দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য ভারতের মতো রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস্ অব ইন্ডিয়া (৩ এপ্রিল, ২০২২) লিখেছে, বাংলাদেশ কেন ভারতকে অনেক পেছনে ফেলেছে? ১৪ বছর আগে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের মাত্র অর্ধেক ছিল। অথচ গত বছর ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। সহস্রাব্দের দ্বিতীয় দশকটি ছিল বাংলাদেশের জন্য সোনালি দশক। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য তা শুধু ঈর্ষার কারণ হতে পারে। হিন্দুস্থান টাইমস (২৪ অক্টোবর, ২০২০) লিখেছে, ‘বাংলাদেশ: বাস্কেট কেস থেকে শক্তিশালী অর্থনীতি।’ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় তা এখন মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে উন্নয়ন মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (১৬ অক্টোবর ২০২০) ব্যাখ্যা করেছে কেন বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু জিডিপির তুলনায় বেশি নজর কেড়েছে। অর্থনীতির বাইরেও বাংলাদেশের ধারাবাহিকভাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণ হলো গত দুই দশকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সূচক যেমন স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফরচুন ম্যাগাজিনের (৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯) ইন্ডিয়া সংস্করণে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে, ‘বছরের অর্থনৈতিক মিরাকল।’ উচ্চ প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে জেন্ডার অসমতা দূরীকরণ; সব ক্ষেত্রে যদি কোনো দেশ প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে থাকে সেটি হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হিসেবে ধরা হয়েছে কর্মজীবী নারীদের। কারণ জেন্ডার সমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে হার মানিয়েছে। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতে ২০ ও পাকিস্তানে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ যে এগিয়েছে নারীর কর্মক্ষেত্রে অধিক অংশগ্রহণ অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশের অগ্রগতি আমাদের প্রতিবেশী
দেশ ছাড়িয়ে
দক্ষিণ এশিয়ার
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে
এগিয়ে থাকা
দেশ শ্রীলংকারও মনোযোগ কেড়েছে। শ্রীলংকার
ইংরেজি দৈনিক
ডেইলি নিউজ
(২৫ এপ্রিল
২০২২) শিরোনাম
করেছে ‘শ্রীলংকা
ও পাকিস্তান:
বাংলাদেশ মডেল
থেকে শিক্ষা।’
অর্থনৈতিক সংকট
এড়াতে শ্রীলংকা
ও পাকিস্তান
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক
মডেল থেকে
শিক্ষা নিতে
পারে। শ্রীলংকা
যখন অর্থনৈতিক
মন্দার দিকে
ধাবিত হচ্ছে
তখন দক্ষিণ
এশিয়ার প্রতিবেশী
দেশ বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশিয়ার
অর্থনৈতিক মিরাকল
হিসেবে নিশ্চিত
হয়েছে। বাংলাদেশ
অভাবনীয় অর্থনৈতিক
অগ্রগতির মাধ্যমে
আঞ্চলিক যোগাযোগ,
ব্যবসা ও বিনিয়োগ সুযোগের
উদীয়মান কেন্দ্রে
পরিণত হয়েছে।
ভারত ও শ্রীলংকার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রগতির ব্যাপারে পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত। ‘বাংলাদেশ থেকে সাহায্য’ ঠিক এ নামেই শিরোনাম দিয়েছে পাকিস্তানের দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকা (২৪ মে, ২০২১)। ২০ বছর আগেও এটা অচিন্তনীয় ছিল যে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি পাকিস্তানের দ্বিগুণ হবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ‘অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউজে’ পরিণত হবে। আর পাকিস্তানের শোচনীয় অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ থেকে সাহায্য নিতে হবে। পত্রিকাটি বলছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২০ বছরে ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা পাকিস্তানের আড়াই গুণ বেশি। বাংলাদেশের এ সাফল্যের মূলে রয়েছে যথাযথ রাজস্ব ও মুদ্রা নীতি, রফতানিকে টার্গেট করে উদারীকরণ, দরিদ্রবান্ধব সরকারি ব্যয়, শিক্ষার প্রসার আর সরকারের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে কম জড়িত থাকা। বাংলাদেশের রফতানি ২০০০ সালে পাকিস্তানের অর্ধেক ছিল। ২০ বছরে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ৭০০ শতাংশ যা পাকিস্তানের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। বাংলাদেশের রফতানি আয় এখন পাকিস্তানের দ্বিগুণ।
একইভাবে পাকিস্তানের আরো একটি পত্রিকা পাকিস্তান ট্রিবিউন (২১ মার্চ ২০২১) ব্যাখ্যা করেছে কীভাবে এবং কেন বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ভালো করেছে। চারটি উপাদান বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভিক্ষুক থেকে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল দেশে পরিণত করেছে। সেগুলো হলো নেতৃত্ব, উদ্ভাবন, সুপরিকল্পনা ও ব্যক্তি খাতের বিকাশ। বাংলাদেশ কেন পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে তা বোঝার জন্য তিনটি বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশের মানুষের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল দক্ষতা বোঝা যায় গার্মেন্টস রফতানি বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নের অবস্থা দেখে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সরকার রাজনৈতিক মেরুকরণ থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি, শাসন ব্যবস্থা, সামাজিক ও মানব উন্নয়নে জোর দেয়। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী দেশের উন্নতির জন্য মনোযোগী নয়।
এ তো গেল বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নামকরা অর্থনীতিবিদ যারা বাংলাদেশের উন্নয়নকে নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এখনো পর্যবেক্ষণ করছেন তাদের মূল্যায়ন কী তা জানা দরকার। স্টিফান ডারকন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিক পলিসির অধ্যাপক। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর ব্রিটিশ বৈদেশিক সহায়তা সংস্থা ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে (ডিএফআইডি) প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। সম্প্রতি তিনি একটি বই লিখেছেন, ‘গ্যাম্বলিং অন ডেভেলপমেন্ট: হোয়াই সাম কাউন্ট্রিজ উইন অ্যান্ড আদারস লুজ।’ এ বইয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে বাংলাদেশকে নিয়ে যার নাম ‘দ্য বেঙ্গল টাইগার কাব’। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ বিগত তিন দশকের মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বে অন্যতম সফল গল্পগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে অনেক ভালো করেছে যেমন যথার্থ সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, গার্মেন্টস শিল্প কিংবা প্রবাসে কর্মজীবী পাঠানোর সুযোগের ক্ষেত্রে বহির্মুখী প্রবণতাকে উৎসাহ দেয়া। এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন সম্ভব হয়েছে। তিনি অধ্যায়ের শেষ বাক্যে বলেছেন, ‘হতে পারে আগামীতেও বাংলাদেশ আমাদের প্রতিনিয়ত অবাক করে দিতে থাকবে।’
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কৌশিক বসু বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তাছাড়া তিনি ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। ডিপ্লোমেট ম্যাগাজিনের এক সাক্ষাত্কারে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কিত তৃণমূল পর্যায়ের মানব উন্নয়ন দ্বারা তাড়িত বলে অভিহিত করেছেন। অন্য একটি নিবন্ধে (২৫ মার্চ, ২০২১) উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ হেনরি কিসিঞ্জারের ‘বাস্কেট কেস’ থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেস স্টাডিতে পরিণত হয়েছে। এ অর্থনৈতিক রূপান্তরের পেছনে অবশ্যই রাজনৈতিক উপাদান নিহিত রয়েছে। প্রগতিশীল সামাজিক নীতি ও কিছুটা ঐতিহাসিক ভাগ্য এ দুইয়ের ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে উদীয়মান ‘টাইগার’ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের এশিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও অপ্রত্যাশিত সাফল্য গাথা রয়েছে। ভারতের আরো একজন নামি অর্থনীতিবিদ ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরভিন্দ সুব্রামানিয়ান তার এক নিবন্ধে (১১ জুন, ২০২১) বাংলাদেশ মিরাকলকে প্যারাডক্স বা গোলকধাঁধা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশ দরিদ্র ও বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে। তার ভাষায় বাংলাদেশ হলো মেঘনার মিরাকল।
বিশ্বব্যাংক সময় সময় বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন অগ্রগতির উদ্দীপক গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে ২০০০ সালের পর থেকে দারিদ্র্য অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেড় দশকের এ সময়ে বাংলাদেশে আড়াই কোটির বেশি লোক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত রয়েছে। সব খাত দারিদ্র্য বিমোচনে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। দারিদ্র্য নিরসনের সঙ্গে সঙ্গে মানব পুঁজির উন্নয়ন ঘটেছে, জন্ম হার কমেছে ও প্রত্যাশিত গড় আয়ু এবং শিক্ষার হার বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ব্যক্তিত্বের বাইরে রাষ্ট্রনায়করাও বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রশংসা প্রকাশ করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মতে, বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিগত পাঁচ দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটেছে এবং বৈশ্বিক দারিদ্র্যের ভাগ কমাতে সাহায্য করেছে। একই সুর পাওয়া যায় জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমেইয়ারের ভাষায়ও। বর্তমান বাংলাদেশ হলো উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীল গণতন্ত্রের দেশ। বাংলাদেশ উদ্ভাবনী উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমাতে সক্ষম হয়েছে।
আমেরিকার
অন্যতম বৃহত্তম
ব্যবস্থাপনা পরামর্শক
প্রতিষ্ঠান বোস্টন
কনসাল্টেটিভ গ্রুপের
বাংলাদেশের ওপর বিশেষ প্রতিবেদন
‘দ্য ট্রিলিয়ন
ডলার প্রাইজ’
ওপর আলোকপাত
করে শেষ করতে চাই।
২০১৬-২১ এ সময়ে
বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি
হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যা তার তুলনীয়
দেশ ভিয়েতনাম,
ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন নিম্ন
মধ্যম আয়ের
দেশ থেকে
অনেক বেশি
ভালো করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ভোক্তাদের
আশাবাদ, ভোগ বৃদ্ধি (বিশ্বের
নবম ভোগ বাজার), তরুণ
শ্রমশক্তি (জনসংখ্যার
মধ্যমা বয়স ২৮), উচ্চ
অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল গতিবেগ (১৭৭ মিলিয়ন মোবাইল
ব্যবহারকারী), সরকারি
ব্যয় বৃদ্ধি
(বিগত দশকে
তিন গুণ বেড়েছে), ব্যক্তি
খাতে দ্রুত
বৃদ্ধি, দ্রুত
বর্ধনশীল গিগ অর্থনীতি (বিশ্বের
মোট ফ্রিল্যান্সারের ১৫ শতাংশ)। বাংলাদেশের অর্থনীতি
যদি ১০ শতাংশ হারে
বাড়ে তাহলে
২০৩০ সালে,
৫ শতাংশ
হারে বাড়লে
২০৪০ সালে
ট্রিলিয়ন ডলারের
বড় ইকোনমিতে
পরিণত হবে।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ অনুযায়ী অর্থনীতিকে আগামী দুই দশকে গড়ে ৯ শতাংশ হারে বাড়তে হবে। কভিড-১৯-এর পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না হলে হয়তো এখন প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ বা তার কাছাকাছি থাকত। সে হিসেবে আমরা যদি বাস্তবিক প্রক্ষেপণ করি তাহলে ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হব নিশ্চিত। ২০০৯-এর পর থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক গতি ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এ কথা বাহুল্য নয় কারণ চীন তিন দশক পর্যন্ত দুই অংকের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। স্টিফান ডারকনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তাই বলতে হয়, ‘বাংলাদেশ ক্রমাগত বিশ্বকে অবাক করে দিতে থাকবে।’ কবি সুকান্তের ভাষায়, ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়।’
ড. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার