এক কালবৈশাখীর নিকষ অন্ধকারের রাতে আমরা। সকাল কখন হবে জানি না কেউ, কিন্তু সকাল নিশ্চয় হবে একসময়। প্রশ্ন হলো, সেই ঝড়-বিধ্বস্ত সকালের চেহারাটা কেমন হবে? অনেক রকমই হতে পারে, তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হচ্ছে দুর্ভিক্ষের। ভয় হচ্ছে অগুনতি অনাহারী মানুষের অপুষ্টি, অসুস্থতা ও মৃত্যুর।
ভয়টা অমূলক ও কল্পনাপ্রসূত নয়। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালে যেসব পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ভিক্ষে বাংলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ অনাহারে মারা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ। ’৪৩-এ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল কাশেম ফজলুল হক এবং ’৭৪-এ বঙ্গবন্ধুর একান্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যায়নি। কারণ যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হয়েছিল, তার প্রধান উপকরণ ছিল বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অবিচার এবং সেই কাঠামো থেকে আমরা এখনো বেরোতে পারিনি। উন্নয়নের অনেক চমক সত্ত্বেও বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ‘সংকটপূর্ণ’। খাদ্যসংস্থানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে এ রকম ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। ভয়টা সেখানেই।
বাংলাদেশে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা হাজার নয়, লাখ নয়, অন্তত চার থেকে পাঁচ কোটি। ভূমিহীন, বর্গাদার, নিরাপত্তাকর্মী, গৃহকর্মী, ভিক্ষুক, রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুর, ছোট মুদির দোকানদার, সিএনজিচালক, গার্মেন্ট শ্রমিক, যার মাসিক বেতনে সংসার চলে বড়জোর দুই সপ্তাহ, ফার্মগেটে যে ছোট্ট মেয়েটা ফুল বিক্রি করে ক্ষুধা মেটায়, নাটোরে যে নারী ডাস্টবিনের খাবার খেতে খেতে অচেতন হয়ে পড়েছিল এই তো ফেব্রুয়ারি মাসে—সবাইকে আপনি পাবেন এই চার-পাঁচ কোটি মানুষের মধ্যে। দুর্ভিক্ষ যখন আসে তখন এরাই মৃত্যুর মিছিলে সবার আগে, শেষেও তারা। আমরা যদি দু-দুটো বড় দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চাই তাহলে স্বল্পমেয়াদি ত্রাণ ও মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোর দুর্বলতাগুলোর দিকে গভীর মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। সেই কাজটা আমরা করছি কি?
সরকার বলছে, আমাদের খাদ্য মজুদ যথেষ্ট আছে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য বিশাল প্যাকেজ-প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ এখন স্বীকার করেন যে খাদ্য মজুদ, এমনকি উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য থাকলেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তার প্রধান কারণ ত্রাণ দুর্নীতি। ’৪৩-এ ইস্পাহানী পরিবার, ’৭৪-এ ইস্পাহানীর মতো একাধিক পরিবার, আর এখন এ রকম কাজে পারদর্শী মানুষের সংখ্যা গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গুগলে শুধু ‘চাল চুরি’ অনুসন্ধান করলে পাওয়া যাবে চাল চুরি ও চাল চোরের ১ লাখ ৯৬ হাজার সংবাদ। পুনরাবৃত্ত ও অপ্রাসঙ্গিক সংবাদগুলো বাদ দিলেও যা থাকবে, তাতে সরকারি ত্রাণ যে সত্যিকার অভাবী মানুষের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না, তার একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। দিন যত যাবে, ত্রাণ চোরের সংখ্যা ও কৌশল বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাও।
দ্বিতীয় যে কারণে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তা হলো, গরিব ও প্রান্তিক মানুষের অচলতা। এই অচলতা নানা রূপে প্রকাশ পেতে পারে। যে বর্গাদার কৃষক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাকে বা তার পরিবারের কাউকে কাজ না দেয়াও হতে পারে অজ্ঞানতা ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে। অনেকে টাকার অভাবে খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে বেশিদূর নাও যেতে পারেন। মধ্যবিত্ত ও ধনিক শ্রেণীর যারা প্রান্তিক মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, তাদের সামর্থ্যও শেষ হবে একসময়। অচলতার কারণে নিজের শ্রম বিক্রির বাজারে পৌঁছতে না পারলে এবং সামাজিক সেবার উৎস শেষ হয়ে গেলে ক্ষুধা ও অপুষ্টির কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।
তৃতীয় যে কারণে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে তা হলো, আক্ষরিক অর্থে খাদ্যের অভাব। এ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুদ থাকলেও আসছে কৃষি বছরে খাদ্যের জোগান পর্যাপ্ত হবে বলে মনে হয় না। কারণ খবর পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবচেয়ে বড় খাদ্যের উৎস বোরো ধান কাটার শ্রমিক যথেষ্ট পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ শুধু যানবাহনের অভাব নয়, বরং কৃষি শ্রমিক ও মালিক-কৃষক সবার মধ্যে করোনা সংক্রমণের ভয়ও আছে। ধান কাটার পরে পরিবহন, ধান ভাঙানো, বাজার সংযোগ—সবকিছুর সঙ্গে শ্রমিক সংস্থান প্রয়োজন, কিন্তু তা অপ্রতুল হবে এ বছর। এর মধ্যে যদি ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার ঘটনা ঘটে, তাহলে সবকিছু মিলিয়ে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে। এ রকম পরিস্থিতিতে অর্থের বিনিময়ে বিদেশ থেকেও খাদ্য আমদানি সম্ভব হবে না, কারণ সব দেশ এ ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত।
তাহলে বাংলাদেশে সম্ভাব্য এক দুর্ভিক্ষ এড়ানোর উপায় কী? দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার খোলনলচে বদলানো সম্ভব নয় এখনই, কিন্তু আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর ব্যাপক খাদ্যাভাব এড়ানো সম্ভব, যদি আমরা সামাজিক কাঠামো ধরে পদক্ষেপ নিতে পারি। প্রথমত, দেশের সবচেয়ে অরক্ষিত ও প্রান্তিক মানুষদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন। সর্বশেষ সরকারি হিসাবমতে (২০১৯), দেশের কৃষক পরিবারের এক-চতুর্থাংশ ভূমিহীন, যার সংখ্যা অন্তত ৪০ লাখ। প্রত্যেক পরিবারের লোকসংখ্যা পাঁচজন ধরলে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই কোটি। যাদের অল্প জমি আছে কিন্তু বছর চলে না, তাই অন্যের জমি চাষের ওপর নির্ভরশীল, সেই বর্গাদার পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ অর্থাৎ জনসংখ্যার হিসাবে অন্তত তিন কোটি। এই পাঁচ কোটি মানুষকে দ্রুত চিহ্নিত করা ও সুরক্ষা দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার এখনই সময়। জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তালিকা হালনাগাদ করে স্থানীয়ভাবে বহুদলীয় নেতাদের ও সামাজিকভাবে সম্মানীয়দের নিয়ে ত্রাণ বিতরণ ও অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। অতিমারী ঠেকানোর আমাদের এই প্রচেষ্টা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন না হয় তাহলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় জীবনে কালবৈশাখীর রাত আর কখনই শেষ হবে না।
বিদ্রোহী কবির সেই কালজয়ী কবিতাটি এখন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়—
দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার!
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!
তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার!!
ড. ইফতেখার ইকবাল: ইতিহাসের শিক্ষক
ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনাই দারুসসালাম, ব্রুনাই