করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দা, নিউ নরমাল লাইফ এবং আমাদের প্রস্তুতি

গত কয়েকটা মাস গোটা বিশ্বকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য এক জীবাণু। রীতিমতো মুর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কভিড-নাইনটিন। কোন কোন দেশে প্রকোপ কিছুটা কমলেও অনেক দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে গুনিতক হারে। করোনা ভাইরাস নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক দেশকে। আর এই মহামারীর কারণে বেশিরভাগ দেশেই দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ। উৎপাদন নেই, চলছে না শিল্প কারখানার চাকা। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না!

গত কয়েকটা মাস গোটা বিশ্বকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য এক জীবাণু। রীতিমতো মুর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কভিড-নাইনটিন। কোন কোন দেশে প্রকোপ কিছুটা কমলেও অনেক দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে গুনিতক হারে। করোনা ভাইরাস নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক দেশকে। আর এই মহামারীর কারণে বেশিরভাগ দেশেই দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ। উৎপাদন নেই, চলছে না শিল্প কারখানার চাকা। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না!

করোনা ভাইরাসের চক্করে তো আর ‘না খেয়ে’ মানুষ মরতে দেওয়া যেতে পারে না। আর সে কারণেই বিশ্বের অনেক দেশই এখন ‘নিউ নরমাল লাইফ’ নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। বিষয়টা এমন ‘যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়া’ এবং সর্বোচ্চ সাবধানতা নিয়ে জীবন চলমান রাখা। তার নামই নিউ নরমাল লাইফ। আর সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে অনেক দেশ।

ঠিক অতটা ধাতস্ত না হলেও বাংলাদেশেও জীবন গতি পেতে শুরু করেছে। হয়তো এখনও আগের মতো গতি পায়নি, তবে চলা শুরু করতে হয়েছে। এছাড়া উপায়ও যে ছিল না। ১৬ কোটির বেশি মানুষকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর সক্ষমতা তো আর বাংলাদেশের মতো দেশের নেই!

২.

যদিও এদেশের অনেক মানুষের জীবনই এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি। তার অনেকগুলো কারণ। এই যেমন এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান খোলেনি বা খুললেও বেশিরভাগই স্বল্প পরিসরে চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে দেশের সবচে বড় খাত হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্প তো ‘সুযোগ বুঝে’ কর্মী ছাঁটাইয়ের ‘সুযোগ’ নিয়েছে। যুক্তিও কড়া; ‘অর্ডার কমেছে, কাজ নেই তাই কর্মী ছাঁটাই’।

তাহলে নিউ নরমাল লাইফ তো আর ‘নরমাল’ থাকলো না! আর পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে, সামনের দিনগুলো আরও ‘অ্যাবনরমাল’ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ^ অর্থনীতি। আর এরই মধ্যে সে বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে অনেক দেশ। উন্নত বিশে^র বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদদের কপালে ভাঁজ পরেছে। কী করে চলবে দেশ, এ নিয়ে ইউরোপসহ অনেকেই তটস্থ। বিশ্ব অর্থনীতির রাঘববোয়ালরাও আসন্ন ‘অর্থনৈতিক মন্দা’ দেখতে পাচ্ছেন চোখের সামনে। তাতে আবারও বড় ধরনের ধ্বসের ইঙ্গিত পাচ্ছেন তারা।

৩.

 এবার না হয় বিষয়টি একটু দেশীয় প্রেক্ষাপটে ভাবার চেষ্টা করি। আমরা জানি যে, আশু অর্থনৈতিক মন্দার কথা মাথায় রেখে অনেক দেশই নিজেদের বাজেট কমাতে শুরু করেছে। সেটা ব্যাক্তি পর্যায়ে যেমন, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। এমনকি কোথাও তো রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কমছে বাজেট। তার ছিটেফোঁটা আমরা ঘরে বসেও শুনতে পাচ্ছি। জানতে পারছি। ক’দিন বাদে বুঝতেও পারবো। কারণ, ক’দিন বাদে তার প্রভাব আমাদের দেশেও পরবে। যার লক্ষণ টের পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অর্ডার বাতিল করছে। আর সংখ্যাটা দিনে দিনে বাড়ছে। কিন্তু এটাই যে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচে বড় খাত! এখন তবে বাংলাদেশের কী হবে? আমরা কী এ নিয়ে ভেবেছি? আমাদের কী ধরনের প্রস্তুতি আছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায়?

 আমরা এটা বলতেই পারি যে, এমন মন্দা এর আগেও অনেক দেখেছি কিন্তু তাতে আমাদের গা’য়ে কোন আঁচড় লাগেনি। কথা ঠিক। তবে মনে রাখবেন, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন! সেবার মন্দা এমন বৈশ্বিক ছিল না। আর তাই সেবার রেমিটেন্স দিয়ে ‘ঠেকা কাজ’ চালানো গিয়েছিল। কিন্তু এবার তো সেই সুযোগও কম। এবার সেই দেশগুলোতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের বড় বাজার হিসেবে খ্যাত মধ্যপ্র্যাচ্য থেকে এরই মধ্যে ফেরত এসেছে প্রায় ২৫ হাজারের মতো প্রবাসী। নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলে সেই সংখ্যা লাখ ছাড়াবে, সন্দেহ নেই। অন্যদিকে নতুন করে শ্রমবাজার খোলার সুখবরও সহসা মিলছে না। খারাপ খবর আছে আরও, যারাও বিভিন্ন দেশে এখনও আছেন, তারাও কর্মহীন, বেতনহীন। কোথাও কোথাও তো উল্টো দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে?

এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? বা আদৌ কী প্রস্তুত আমরা? 

রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী অবশ্য অভয় দিয়ে ফেরত আসা শ্রমিকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাদের নগদ প্রণোদনাসহ কাজে ফেরানোর উদ্যোগের কথা বলেছেন। ব্যবসা করতে চাইলে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তাতে হয়তো বেশ কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও হবে। কিছু মানুষের সমস্যার একটা হাল হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সংখ্যাটা কত? অর্থাৎ ঠিক কতজনকে প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হবে?

এদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। এদের একটা অংশও ফিরতি পথ ধরলে, বিপদে পরা ছাড়া গতি নেই। এমন তো নয় যে আমাদের একটা আয়ের খাত আটকে গেলে, বিকল্প খাত আকড়ে ধরার সুযোগ আছে!

৪.

অথচ আমাদের এমন দিন দেখতে হতো না যদি আমাদের হাতে ‘যোগ্য বিকল্প’ থাকতো। সেই সুযোগও আমাদের ছিল। নিজেদের উন্নয়ন গ্রাফ উর্ধ্বমুখি করাই শুধু নয় বরং বিকল্প তৈরি করার সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। সেটা করতে পারলে আমরা ঠিকই উৎড়ে যেতে পারতাম, এ যাত্রায়। এর দু’টো কারণ; এক. বিশ্বের অনেক দেশের থেকে আমাদের মানুষের ‘গড় চাহিদা’ কম। আর দুই. যেটুকু চাহিদা তা মেটানোর সক্ষমতা আমাদেরই থাকতো!

আমাদের হাতে বিকল্পও ছিল। শুধু প্রয়োজন ছিল সেই বিকল্পগুলোকে সঠিক পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসা। সত্যি বলতে কী, আমাদের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু তারপরও আমরা ব্যর্থ হয়েছি তার কারণ, পরিকল্পনাগুলো একটু গুছিয়ে এবং সততার সঙ্গে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি।

বোধকরি, বিষয়টি আরেকটু খোলাসা হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ যে এখন বিশ্বের উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য রোল মডেল, তার বড় কারণ আমাদের ধারাবাহিক উন্নতি। ক্রমবর্ধমান, ক্রমউর্ধ্বগতির উন্নয়ন। কিন্তু এটা তো আর আলাদিনের প্রদীপের দৈত্য এসে করে দিয়ে যায়নি! সেটা যে সম্ভব হয়েছে তার অনেকগুলো কারণ; প্রথমত রাজনৈতিক ধারবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা। আর দ্বিতীয়ত নিজেদের যতটুকু সম্পদই আছে তা সঠিক পরিকল্পনা মোতাবেক সম্পন্ন করা।

আমরা জানি আমাদের শক্তির জায়গা কোথায়। তাহলে সেই শক্তির জায়গাগুলোতে একটু ভালো করে কাজ করলেই হতো! সেই শক্তির জায়গা নিয়ে কাজ করতে বহুদিন ধরে পরিকল্পনাও চলছে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ পরিকল্পনাকারী বা রাষ্ট্রপ্রধান নিজে বিষয়টি নিয়ে যতটা সিরিয়াস, ততটা হতে দেখা যায়নি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীদের। সে কারণেই, এখনও আমরা নিদৃষ্ট গন্ডির মধ্যেই আটকে আছি।

তো এবার শক্তির বিচার হোক? দেশের শক্তির সবচে বড় আধার হিসেবে কৃষি আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। এখন অন্তত আমাদের না খেয়ে মরার ভয়টা কম। ইদানীং তো এ খাতে আমাদের অনেক রেকর্ড। কিছু বাড়তি আয়ও আসছে। এর বাইরে সরাসরি অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে আমরা ধ্যানজ্ঞান মেনেছি আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে। আর আছে সবে ধন, রেমিটেন্স। ভালোই তো চলছি এ নিয়ে।

কিন্তু রাষ্ট্র প্রধান বরাবরই বলে আসছিলেন; ভবিষ্যত ভাবতে। বলছিলেন, ভবিষ্যত শক্তপোক্ত করতে বৈদেশিক মুদ্রার চালান নিয়মিত হওয়া চাই। আর সে জন্য প্রয়োজন ‘রফতানিপণ্য বহুমুখিকরণ’! আর সেই কাজটাই ঠিকঠাক হলো না এখন পর্যন্ত। শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নির্ভরতা একদিন বিপদে ফেলতে পারে, গবেষকদের এমন পূর্বাভাসই শেষতক সত্যি হতে চলেছে। তাও এমন একটা সময়, যখন নিজেদের শক্তির বহুমুখিকরণ খুবই প্রয়োজন ছিল। রেমিটেন্স আর তৈরি পোশাকের পাশাপাশি আরও কিছু নতুন পণ্যের বাজার তৈরি হলে, অর্থনীতির এমন ভঙুর হাল হতো না।

রফতানি পণ্য বহুমুখি করতে পারলে আজ একটা ‘ব্যাকআপ’ পাওয়া যেতো। এমনও নয় যে, আমাদের হাতে পণ্য ছিল না। এমন নয় যে আমাদের পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু তারপরও আমরা ব্যর্থ, কারণ আমাদের পরিকল্পনাগুলোর টেকসই বাস্তবায়ন হয়নি।

৫. 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রফতানিমুখি পণ্য বহুমুখি করার কথাই শুধু বলেননি বরং সেটা করতে কোন ধরনের পণ্য নিয়ে ভাবা যেতে পারে তারও একটা ধারণা দিয়েছেন তিনি। তার মধ্যে পাদুকা বা চামড়া আর আমাদের ঐতিহ্য পাট ও পাটজাত পণের্যার প্রতি বিশেষ নজর আছে প্রধানমন্ত্রীর। তার মতে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য পণ্য তালিকা থেকে এ দু’টি পণ্য নিয়ে দ্রুতই বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা উচিত। তার মতে, এ দু’টো আপাতত আমাদের সম্ভবনার নতুন দরজা হতে পারে। কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারিনি। পণ্যদুটিকে ব্র্যান্ডি করতে পারিনি। কেন পারিনি, সেই ব্যবচ্ছেদ করতে কাজটা কতদূর এগিয়েছে বা এগিয়েছিল তা জানা জরুরি।

উত্তর সহজ; খুব বেশি দূর এগোয়নি। তার কারণ, আমরা শুধু এ নিয়ে ভেবেছিই, কাজের কাজ হয়েছে কমই। থ্রাস্ট সেক্টর ঘোষণা করা কিংবা সত্যিকারের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগুতে চাইলে, একটি পণ্য বা খাতকে যতটা প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন ছিল, আমরা ততটা দিতে পেরেছি কি? 

উল্টো সেই পুরোনো পাতেই ঘি, মাখন ঢেলেছি আমরা। তেলে মাথায় আরও তেল, অথচ বাকিরা শুষ্কই থেকেছে। অন্যদিকে যাদের মাথায় তেল ঢেলে তেলেতেলে করে দেওয়া হয়েছে, তারাই প্রণোদিত হওয়ার পর নানা অনৈতিক সুযোগ নিয়েছে। ‘শ্রমিক ছাঁটাই’য়ের মতো ঘটনা ঘটিছে, করোনার কঠিন সময়েও। এ তো ঘোরটোপ!

আমাদের এই ঘোরটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটাই এখন সবচে জরুরি।

৬. তৈরি পোশাক বনাম অন্যান্য রফতানিপণ্য

এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, চামড়া কিংবা পাট শিল্পকে সুযোগ দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের বিরোধিতা করছি। তাছাড়া দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আমাদের আয় ‘অস্বীকার’ করারও তো সুযোগ নেই। তাদেরকে এক-আধটু সুযোগ-সুবিধা তো দিতেই হবে।

এ খাতের কাঁচামাল আমদানিতে খরচার হিসেব বাদ দিয়ে কিংবা নিন্দুকের মতো শুধুই ‘সেলাই থেকে প্রাপ্ত আয়’-এর হিসেব না করে বরং আমরা একে মোটা দাগেই দেখছি। তাতে এ খাত এখনও পর্যন্ত দেশের সবচে বেশি বৈদেশিক অর্থ আয়ের ক্ষেত্র।

বলতে চাইছি, তৈরি পোশাক শিল্পের ছিঁটেফোঁটাও যদি মিলতো এ দু’টি খাতে, তবে এতদিনে হয়তো এ খাতদুটিও আমাদের অর্থনীতিতে শক্তপোক্ত দুটো পিলার হয়ে দাড়িয়ে যেতে, এই কঠিন সময়ে।

৭.

রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর পরিকল্পনাতেই গেলো ক’টা বছর ধরে ফি-বছর একেকটি পণ্যকে ‘বর্ষ পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সেই পণ্যের রফতানিতে মনোযোগি হওয়ার নির্দেশনা ছিল। ঘটা করা আনুষ্ঠানিকতায় সেই পণ্যগুলো দিয়ে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার রফতানির স্বপ্ন দেখানো মানুষগুলো ‘পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’-এর নামে মুঠোভর্তি পয়সা লুটে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু ‘বর্ষ পণ্য’ থেকে গেছে পাওয়ার পয়েন্টের পাতাগুলোতেই। ফি-বছর সেই পাতায় কিছু যোগ-বিয়োগ হয়ে নতুন স্বপ্নের ফাইল উঠেছে ওপরে। তাতে কাজের কাজ হয়নি। সম্ভাবনার জায়গাগুলো দিনে দিনে ‘সম্ভব না’-এ পরিণত হতে দেখেছি।

অথচ পণ্যের বহুমুখিকরণের সেই সুযোগ তো এখনও আছে। দেশের চামড়া কিংবা আরেকটু নিদৃষ্ট করে বললে পাদুকা শিল্প তার অন্যতম বড় প্রমান। কথায় কথায় প্রণোদনা না পেলেও এই শিল্প দেশকে ঠিকই বৈদেশিক মূদ্রা দিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা পাট ও পাটজাত পণ্যের বেলাতেও সত্য। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে আমাদের এক সময়ের ‘সোনালী আঁশ’ ফিরিয়ে আনার স্বপ্নটাতে নিজেরাই গলাটিপে হত্যা করছি আমরা। যদিও সম্প্রতি সরকারের লোকসানী পাট কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে; নতুন করে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এখনো চলছে বিতন্ডা। হয়তো সুদিন আসবে!

তবে কী পণ্যের বহুমুখিকরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বারবারের নির্দেশনা কী মান্য হচ্ছে না? নাকি নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী রাষ্ট্র-যন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে?

ঢালাও চটকদারি কথা না বলে বরং কিছু তথ্য-উপাত্তের দিকে নজর দেওয়া যাক। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের নৈতিক চর্চা উন্নয়ন সংক্রান্ত বেসরকারি সংস্থা ‘সেডেক্সে’। তারা তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে শুধু তৈরি পোশাক নয় বরং পাদুকা ও নির্মান শিল্পেও ধ্বস নামিয়েছে কভিড-১৯।

তাদের ভাষ্যমতে, ‘একথা বলা বাহুল্য যে করোনাভাইরাসের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। অনেক দেশের ক্রেতারা চাহিদা দিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাতে থেমে গেছে কারখানার সেলাই মেশিন। চাকরীহীন হয়ে পরছে এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো।’

কিন্তু ২৬ মে ‘সেডেক্স ইনসাইটস রিপোর্ট: কভিড- ১৯ ইম্প্যাক্টস অন বিজনেসেস’ নামের প্রতিবেদনটিতে ১শ ১৮টি দেশে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কভিড-১৯-এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চায় সংস্থাটি। সেই গবেষণায় মিলছে; ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬৭ শতাংশ জানিয়েছে, কভিডের প্রভাবে আয় কমে যাওয়ার কথা। জরিপ অনুযায়ী, মহামারির প্রভাবে আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পোশাক, পাদুকা ও নির্মাণ খাত।

উত্তরদাতাদের ২০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের খদ্দেররা ক্রয়াদেশ বাতিল করেছেন। উত্তরদাতাদের ৪ শতাংশ পণ্যের মূল্য বিলম্বে পরিশোধ হবে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন বা হচ্ছেন।

তাদের জরিপের একটা উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো; ওই জরিপে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪শ ৬৯টিই পোশাক আর পাদুকা খাতের। যার মধ্যে চীনের ১০৭টি, ভারতের ৭৭, বাংলাদেশের ৪৬ এবং তুরস্কের ৩টি ছিল।

৮. যে কথার শেষ নেই...

তৈরি পোশাকশিল্প খাতে ৮২ শতাংশ যদিও কাঁচামাল আমদানি করতে হয়, ফলে আমদানি রফতানির হিসাবে বাঁচে শুধু শ্রমিকের মজুরির অঙ্কটাই। ওটাই শেষ পর্যন্ত আয়। আর সে কারণেই সরকারও মনে করছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পক্ষান্তরে চামড়াজাত পণ্যের কাঁচামালের বড় অংশের জোগান আসে দেশের ভেতর থেকেই।

গাণিতিক হিসেবে এ মুহূর্তে দেশের সর্ববৃহৎ রফতানি শিল্পের নাম অবশ্যই তৈরি পোশাক খাত। সে জন্য তাদের চাওয়া-পাওয়ার হিসেবও একটু বড় হবে। কিন্তু তাই বলে দেশের দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ অথবা সম্ভাব্য রফতানি খাতগুলোর কথা ভাবতে হবে না?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রফতানি বহুমুখী করার ওপর জোর দিতে গিয়েও উঠতি খাতগুলোকেই বেশি নজর দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সবার নজর তো সীমাবদ্ধ, নিদৃষ্ট খাতে নিবদ্ধ!

দৃষ্টি যতক্ষণ না প্রসারিত হচ্ছে, ততদিন আমাদেরও ‘বড় অর্থনীতির দেশ’ হয়ে ওঠা কঠিন। অর্থনীতির ভিত শক্ত করতে আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতিও তো থাকা চাই!

পান্থ রহমান, গণমাধ্যমকর্মী

আরও