ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষত এ ভূখণ্ডে সামাজিক বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিল মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক প্রয়োজনে। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষকে নিজেদের ছাঁচে বিন্যস্ত, গণনা এবং সর্বোপরি শাসন করার উপায় হিসেবে মূলত ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সোসিওলজি’ ও নৃবিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছিল। ফলে শুরু থেকেই আমাদের চিন্তাকাঠামোয় ইউরোপকেন্দ্রিক তত্ত্বের ওপর একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক পরনির্ভরশীলতা তৈরি হয়। তবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীকালে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের রূপান্তর আমাদের এ অঞ্চলের মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান তখন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সেবা করার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এক গভীর অধিবিদ্যাগত অনুসন্ধানের মুখোমুখি হয়। সেটি হলো একটি সদ্য স্বাধীন ও উদীয়মান জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং আকাঙ্ক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করা। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমাদের আঞ্চলিক সামাজিক বিজ্ঞান পশ্চিমা বিমূর্ত তত্ত্বের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে স্বকীয়তা খোঁজার চেষ্টা শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ দেশের গবেষকরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, কীভাবে বস্তুগত বাস্তবতা, কৃষি উৎপাদন সম্পর্ক, ভাষাগত ঐক্য এবং প্রথমে বাঙালি ও পরে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমাদের সমাজ বাস্তবতাকে রূপদান করেছে। তাও দীর্ঘকাল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস একটি দ্বান্দ্বিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। এর একদিকে ছিল পশ্চিমা তত্ত্বের অবিকল অনুকরণ, আর অন্যদিকে ছিল গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটানোর নিজস্ব প্রয়াস।
সমসাময়িক প্রবণতা পজিটিভিজম বা প্রত্যক্ষবাদের আধিপত্য: সমসাময়িক সামাজিক গবেষণার প্রবণতাগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই, বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রটি অত্যন্ত গতিশীল। একই সঙ্গে এটি নানা বিতর্কে মুখর। আজ আমরা একাধারে স্থানীয় আর্থসামাজিক উন্নয়ন আর অন্যদিকে বৈশ্বিক একাডেমিক চাপের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বর্তমান সময়ে আমাদের গবেষণায় পজিটিভিজম বা প্রত্যক্ষবাদী পদ্ধতির জোয়ার লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন খাত (এনজিও) এবং বৈশ্বিক অর্থায়ন কাঠামোর চাহিদার কারণে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা এখন বহুলাংশে অভিজ্ঞতাবাদ, পরিমাণগত সূচক এবং নীতিনির্ধারণী কার্যকারণ সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত জোর দিচ্ছে। এ পজিটিভিস্ট ধারাটি আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন, জনস্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের মতো বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর তথ্য সরবরাহ করেছে, যা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এর একটি বড় তাত্ত্বিক খেসারতও আমাদের দিতে হচ্ছে।
একটি কঠোর পজিটিভিস্ট এবং উপাত্তচালিত পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সমসাময়িক সামাজিক বিজ্ঞান মানুষের জটিল সামাজিক অভিজ্ঞতাগুলোকে কেবল কিছু গাণিতিক চলক বা ‘ভেরিয়েবল’-এ রূপান্তরের ঝুঁকিতে ফেলছে। আমরা এমন একটি ‘প্রযুক্তিগত সামাজিক বিজ্ঞান’ চর্চার দিকে ধাবিত হচ্ছি, যা কেবল কোনো ঘটনা কীভাবে ঘটছে তার উপরিভাগ দেখায়। কিন্তু এর পেছনের গভীর ও কাঠামোগত কেন বা কারণগুলোকে আড়াল করে দেয়। ফলে আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চার যে একটি আমূল পরিবর্তনকামী ও সমালোচনামূলক দিক ছিল, তা অনেক সময়ই উন্নয়ন দক্ষতা প্রমাণের টেকনোক্র্যাটিক মোড়কের নিচে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
তাত্ত্বিক কাঠামোগত ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ: এ বাস্তবতাই আমাদের এ একাডেমিক ইকোসিস্টেমের কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো জ্ঞানতাত্ত্বিক পরনির্ভরশীলতার সংকট। আমাদের গবেষণার এজেন্ডা বা বিষয়বস্তু প্রায়ই বহিরাগত দাতা সংস্থাদের অগ্রাধিকার দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা আমাদের দেশের নিজস্ব ও প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রা সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানগুলোকে আড়ালে ঠেলে দেয়। ফলে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষাঙ্গনের একটি বড় ব্যাধি আমাদের এখানেও দেখা যাচ্ছে। সেটি হলো একটি ‘কনসালট্যান্সি কালচার’ বা পরামর্শক সংস্কৃতি, যা দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক তত্ত্ব-গঠনের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি পলিসি ব্রিফ তৈরিকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
দ্বিতীয়ত, মৌলিক এবং অ-উপযোগিতাবাদী সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আমাদের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এ বস্তুগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের অন্যতম সেরা বিশ্লেষক মননগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে, যা একধরনের মেধা পাচার। পরিশেষে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত জটিল কোয়ান্টিটেটিভ মডেলের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক আর্থসামাজিক বাস্তবতার একটি অস্তিত্বতাত্ত্বিক দূরত্ব রয়ে গেছে। এটি প্রচলিত পশ্চিমা পরিমাপকগুলো দিয়ে সঠিকভাবে নিরূপণ করা অসম্ভব।
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্বের পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক সংযোগ: আমাদের ভবিষ্যতের পথচলাকে মূলত তিনটি প্রধান অক্ষে বিন্যস্ত করতে হবে।
প্রথমটি, পদ্ধতিগত বহুত্ববাদ। আমাদের অবশ্যই পজিটিভিজম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং কনস্ট্রাক্টিভিজমের (গঠনবাদ) মধ্যকার সংকীর্ণ বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি সমন্বয় প্রয়োজন যেখানে পরিমাণগত সূচকের সূক্ষ্মতাকে গুণগত বা কোয়ালিটেটিভ বিশ্লেষণের গভীরতা দিয়ে সমৃদ্ধ করা হবে; যেন এ ডিজিটাল যুগের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের বহুমুখী সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিকভাবে ধারণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশায়ন থেকে মুক্তি দরকার। গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের তাত্ত্বিকরা এখন আর পশ্চিমা পণ্ডিতদের বিশ্লেষণের জন্য কেবল ‘উপাত্ত সরবরাহকারী’ হিসেবে থাকতে রাজি নন। বৈশ্বিক ও দক্ষিণ এশীয় তত্ত্বের দরবারে বাংলাদেশকে এখন সক্রিয় অবদান রাখতে হবে। জলবায়ু-উদ্বাস্তু সমস্যা, প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার লড়াই এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক অর্থনীতির মতো আমাদের নিজস্ব সামাজিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের নিজেদের প্রেক্ষাপট থেকেই স্থানীয় তত্ত্ব বা ‘কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক’ গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, জরুরি আন্তঃশৃঙ্খল এবং মেটাতাত্ত্বিক ফোকাস। কার্স এ রূপান্তরের অগ্রভাগে থাকতে চায়। আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে অধিবিদ্যা, নৈতিকতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিজ্ঞান পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে বসবে—যাতে আমাদের গবেষণা একদিকে যেমন বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে ধারণ করতে পারে, তেমনি অন্যদিকে আমাদের স্থানীয় মানুষের মৌলিক মানবিক সংকটগুলোর সমাধান দিতে পারে।
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের (কার্স) উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা: অতীত ইতিহাস, সমসাময়িক প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে লেখকের দেয়া উদ্বোধনী বক্তব্যের মূল অংশ)
ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিচালক, উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (কার্স), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়