রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা সময়, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিচ্ছবিতে রূপ নেয়। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। আজ সকাল ৬ ঘটিকায় তার মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি হারাল এক দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতীক, এক আপসহীন নেতৃত্বের নাম। তার প্রয়াণের মাধ্যমে একটি যুগের অবসান ঘটল। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সেই বহুল উদ্ধৃত উক্তি ‘Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon them’ যাদের জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তাদের মধ্যে একজন হলেন বেগম খালেদা জিয়া। জন্মসূত্রে রাজনীতির কোনো প্রস্তুতি না থাকলেও ইতিহাস, দায়িত্ব ও নিয়তির অনিবার্য টানে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে রূপান্তরিত করেন এক অনন্য নেতৃত্বে।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট, ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ির নয়াবস্তিতে জন্ম নেয়া খালেদা খানম পুতুল বেড়ে উঠেছিলেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চৌকস ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তার জীবনের গতি ভিন্ন এক পথে প্রবাহিত হয়। তবে এ পরিবর্তন ছিল নীরব, আড়ালবহুল- একজন সেনা কর্মকর্তার সহধর্মিণী হিসেবে তিনি ছিলেন নীরব শক্তি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। স্বামী মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর তিনি দুই সন্তান নিয়ে আত্মগোপন, গ্রেপ্তার ও বন্দিত্বের মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন দখলদার বাহিনীর নির্মমতা। এ অভিজ্ঞতা তাকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করলেও স্বাধীনতার পরও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়াননি। এমনকি রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে ‘র্ফাস্ট লেডি’ হওয়ার পরও তিনি ছিলেন অন্তরালে-সংসার ও পরিবারই ছিল তার জগৎ।
কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক নির্মম সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাৎ বরণ করলে ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায়। দেশ, দল ও আদর্শ এক গভীর সংকটে পতিত হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এটি কোনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের চাপ থেকেই।
এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক যাত্রা। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে। আট বছরের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ়তা, সাহস ও নেতৃত্ব বিএনপিকে পুনর্গঠিত করে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শক্তিতে রূপ দেয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বেই বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম মেয়াদের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অবদান ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্বেও তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের স্পষ্ট প্রতিফলন- ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই রাজনীতির মূল কথা।
১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার সরকার নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দুর্নীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্নে তার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যা ইতিহাসের অংশ হিসেবেই মূল্যায়িত হবে। তবে এটিও সত্য যে এ সময় বিএনপি দেশের ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি বিস্তৃত গণভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়।
ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনীতির প্রধান নির্ধারক শক্তি। এক এগারোর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে তাকে রাজনীতি থেকে উৎখাতের চেষ্টা করা হয়। সন্তানদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন, নিজে কারাবরণ কোনো কিছুই তাকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, কারাদণ্ড, গৃহবন্দিত্ব সবই ইতিহাসের কঠিন অধ্যায়।
বিশেষভাবে আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা তাকে দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার মুক্তি এবং পরবর্তীতে খালাস প্রমাণ করে যে এ অধ্যায়ও ছিল বিতর্কিত ও সময়সাপেক্ষ।
তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ- ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, উৎপাদন ও সুষম বণ্টন। তিনি রাজনীতিকে কখনই কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখেননি। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল, দলের ঊর্ধ্বে দেশ এ দর্শন তিনি আজীবন ধারণ করেছেন।
তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেতা, আপসহীন আন্দোলনের প্রতীক এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার নেতৃত্বে বিএনপি কেবল একটি দল নয়, বরং গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আজ তার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল এক দৃঢ়চেতা নেতৃত্বকে। সমর্থক ও সমালোচক সব পক্ষের কাছেই তিনি ছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা। ইতিহাস তাকে বিচার করবে তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ের আলোকে। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র নির্মাণ ও রক্ষার সংগ্রামে এক অনিবার্য নাম।
তিনি ছিলেন দেশনেত্রী। কারণ তিনি দেশকে নিজের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ইতিহাস, কেননা ইতিহাস তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীণ প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’।
আবদুল লতিফ মাসুম: সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়