বিশ্বখ্যাত জরিপ সংস্থা মাইক্রোট্রেন্ডসের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় ১৯৬০ সালে ঢাকা শহরে ৫ লাখ ৪ হাজার মানুষ বসবাস করত। তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ মানুষ ঢাকায় বসবাস করত। ২০২০ সাল থেকে গড়ে ৩ শতাংশ হারে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়েছে। সে হিসাবে একই প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে ২০২৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৬ লাখ। বিশ্ব জনসংখ্যা রিভিউ অনুসারে বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। দেশের এখন ১৪ শতাংশ মানুষ ঢাকায় বসবাস করে। এভাবে জনসংখ্যার হার বাড়তে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় তিন কোটি। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের পাঁচটি বৃহৎ মহানগরের মধ্যে ঢাকা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। কিন্তু এ বিশাল জনআধিক্য ধারণ করার ক্ষমতা কি ঢাকার আছে?
১৯৫৬ সালে ঢাকা উন্নয়ন ট্রাস্ট—যা বর্তমানের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গঠিত হয়। সে সময় ঢাকা শহরের আয়তন ছিল আনুমানিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার। সেকালে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ছয় হাজার নাগরিকের বসবাস ছিল ঢাকা শহরে। একটি আধুনিক নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকায় গড়ে তোলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর, হাইকোর্ট, পার্ক, সড়ক, বিনোদন কেন্দ্র, বিপণিবিতান, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, সংসদ ভবন, শিল্পাঞ্চল এবং কিছু আবাসিক এলাকা। রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত আবাসিক প্লটগুলোর আকার ছিল কম-বেশি ১০ কাঠা। সে সময় আবাসিক প্লটগুলোয় পর্যাপ্ত জায়গা খালি রেখে সর্বোচ্চ দোতলা বাড়ি তোলা হতো। একটি ছিমছাম, সাজানো-গোছানো, যানজটমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে ঢাকা।
সেই ছিমছাম ঢাকা শহর এখন ঢাকা মহানগর। ঢাকার আয়তন বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ, কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ। এখন ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে প্রায় ৮২ হাজার মানুষ। এ বিশাল জনসংখ্যাকে কেবল আবাসন সুবিধা দিতেই নগর কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। একই জায়গার দোতলা বাড়িগুলো ভেঙে একসময় চারতলা করা হলো, এরপর ছয়তলা, এখন আরো ওপরে উঠছে। আগে যে ভূমিতে দুটি পরিবারের ১২-১৫ জন সদস্য বসবাস করতেন এখন একই ভূমিতে ২০-৪০টি পরিবারের ১০০-২০০ মানুষ বসবাস করছে। ঢাকা এখন যতবেশি আকাশের দিকে উঠছে ততবেশি বাড়ছে পানীয় জল, পয়োব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা। বর্ধিত জনসংখ্যার পানির চাপ পূরণ করতে এরই মধ্যে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এছাড়া ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
ভূমির ব্যবহার বাড়লেও সে হারে বাড়েনি সড়কের সংস্থান। ফলে দিন দিন বাড়ছে সড়কের ওপর চাপ, সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যানজটের কারণে ঢাকাবাসীর বছরে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ঢাকা এখন বিশ্বের তৃতীয় দূষিত মহানগরের স্থান দখল করে নিয়েছে। পরিবেশ রক্ষা, যানজট দূরীকরণ ও কর্মঘণ্টা বাঁচাতে সরকার ঢাকায় ছয়টি মেট্রো রেললাইন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে একটি লাইন চালু হয়েছে এবং আরো দুটি লাইনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ সব মেট্রো রেললাইন চালু হলে ঢাকা মহানগরের যানজট বহুলাংশে কমে আসবে। মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশদূষণ থেকে মুক্তি পাবে এ মহানগর।
মেট্রোরেলের সব লাইন চালু হলে ঢাকার যানজট সমস্যা দূর হয়ে যাবে বলে যে ধারণা করা হচ্ছে সেটি সঠিক নয় বলে আমি মনে করি। আমরা যেহেতু সমস্যার মূল উৎসের সমাধান উপেক্ষা করে বসে আছি এবং এখনো জোড়াতালি দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি সেজন্য ঢাকার জনসংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে, আরো ভয়াবহ হবে যানজট।
দেশের প্রশাসন, বিচার, রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, তথা গোটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নিয়ে আসা হয়েছে ঢাকাতে। ফলে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র ও জনবহুল একটি দেশে বিপুল বেকার সমস্যা থাকায় মানুষ কর্মসংস্থান এবং অধিক আয়ের আশায় ঢাকা অভিমুখী হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় বাংলাদেশের জিডিপির ৪৬ শতাংশ কেবল ঢাকা জেলা থেকে আসে। রিপোর্টে আরো বলা হয় দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ বা ৬ দশমিক ৮০ কোটি মানুষ একটি জেলাতেই কর্মরত। আরো উল্লেখযোগ্য উপাত্ত হলো এ জেলার মানুষের বার্ষিক গড় আয় ৫ হাজার ১৬৪ ডলার, যেখানে পুরো দেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। দেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে দেশের বাকি ৬৩টি জেলার জন্য এ বৈষম্যপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ঢাকা মহানগরে বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা, ব্যাটারি রিকশাওয়ালা এবং বাইকারদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে। এ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মহানগরের সামষ্টিক পরিবেশ বিপর্যস্ত করে যাচ্ছে। ফলে দুই সিটি করপোরেশনের নিবন্ধিত করদাতারা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সড়ক ও মহাসড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালারা মহানগরের রাস্তার প্রকৃত প্রশস্ততা অনেক এলাকাতেই কমিয়ে ফেলেছেন। ফলে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের স্বাভাবিক গতি অনেকাংশেই কমে এসেছে। উপরন্তু অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত বাইকার এবং ব্যাটারি রিকশাওয়ালার কারণে সড়ক ও মহাসড়কের ওপর চাপ বাড়ছে। দীর্ঘ হচ্ছে যানজট, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা। লক্ষণীয় বিষয় হলো ঢাকা মহানগরে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই ভ্রাম্যমাণ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ঈদের ছুটিতে যখন এ বৃহৎ অংশ নিজ এলাকায় ফেরত যান তখনই কেবল এ মহানগরের প্রকৃত অধিবাসীর সংখ্যা সম্পর্কে একটা আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়।
ঢাকা মহানগরী আগামী দিনগুলোয় যে পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে সেটি থেকে মুক্তি পেতে হলে অতিদ্রুত টেকসই পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। প্রথমত, প্রশাসন, বিচার এবং অন্য নাগরিকসেবাগুলো ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। ঢাকার মতো উন্নত চিকিৎসা, উচ্চতর শিক্ষা ও অন্য পরিসেবাগুলো জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিস্তৃত করতে হবে যেন ঢাকায় আসার প্রয়োজন না হয়। দ্বিতীয়ত, পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও এসএমই-ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে সহজ শর্তে ব্যাপক ঋণের প্রসার ঘটাতে হবে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিধি বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে যেন অন্তত একটি ব্যাংকের এজেন্ট থাকে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকি করতে হবে। তৃতীয়ত, ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগর থেকে সব ধরনের শিল্প-কারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে। নগরীতে কোনো কারখানা থাকলে শিল্পের আকার অনুসারে মোটা অংকের সারচার্জ আরোপ করতে হবে।
চতুর্থত, ফুটপাত ও রাস্তায় যেন কোনো ধরনের ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা বসতে না পারে এজন্য কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগ করতে হবে। নগরের প্রতিটি থানায় একজন করে উপসহকারী পরিদর্শককে এ দায়িত্ব দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যদের নিয়ে তিনি নিয়মিত টহল দেবেন। ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা এবং অনিবন্ধিত দোকান উচ্ছেদে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পঞ্চমত, ব্যাটারি রিকশার জন্য অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। রিকশাচালকদেরও লাইসেন্স থাকতে হবে। এলাকার স্থানীয় রাস্তা ব্যতীত সড়ক-মহাসড়কে কোনো প্রকার রিকশা চলতে পারবে না। সরকার অনুমোদিত ডিজাইন ও হর্স পাওয়ারের বেশি মোটর ব্যবহারকারী রিকশা-ভ্যান জব্দ করা হবে এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে চালককে ফাইনসহ লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হবে।
ষষ্ঠত, স্থানীয় এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা, অবৈধ দোকান ও অনিবন্ধিত রিকশা যেন থাকতে না পারে সেজন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর ও মেয়ররা সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেবেন। এজন্য গণসচেতনতা বাড়াতে সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নীতিমালা তৈরি করে দিতে হবে। এবং সপ্তমত ঢাকা মহানগরের সব বস্তি ও অবৈধ রিকশা গ্যারেজ উচ্ছেদ করতে হবে। মহানগরে মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য বিভিন্ন অপরাধের আস্তানা বস্তিগুলো উচ্ছেদ করা না হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা কখনই সম্ভব হবে না। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে বৃহত্তর সার্থে ঐকমত্যে আসতে হবে।
ঢাকার আয়তনকে আর বর্ধিত না করে দেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, বিচারিক ও নাগরিক সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিটি গ্রামে ও উপজেলা-জেলা শহরে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ ছড়িয়ে দিতে না পারলে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে না এবং কাজের আশায় ঢাকায় আসা জনস্রোতও কমবে না। এজন্য মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকাকে রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কখনই হবে না, বিকেন্দ্রীকরণই একমাত্র টেকসই সমাধান।
ড. শায়খ আহমদ: লেখক, গবেষক, শিক্ষক, সহকারী অধ্যাপক (অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও মুখ্য পরামর্শক, এক্সারশিয়ালস