পাচার

‘প্রত্নসম্পদ’ চুরি রোধ ও পাচার হওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ফিরিয়ে আনতে করণীয়

প্রত্নসম্পদ ও মূর্তি পাচার নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রায়ই প্রতিবেদন প্রকাশ হয়, তথাপিও পাচার রোধ করা সম্ভব হয় না। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্যের বেশ কদর রয়েছে।

নিউইয়র্কের বিখ্যাত মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, এশিয়া সোসাইটি মিউজিয়াম, ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম, নরটন সাইমন মিউজিয়াম, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ফ্রান্সের গিমে মিউজিয়াম, বার্লিনের মুজেউম ফ্যুঅর আজিয়াতিশে কুনস্ত ইত্যাদি পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন মূর্তি গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে। এছাড়া আমেরিকা ও ইউরোপে বিত্তশালীদের রয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা। এ সংগ্রহগুলোও বেশ সমৃদ্ধ। এদের অনেকের সংগ্রহশালায় বাংলার জানা-অজানা সাংস্কৃতিক সম্পদ পাচার হয়ে নীরবে-নিভৃতে স্থান পেয়েছে, যা হয়তো কেউ কখনো দেখার সুযোগ পাবে না। কয়েক বছর আগে এ ধরনের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহের কাঠের বিষ্ণু মূর্তির ছবি আমার কাছে পাঠিয়েছিল এক বন্ধু মূর্তিটির সময়কাল ও শিল্পগুণ সম্পর্কে জানার জন্য।

আমি বিষ্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম এটি বাংলার প্রাচীনতম একটি ভাস্কর্য, যা বাংলার নিজস্ব শিল্পশৈলীর ঊষালগ্নের সৃষ্টি। পরে আমি এর ওপর একটি রিসার্চ আর্টিকেল ছাপিয়েছিলাম জার্মানির এক বিখ্যাত জার্নালে। একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এ ধরনের একটি ভাস্কর্য পরীক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলাম অথচ আরো কত শত ভাস্কর্য পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরের স্টোরে কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহে আমাদের অজান্তে পড়ে আছে তার ইয়াত্তা নেই। মুন্সিগঞ্জের শিয়ালদী গ্রামের একটি মন্দিরের বিষ্ণুর কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মূর্তিটির ছবি নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯২৯ সালে ঢাকা মিউজিয়ামের ক্যাটালগে ছেপেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এটি পাচার হয়ে যায়। ডাক্তার ডেভিড নালিন নামে এক ব্যক্তি যিনি একসময় কলেরা হাসপাতালে কাজ করতেন।

তিনি ছিলেন মূলত একজন সাংস্কৃতিক সম্পদ পাচারকারী। বাংলার প্রচুর ভাস্কর্য তিনি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে অবৈধপথে আমেরিকায় পাচার করেন। প্রথমে তার নামে ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা স্থাপনের আড়ালে, পরবর্তী সময়ে এসব অমূল্য সম্পদ বিক্রি করে দেন পৃথিবীর নানা জাদুঘরসহ ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছে। শিয়ালদীর ভাস্কর্যটি তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালের কোনো একসময়ে আমেরিকায় পাচার করেন। পরে তিনি এটি হার্বাডের ফগ আর্ট মিউজিয়ামে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০’র দশকে লোন প্রদান করেন, কিন্তু পরে শিল্পনিদর্শনের ডিলার পিটার মার্কসের মাধ্যমে ১৯৮৯ সালে ক্যানবেরার ন্যাশনাল গ্যালারি অব অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া প্রস্তর ও ধাতব ভাস্কর্যগুলো নিয়ে একটি ক্যাটালগও প্রকাশ করেন ‘মিডিয়েভাল স্কাল্পচার ফর্ম ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’ নামে। পশ্চিমে আর্ট অবজেক্ট কেনাবেচার জন্য বিভিন্ন অকশন কোম্পানি রয়েছে, যেমন সোথবি, ক্রিস্টি ইত্যাদি আর এগুলোর বৈধ-অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য রয়েছে নানা সুরক্ষা আইন।

উপমহাদেশের ভাস্কর্যশৈলীকে আমেরিকা ও ইউরোপের শিল্পরসিকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন বিখ্যাত শিল্পকলাবিদ আনন্দ কেন্টিশ কুমারস্বামী। পরবর্তী সময়ে স্ট্যালা ক্র্যামরিশ বিষয়টিকে আরো জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাল করেন। তিনি কুমিল্লার কয়েকটি ধাতব ভাস্কর্য নিয়ে ‘রুপম’-এ একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন ১৯২৮ সালে। রুপমে প্রকাশিত ভাস্কর্যগুলোকেও সুপরিকল্পিতভাবে ডেভিড নালিন পাচার করেন। প্যানেল ভাস্কর্যগুলোকে কেটে একক ভাস্কর্য হিসেবে তিনি ভারতের বিহারে প্রাপ্ত হিসেবে বিক্রি করে দেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বেশকিছু ধাতব ভাস্কর্য ময়নামতি জাদুঘর থেকে চুরি হয়ে যায়। এগুলোও বিদেশে পাচার হয়ে যায় এবং কোনো কোনো জাদুঘরে ভারতের ভাস্কর্য হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ধরনের একটি বৌদ্ধ আমিতাভ মূর্তি প্রতাপাদিত্য পাল তার ক্যাটালগে বিহারের ভাস্কর্য হিসেবে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু আমি প্রমাণ করেছি এটি চুরি যাওয়া কুমিল্লার বৌদ্ধ মূর্তি। একটি অনন্য শিল্পগুণসম্পন্ন বৌদ্ধ দেবতা অবলোকিতেশ্বরের রূপ খসর্পণের প্রস্তর ভাস্কর্য, তা বহুকাল আগে চুরি হয়ে বিদেশের মাটিতে ভারতের মূর্তি হিসেবে এক ব্যক্তিগত সংগ্রহের মর্যাদা বাড়াচ্ছে। ভট্টশালী মূর্তিটির ছবি প্রকাশ করেছিলেন ১৯২১ সালে।

যখন কোনো প্রত্নসামগ্রী বিদেশে পাচার হয়ে যায়, তখন সেটি তার পেছনের যাবতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে, কারণ পাচারকারীদের বহু হাত বদলে এটি কখনো বিহার কিংবা উত্তর ভারতের মূর্তি হিসেবে ভুল পরিচয়ে প্রদর্শিত হয়। ইউরোপ-আমেরিকার কোনো এক গ্যালারিতে ভারতীয়/পূর্ব ভারত/বিহার/পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি কোনো একটি লেবেলের চাদরে ঢাকা পড়ে ভাস্কর্যটির প্রকৃত পরিচয়। যদিওবা কালেভদ্রে প্রাপ্তিস্থান হিসেবে বাংলাদেশ লেখা থাকে, তবে থাকে না বাংলার কোন ঘরানার শিল্পকর্ম তার উল্লেখ—উত্তরবঙ্গ, বঙ্গ, সমতট না হরিকেল? অনেক বিখ্যাত বিদেশী গবেষক এ ধরনের ভাস্কর্য়েও প্রাপ্তিস্থান উল্লেখ করতে গিয়ে ভুল করেছেন, যেগুলোকে আমি আমার পিএইচডি গবেষণায় ভাস্কর্যটির শিল্পঘরানাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা করেছি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ভাস্কর্য এখনো রয়ে গেছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জাদুঘরে। যেমন বাংলার প্রাচীনতম প্রায় ২৩০০-২২০০ বছর আগের মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়/দ্বিতীয় শতক) ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম কলকাতা ও চট্টগ্রামের ঝিয়রির প্রায় ১২০০-১০০০ বছর আগের অসাধারণ ভাস্কর্যগুলো রয়েছে দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। পাকিস্তান আমলে খননে পাওয়া ধাতব ও প্রস্তর ভাস্কর্যের কিছু রয়ে গেছে পাকিস্তানের জাদুঘরে। মিসর, নেপাল, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো থেকে পাচার হওয়া বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী আমেরিকা, ফ্রান্সসহ অন্যান্য কয়েকটি দেশ থেকে ফেরত আনতে পেরেছে ১৯৭০ সালের ইউনেস্কো কনভেনশন ও নৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে। আমরাও ডেভিড নালিন কিংবা অন্যভাবে পাচার হওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ফেরত আনার চেষ্টা করতে পারি।

সাংস্কৃতিক সম্পদের পাচার রোধে যেমন আমাদের আইনের প্রয়োগ করতে হবে, তেমনিভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও প্রশিক্ষিত করতে হবে, আরো বেশি করতে হবে গণসচেতনতা সৃষ্টি। কারণ সাধারণ মানুষ যখন ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হবে, এর গুরুত্ব অনুধাবন করবে, তখনই কেবল সত্যিকারের পাচার রোধ সম্ভব হবে এবং জনগণ ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া: জাদুঘরতাত্ত্বিক ও শিল্পকলার ইতিহাসবিদ; অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও