এক.
যখন বেড়ে উঠছিলেন, বিস্মিত অমর্ত্য সেন লক্ষ করলেন তাঁর কাকা/মামাদের এতজন, মায়ের একমাত্র ভাই কঙ্করমামা, বাবার কাজিন সিধু কাকা এবং উভয় দিকের বিভিন্ন কাজিনরা, একটা না একটা জেলখানায় আছেন। তাঁদের আটকে রাখা হয়েছে কোনো কিছু করার অপরাধে নয়, বরং তারা মুক্ত থাকলে ব্রিটিশ রাজের ক্ষতি করতে পারেন এমন আশঙ্কায়। সুতরাং ‘প্রিভেনটিভ ডিটেনশন’। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের সহিংস ঘটনা সংগঠনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকত কিন্তু কঙ্করমামার মতো অধিকাংশই দৃঢ়ভাবে অহিংস পথ পছন্দ করতেন। যা-ই হোক, এমনকি অহিংস লেখা বা ভাষণ জেলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল। তার সিধু কাকা এমন বন্দি ছিলেন না এবং জেলে থাকা একমাত্র আত্মীয় আদালতে যার বিচার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঢাকা থেকে সামরিক সরঞ্জাম, অর্থ নিয়ে চলা একটা ট্রেন যারা হরণ করেছিল এবং বিদ্রোহীদের হাতে ওইসব তুলে দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে সিধুর যোগাযোগ ছিল। ঢাকা স্টেশন ছাড়া মাত্রই আকস্মিক হামলা চালানো হয়। তার পিতা কখনো এমন কাজের সমর্থক ছিলেন না, না তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল; তবে বিদ্রোহীদের সাহায্য করার তাগিদে ট্রেন আক্রমণকারীদের প্রশংসা করেন।
দখলে নেয়া অর্থ হামলার পরের দিন সকালে বিদ্রোহীদের কাছে পৌঁছানো হয়। অমর্ত্য সেনের পিতা তার এক কাজিনের কাছে টাকা কোথায় রাখা আছে জানতে চাইলেন। কারণ পুলিশ হন্যে হয়ে ঢাকার সব জায়গায় ওই অর্থের সন্ধানে নেমেছে। পিতা আশুতোষ সেন অবাক হলেন শুনে যে টাকা তার বাড়িতেই নিচের তলায় বারান্দায় রাখা হয়েছে। কারণ আমরা জানতাম তারা কখনো আপনার বাড়িতে আসবে না।
সিধু জেলের বছরগুলোয় বেশ রূপান্তরিত হলেন বিশেষত মার্ক্স ও ফ্রয়দের প্রভাবে। মার্ক্সের প্রভাবে সহিংসতা নয়, বরং সংগঠনে মনোযোগ দিলেন অধিক। কমরেড মুজাফফার আহমেদের সঙ্গে সখ্য ওই জেলখানায় এবং মুজাফফার ছাড়া পেয়ে সিধুর মুক্তির জন্য লড়লেন। যেহেতু অমর্ত্য নিয়মিত কাকাদের দেখতে যেতেন, তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তারা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক – কেউ কংগ্রেস, কেউ কমিউনিস্ট কিংবা অন্য দলের। একবার বালক অমর্ত্য সেন কঙ্করমামাকে জিজ্ঞাসা করে—কমিউনিস্ট আর সোশ্যালিস্টের পার্থক্য কী? মামা বললেন, জেলখানায় নিবিড় পাহারায় রাজনৈতিক আলাপ করা যায় না, বিষয়টি নিয়ে পরে আলাপ করা যাবে।
দুই.
১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে পা রাখার সময় মনে ছিল দুর্ভিক্ষের দুঃখময় স্মৃতি। শিশুবয়সে দেখা ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ২০-৩০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। অমর্ত্যের স্মৃতিতে অম্লান সেই দুর্ভিক্ষের সম্পূর্ণভাবে শ্রেণীনির্ভর বৈশিষ্ট্য তাকে বেশি হতবাক করেছিল। অবাক হওয়ার মতো ছিল না যে সেই সময়ের প্রেসিডেন্সির ছাত্র কমিউনিটি রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় ছিল। অমর্ত্য সেন বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদানের জন্য জোরেশোরে উৎসাহী ছিলেন না, তবে রাজনৈতিক বামদের সহানুভূতির মান এবং সাম্যবাদী প্রতিশ্রুতি তার এবং তার বন্ধুদের অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছিল। এসব প্রারম্ভিক চিন্তার ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিবেশী গ্রামের নিরক্ষর শিশুদের জন্য শান্তিনিকেতনে যে বৈকালিক স্কুল খুলেছিলেন, তা এখন সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া খুব দরকার বলে তার কাছে মনে হতে থাকে। অন্যদের মতো তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ত বামপন্থী ছাত্রদের বৃহত্তর জোট ছাত্র ফেডারেশনে সময় ব্যয় করতেন। কিছু সময়ের জন্য এর নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন যদিও, ‘কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর সংকীর্ণতার বিষয়ে আমার অনেক আপত্তি ছিল’।
এর সামাজিক সমবেদনার নৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক উৎসর্গ এবং সমতার প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সে সময়ের পতাকাবাহক বাম রাজনীতিতে বিরক্তিকর কিছু ছিল, বিশেষত স্বাধীনতায় সংবেদনশীল বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি উদাসীনতা। তাদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র স্বীকৃতি পেত ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রের’ অভিধায়। তাদের কাছ থেকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রে জঘন্য টাকার খেলা যতটা ঘৃণা পেত এবং যা সত্যিকারভাবে শনাক্ত, বিপরীতে থাকা বিরোধিতাবিহীন একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার ভয়ংকর অপব্যবহার ততটুকু শক্ত সমালোচনা পায়নি। আর একটা প্রবণতা ছিল রাজনৈতিক সহনশীলতাকে এক ধরনের ‘ইচ্ছার দুর্বলতা’ হিসেবে গণ্য করা।
তিন.
প্রেসিডেন্সিতে থাকাকালে, এমনকি সেখানে যাওয়ার পূর্বে অমর্ত্য সেনের মনে বিরোধিতা, ভিন্নমত এবং সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের গঠনমূলক ভূমিকার বিষয়ে শক্ত বিশ্বাস জন্মায়। কলেজ স্ট্রিটের মূল স্রোতের ছাত্র বাম রাজনীতির কর্মকাণ্ডে এ বিশ্বাসগুলোর সংযোগ সৃষ্টি বেশ কষ্টকর প্রতীয়মান হতে থাকে। তার মনে হতে থাকে যে একটা গঠনমূলক সিভিল সোসাইটি সৃষ্টিতে এবং একে অন্যকে জানার প্রচেষ্টায় উদার রাজনৈতিক যুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে বহমান সনাতনী বহুত্ববাদী মূল্যবোধের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। তিনি মনে করলেন, রাজনৈতিক সহনশীলতা একমাত্র পশ্চিমা উদার ঝোঁক এমনতর ধারণা ভয়ানক একটা ভুল।
যদিও বিষয়গুলো মীমাংসিত ছিল না, তার পরও এখানে সেখানে বাম বলয় থেকে আসা কিছু মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব তাকে দিতে হতো। অন্যথায় সেগুলোকে অবজ্ঞা করা হতো। যেকোনো ধরনের একনায়কতন্ত্রের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি চারপাশে বিদ্যমান অতিরিক্ত রাজনৈতিক ধার্মিকতার প্রতি আরো বেশি সন্দেহ পোষণ শুরু করলেন অমর্ত্য সেন। এ ধার্মিকতা যখন অপ্রত্যাশিত জায়গায় প্রকাশ পায়, তা বেদনাদায়ক বটে। যেমন অমর্ত্য সেন জেবিএস হালদাইনের বামঘেঁষা সমতাভিত্তিক মনোভাব সবার প্রশংসা অর্জন করে এবং অমর্ত্য নিজে তার প্রতি চরম আকৃষ্ট হন। সুতরাং যখন তিনি শুনলেন হালদাইন বলছেন, ‘১৫ বছর ধরে আমি পাকাশয় প্রদাহে ভুগছিলাম এবং তারপর জানলাম লেনিন ও অন্যরা আমাদের সমাজের ভুলগুলো নির্দেশ করছেন, তখন থেকে আমার মেগনেসিয়ার দরকার পড়েনি’। এ রকম মন্তব্য অমর্ত্য সেনকে দারুণ হতাশ করে। এ মন্তব্য তিনি করেছিলেন ১৯৪০ সালে এক সাংবাদিকের কাছে এবং এ বক্তব্য অমর্ত্য সেনের সাথী কলকাতার বামপন্থীরা লুফে নিয়ে যেখানে সেখানে প্রচার চালাতে থাকে। অমর্ত্য সেন ভাবলেন, এটা যদি হালকা মন্তব্য হিসেবে হালদাইন ভেবে থাকেন তাহলে তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়, কিন্তু সত্যি যদি এটা তার পক্ষ থেকে গম্ভীর ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বলে মনে হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে তার চিন্তাভাবনা থেকে দূরে আসতে হবে এবং তিনি বললেন, ‘আমার উচিত হবে রাজনৈতিক ধার্মিকতার বিপরীতে মেগনেসিয়া বেছে নেয়া।’
চার.
ক্যান্সারে আক্রান্ত অমর্ত্য সেন যখন রেডিওথেরাপি নিচ্ছিলেন, তখন তার বাবা এবং মা চিন্তা করছিলেন তার ভবিষ্যতের কথা। পিতা আশুতোষ চাইলেন অমর্ত্য সেন ইংল্যান্ড যাক যেখানে তিনিও পড়াশোনা করেছিলেন। অমর্ত্য বললেন, ‘খুব ভালো প্রস্তাব কিন্তু আমাদের সামর্থ্য আছে কি?’ পিতা জানালেন যে খুব হিসাব-নিকাশ করে দেখেছেন তিন বছর লন্ডনে থাকার ব্যয় কোনোমতে মেটানো যাবে।
পিতা-মাতার পরামর্শে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন এল, অমর্ত্য সেন ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে গিয়ে কেমব্রিজের কলেজ অনুসন্ধানে আটঘাট বেঁধে নেমে পড়লেন। অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে বেছে নিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজ। ওখানকার নিউটন, বেকন, রাসেল এবং ট্রিনিটির কবি, অংকবিদ, পদার্থবিদ, মনোবিজ্ঞানী – এসব সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা কলেজে থাকতেই তার ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার মুহূর্তটি আসলে যখন জানতে পারলেন সেখানে অন্যান্য বিশ্ববিখ্যাতদের সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন মরিস ডব—বিংশ শতকের সবচেয়ে সৃজনশীল মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ, তখন আর তর সইল না। বেছে নিলেন ট্রিনিটি কলেজ। তার পছন্দ নিয়ে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে ডবের সঙ্গে কাজ করার রোমাঞ্চে আর কোনো কলেজে দরখাস্ত ঠুকেনইনি। বললেন, ট্রিনিটি নয় তো না। অবশেষে সীমিত সম্পদ সাপেক্ষে উড়োজাহাজে নয়, ট্রিনিটি তথা কেমব্রিজের পথে জাহাজে করে ১৯ দিনে ইংল্যান্ড যাওয়া।
পাঁচ.
অমর্ত্য সেন কেমব্রিজের উদ্দেশে প্রেসিডেন্সি ছাড়লেন ১৯৫৩ সালে, যে বছর স্তালিনের মৃত্যু হয় এবং ক্রুশ্চেভ কর্তৃক তার শাসনামলের অপকর্মের ফিরিস্তি আলোতে আসার বেশ আগে। এটা ১৯৫৬ সালের কথা, এমনকি পঞ্চাশের দশকে বৈশ্বিক ঘটনাবলিতে প্রাজ্ঞ পাঠকদের ইউএসএসআরের অত্যাচার ‘শুদ্ধীকরণ’ ও ‘ট্রায়েল’ সম্পর্কে ধারণা নেয়া।
কলকাতার বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূত্রে কেমব্রিজে প্রথমে প্রবেশ করেই অভ্যর্থনা পেলেন অমর্ত্য সেন। নবাগতদের অভ্যর্থনা জানাতে সোশ্যালিস্ট ক্লাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি ওই ক্লাবে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্লাবের কর্মীদের মাঝে অনেক স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী ছিলেন কিন্তু কলকাতা থেকে যাওয়া আত্মসচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক ‘স্নব’ অমর্ত্য সেন মার্ক্সের লেখা সম্পর্কে তাদের সীমিত জ্ঞান দেখে কিছুটা আঘাতই পেলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন ক্লাবের নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং তার প্রভাববলয়ে থাকা পূর্ব ইউরোপের প্রকৃত একনায়কতন্ত্রের সংবাদে একেবারেই নিশ্চল, নিরুদ্বেগ। যা-ই হোক, ব্রিটেন ও সারা পৃথিবীতে সাম্যবাদী উদ্বেগে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ক্লাবটির আগ্রহ ইতিবাচক একটা দিক।
পাদটীকা: সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘শুদ্ধীকরণ’ এবং ‘ট্রায়েল’ নামে প্রহসনমূলক পরিচ্ছেদে মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি হরণে একনায়কতন্ত্রের ভূমিকার বিষয় কলকাতার কফি হাউজে প্রায় আলোচিত হতো এবং অমর্ত্য নিজেকে বেশির ভাগ বন্ধুর কাছ থেকে পরিত্যক্ত ভাবতেন। একদিকে ‘ডান’, যারা ভাবত মার্ক্সের সবকিছুই গোলমেলে—একটা বড় মাপের ভুল রোগনির্ণয়। অন্যদিকে ‘সত্যিকার বাম’, যারা ভাবত রাশিয়ায় কোনো নির্যাতন ছিল না। এ দুইয়ের মধ্যবর্তী যারা, জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছার প্রতিফলন, – তাদের জায়গা পাওয়া ছিল কঠিন।
‘পৃথিবী থেকে সব অসমতা এবং অন্যায় দূরীকরণে গভীর সহানুভূতিশীল থাকা এবং একনায়কতন্ত্রের ও রাজনৈতিক ধার্মিকতার প্রতি সন্দেহ পোষণ করে আমি অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি কখনো প্রথাগত রীতি অনুসরণ দাবি করে এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারব না। আমার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অন্য রকম হতে হবে।’
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক
বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক