আলোকপাত

বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতিতে পিষ্ট দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে করণীয়

বিশজুড়ে খাদ্য ঘাটতির ছায়া পড়তে শুরু করেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি একটি কারণ হচ্ছে পৃথিবী নামে আমাদের এ গ্রহের উষ্ণতা বৃদ্ধি, যা ক্রমে আমাদের কৃষিজমিগুলো ধ্বংস করছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণ সাগর অবরোধ। ফলে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর থেকে শস্য ও সার বাইরে আসতে পারছে না।

বিশজুড়ে খাদ্য ঘাটতির ছায়া পড়তে শুরু করেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি একটি কারণ হচ্ছে পৃথিবী নামে আমাদের এ গ্রহের উষ্ণতা বৃদ্ধি, যা ক্রমে আমাদের কৃষিজমিগুলো ধ্বংস করছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণ সাগর অবরোধ। ফলে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর থেকে শস্য ও সার বাইরে আসতে পারছে না।

সমস্যাটি গুরুতর আর নীতিনির্ধারকরাও এর সমাধান করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে তাত্ক্ষণিক জরুরি অবস্থার বাইরেও একটি সাধারণ সমস্যা রয়েছে, যদি আমরা বর্তমান খাদ্য সংকট কাটিয়ে উঠতে চাই তাহলে এটি বোঝা জরুরি। সমস্যাটির সূত্রপাত বর্তমানের অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের গতির সঙ্গে বৈশ্বিক নীতি ও নিয়ম বাস্তবায়নে আমাদের তাল না মেলাতে পারার ব্যর্থতা থেকে।

২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্ব এক ধরনের সংকটের আবহের মধ্যে বিরাজ করছে, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিরাজমান বিশৃঙ্খলার মধ্যে পুতিন ইউক্রেনে তার আগ্রাসন জারি রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই সংকটের ছুটে চলা রেলগাড়ি দেখে আগুন নেভাতে একের পর এক উদ্বিগ্ন নাগরিকরা ছুটে আসছেন কিন্তু আমরা যদি আগুন নেভাতে গিয়ে আমাদের যাবতীয় সম্পদ খুইয়ে ফেলি তাহলে সম্ভবত পরবর্তী উত্তাপ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো নিতে ব্যর্থ হব। বিষয়টি আমলে নিয়ে আমি তাত্ক্ষণিক উদ্বেগগুলো একপাশে রেখে বরং অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে চাই। 

এর মধ্যে কিছু কারণ খালি চোখে দৃশ্যমান, যার শুরুটা হয়েছে ইউক্রেন ঘিরে রাশিয়ার অবরোধ দিয়ে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউক্রেন বার্ষিক প্রায় ১৭ মিলিয়ন টন গম রফতানি করেছে, যা মোট বৈশ্বিক চাহিদার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে হয়তো বিষয়টি চোখে পড়ে না যে কেন এটি বড় ধরনের গম সংকটের নেতৃত্ব দেবে কিংবা বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের মতো বিপদ ডেকে আনবে, যেমনটা আজ আমরা দেখছি। যদিও বেশির ভাগ দেশে ধাক্কা সামলানোর জন্য কিছু আপত্কালীন মজুদ রয়েছে। এমন অবস্থায় উত্তরটি তাই জাতীয় ও স্থানীয় সরকার এমনকি একক ব্যক্তির আচরণগত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিহিত। বৈশ্বিক নীতি সমন্বয় যখন খুব দুর্বল হয় তখন অল্প কিছু ঘাটতি জাতীয় খবরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলো পণ্য সরবরাহ মজুদ করা। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের ওপর অমর্ত্য সেনের ধ্রুপদী গবেষণা তথ্য থেকে আমরা বিষয়টি জানি এবং এখন তা ঘটতে দেখছি।

ইউক্রেনের কাছে কোনো বিকল্প উপায় না থাকায় তারা গম রফতানি বন্ধ করেছে। পরিস্থিতি উপলব্ধিপূর্বক কিছু দেশও রফতানি বন্ধ করেছে, কেউ আবার রফতানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। ১৪ মে ভারত যেমন গম রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা দিয়েছিল। তারা একা নয়, ২৬টি দেশ গম রফতানি সীমিত করেছে, যাতে তাদের নিজস্ব জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। এসব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী গমের দাম দ্রুত বাড়ছে। শুধু ভারতে ঘোষণার পর একলাফে দাম বেড়ে যায় ৬ শতাংশ।

পারিবারিক পর্যায়েও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। একবার অভাবের আভাস দেখা দিলে লোকেরা তখন পূর্ণকালীন সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অবিলম্বেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাদ্য মজুদ করতে শুরু করে। আর তখন জাতীয় ও স্থানীয় সরকারসহ লাখো মানুষের অল্প অল্প মজুদ থেকে বর্তমানের সরবরাহ সংকটের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

শুধু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই যে এমনটা ঘটে তা নয়। করোনার টিকার ক্ষেত্রেও আমরা একই বিষয় ঘটতে দেখেছি: ভবিষ্যতের ঘাটতির সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশগুলো তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ টিকা মজুদ করে। এ-জাতীয় মজুদ কভিড-১৯ টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈশ্বিক বৈষম্য তুলে ধরে।

পরিস্থিতি অনুসারে এ ধরনের প্রতিক্রিয়াগুলো যদি অনিবার্য হয় তাহলে আমাদের এগুলোর বিপরীতে মধ্যাকর্ষণের নিয়ম অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা বিষয়গুলো এমন নয় যে এর বিপরীতে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে বাজার কিছু করতে না পারলেও ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি। বৈশ্বিক আপত্কালীন সঞ্চয়ের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি, যেমন উদ্বৃত্ত দেশগুলোকে অভাবের সময়ে অন্যদের সাহায্য করতে হবে, যা আমাদের অনেক সমস্যার সমাধানের দিকে অগ্রসর করবে।

আমানত বীমা প্রবর্তন যেমন ‘ব্যাংক রান’ (ব্যাংক রান তখন ঘটে যখন আমানতকারীদের একটা বড় দল একযোগে ব্যাংক থেকে তাদের টাকা তুলে নেয়—এ ভয়ের ভিত্তিতে যে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাবে)-এর অবসান ঘটিয়েছে, তেমনি লোকেরা যখন আশ্বস্ত হবে যে ব্যবস্থাটি কাজ করছে তখন তারা অতিরিক্ত মজুদ বন্ধ করে দেবে এবং নিজ উদ্যোগে সংকট এড়াতে সাহায্য করবে।

এ ধরনের একটি ব্যবস্থা যদি গড়ে তোলা যায় তাহলে একবার ভাবুন যে ভারতে কী হবে! এমন একটি দেশ, যাদের খাদ্য ঘাটতি ও মজুদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাছাড়া একটি জাতীয় জনখাদ্য বণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ১৯৯২ সালে বড় ধরনের অগ্রগতির সূত্র ধরে ২০১৩ সালে তা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা আইনে পরিণত হয়। তিন দশক ধরে ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চয়তার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা থাকার ফলে পারিবারিক স্তরে মজুদের মানসিকতা হ্রাস পেয়েছে, যা খাদ্য মজুদের প্রয়োজনীয়তাকেও হ্রাস করেছে।

খাদ্য সংকট প্রশমনের জন্য আপত্কালীন মজুদ ও বৈশ্বিক চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি আপাত অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু ভারতের মতো বৃহৎ একটি রাষ্ট্রের জন্য জাতীয় স্তরে ওই ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নাগালের বাইরে বলে মনে করা হয়েছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় ভূখণ্ডের একটি প্রজাতন্ত্রে মার্কিন সংবিধান অনুমোদনের বিষয়টি অসম্ভব মনে করা হয়েছিল। তাই একটি সফল বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক আপত্কালীন মজুদ ব্যবস্থা বা উদ্বৃত্ত ভাগাভাগি চুক্তির অস্তিত্ব কখনই ছিল না—এমনটা মনে করে আশা ছেড়ে দেয়া যাবে না।

কেননা উল্লিখিত যুক্তিটি খাদ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের জন্যও প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক অসুবিধার মধ্যেও বিশ্বায়নের যাত্রা জারি থাকবে। তাই আমাদের ন্যূনতম বৈশ্বিক নীতি-নিয়ম ও চুক্তি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যেন তা সবচেয়ে দুর্বলকে পিষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও