ভারতের দিল্লিতে জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁস ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করে। এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশাসনের ব্যাখ্যা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গুজব প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ব্যাখ্যা যতটা প্রশাসনিক, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। কারণ গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, ছাত্র আন্দোলন তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট শাটডাউন রাষ্ট্রের একটি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, ইরানে ‘উইম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলন, মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রতিরোধ কিংবা ভারতের কাশ্মীর প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পথ বেছে নিয়েছে ক্ষমতাসীন পক্ষ। রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মতাদর্শ কিংবা সাংবিধানিক কাঠামো ভিন্ন হলেও এই আচরণের মধ্যে একটি গভীর সাদৃশ্য বিদ্যমান। প্রশ্ন হলো, কেন ছাত্র আন্দোলনের মুখোমুখি হলেই রাষ্ট্র ইন্টারনেটকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইন্টারনেটকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো হিসেবে দেখলে চলবে না। একবিংশ শতাব্দীর ছাত্র আন্দোলনের চরিত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর আন্দোলন যেখানে ছাত্র সংগঠন, লিফলেট, পোস্টার, মিছিল এবং মৌখিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে সমসাময়িক আন্দোলন একই সঙ্গে ভৌত ও ডিজিটাল উভয় পরিসরে সংগঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, লাইভস্ট্রিম, জিওলোকেশন এবং নাগরিক সাংবাদিকতা এখন আন্দোলনের সাংগঠনিক অবকাঠামোর অংশ। কোন স্থানে পুলিশ অবস্থান করছে, কোথায় সংঘর্ষ চলছে, কোন হাসপাতালে আহতদের নেয়া হচ্ছে কিংবা পরবর্তী কর্মসূচি কোথায়—এসব তথ্য কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, ইন্টারনেট আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সমষ্টিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অবকাঠামো।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের যোগাযোগ, প্রশাসন এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাইকেল ম্যান যাকে ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল পাওয়ার বা কাঠামোগত ক্ষমতা বলে অভিহিত করেছেন, ডিজিটাল যুগে তার অন্যতম কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। ফলে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের অর্থ কেবল তথ্য নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সমন্বয় এবং জনপরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এই কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো উপলব্ধি করেছে যে প্রতিবাদ দমন করতে চাইলে শুধু রাজপথ দখল করলেই হবে না; নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সেই ডিজিটাল অবকাঠামোকেও, যার ওপর আন্দোলনের সংগঠন, বিস্তার এবং বৈধতা নির্ভর করে।
ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা দেখায় যে সমসাময়িক রাষ্ট্র কেবল নাগরিকদের ওপর নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ কিংবা তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে না; অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি যোগাযোগের অবকাঠামোই প্রত্যাহার করে নেয়। এই প্রক্রিয়াকে অর্কেস্ট্রেটেড ডিজিটাল ডিজুলুশন নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর মূল যুক্তি হলো, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এমন একটি রাজনৈতিক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র একই সঙ্গে আন্দোলনের যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানিক সমন্বয় এবং সময়গত ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয়। ফলে আন্দোলন শুধু তথ্যপ্রবাহ হারায় না; বরং তার সাংগঠনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ছন্দ এবং সমষ্টিগত উপস্থিতিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ইন্টারনেট শাটডাউনকে তথ্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময় নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। সামাজিক আন্দোলনের শক্তি নির্ভর করে তথ্যের দ্রুত প্রবাহ, আবেগের তাৎক্ষণিক বিস্তার এবং সম্মিলিত কর্মের সমকালীনতার ওপর। একটি ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজারো মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনতে পারে; একটি বার্তা একই সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের বিস্তার ঘটাতে পারে; একটি লাইভস্ট্রিম রাষ্ট্রের সহিংসতাকে বৈশ্বিক জনপরিসরে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এই সমকালীনতা ভেঙে যায়। আন্দোলনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হয়, সমন্বয় দুর্বল হয় এবং প্রতিবাদের গতি হারিয়ে যায়। গবেষণায় এই প্রক্রিয়াকে ক্রোনোপলিটিক্যাল ডিজরাপশন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মানে হলো রাষ্ট্র রাজনৈতিক সময়কেই বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করে।
ইন্টারনেট শাটডাউনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দৃশ্যমান রাজনৈতিক কার্যক্রম বা বার্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা। আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে না; বরং সহিংসতাকে কতটা নিয়ন্ত্রিতভাবে দৃশ্যমান রাখা যায়, তার ওপরও নির্ভর করে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এই ভারসাম্যকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আজ একজন শিক্ষার্থীর স্মার্টফোনও রাষ্ট্রের সহিংসতার সাক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। লাইভ ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নাগরিক সাংবাদিকতা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জনপরিসরে নিয়ে আসে। ফলে ইন্টারনেট বন্ধ করে রাষ্ট্র কেবল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে না; বরং নিজস্ব বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সুযোগ সৃষ্টি করে। এই সময়ে বিকল্প তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সরকারি ব্যাখ্যা তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পায়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে শুধু আন্দোলনের সমন্বয় ব্যাহত হয়নি; বরং সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথিভুক্তিকরণ, আহতদের চিকিৎসা সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তথ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সংযোগ পুনঃস্থাপনের পর জমে থাকা ভিডিও, ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য দ্রুত আন্তর্জাতিক জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানায়। গবেষণায় এই ঘটনাকে রেট্রোস্পেকটিভ ভিজিবিলিটি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে সাময়িকভাবে দমন করা তথ্য পরবর্তীকালে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিলে রূপান্তরিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন ইন্টারনেট শাটডাউন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ছাত্র আন্দোলনের সময়? এর উত্তর ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিহিত। সমসাময়িক ছাত্র আন্দোলন সাধারণত বিকেন্দ্রীভূত, অনুভূমিক এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক। এখানে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের তুলনায় তথ্যপ্রবাহ, পারস্পরিক সমন্বয় এবং দ্রুত অভিযোজন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হলে আন্দোলনের সাংগঠনিক সক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণেই রাষ্ট্র সরাসরি ছাত্রদের নয়, বরং তাদের সংযুক্ত থাকার অবকাঠামোকেই আঘাত করে। এটি মূলত নেটওয়ার্ক ডিজরাপশন অ্যাজ পলিটিক্যাল কন্ট্রোল অর্থাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেই রাজনৈতিক প্রতিরোধের সক্ষমতাকে দুর্বল করা। তবে ইন্টারনেট শাটডাউন সবসময় রাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ফল দেয় না। স্বল্পমেয়াদে এটি আন্দোলনের গতি কমাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রায়ই উল্টো ফল তৈরি করে। বাংলাদেশ, ইরান এবং মিয়ানমারের অভিজ্ঞতা দেখায় যে ইন্টারনেট পুনরায় চালু হওয়ার পর বিলম্বিতভাবে প্রকাশিত ভিডিও, নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনেক সময় আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। প্রবাসী নেটওয়ার্ক, ভিপিএন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ইন্টারনেট শাটডাউন আন্দোলনকে সম্পূর্ণরূপে দমন করতে পারে না; বরং তার সময়গত বিন্যাসকে সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে।
দিল্লির সাম্প্রতিক ইন্টারনেট শাটডাউন তাই কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সমসাময়িক রাষ্ট্রক্ষমতার একটি বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন। ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা আর শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই; সেটি এখন ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপরও নির্ভরশীল। ফলে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। ছাত্র আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট শাটডাউনকে তাই কেবল নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের একটি কাঠামোগত উপাদান হিসেবে বোঝা প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্র কেবল তথ্যপ্রবাহ নয়, বরং রাজনৈতিক সময়, জনপরিসরের দৃশ্যমানতা, সমষ্টিগত কর্মের সক্ষমতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনার অবকাঠামোকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। একবিংশ শতাব্দীতে তাই ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস ক্রমশ ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসেও পরিণত হচ্ছে।
মো. আল-আমিন: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র