জলবায়ু পরিবর্তন

কপ২৬ ঘিরে আমরা কতটুকু আশাবাদী হতে পারি

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন (কপ২৬) ঘিরে আশা ও আশঙ্কা দুটোই বাড়ছে। আশঙ্কা বা দুশ্চিন্তার কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধ সেজে থাকা কিছু লোক আমাদের ধরিত্রীর অনেক বড় ক্ষতি করে চলেছে এবং সে সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। এদিকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে দাবানল, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো কারণগুলো। এসব পরিবেশগত ধ্বংস ও

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন (কপ২৬) ঘিরে আশা ও আশঙ্কা দুটোই বাড়ছে। আশঙ্কা বা দুশ্চিন্তার কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধ সেজে থাকা কিছু লোক আমাদের ধরিত্রীর অনেক বড় ক্ষতি করে চলেছে এবং সে সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। এদিকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে দাবানল, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো কারণগুলো। এসব পরিবেশগত ধ্বংস ও সংঘাত আমাদের বৃহৎ আকারে উদ্বাস্তু আন্দোলনের মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেমনটা বাইবেলে বর্ণনায় আমরা খুঁজে পাই।

তবে খানিকটা আশাও আছে। কারণ পরিবেশবাদী কর্মী গ্রেটা থুনবার্গের মতো কেউ কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে মানবতার চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধিপূর্বক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। আমাদের বারবার হূদয়গ্রাহী আহ্বান জানাচ্ছেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। সে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘ইউরোপীয় গ্রিন ডিল’ নামে চুক্তি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপকে কার্বননিরপেক্ষ করা।

তাছাড়া এ শতকের মাঝামাঝি শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। সম্প্রতি তারা ঘোষণা করেছে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জলবায়ু সংকট মোকাবেলার জন্য দেশটি তাদের অর্থায়ন দ্বিগুণ করবে, যার পরিমাণ বার্ষিক ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি দেশটির কয়েকজন নীতিনির্ধারক, বিশেষ করে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং সিনেটর এড মার্কে ‘গ্রিন নিউ ডিল’ নামে নতুন চুক্তির প্রস্তাব রেখেছেন, যেখানে আমেরিকার অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে কার্বন নিঃসরণ নির্মূলের একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে যাবতীয় সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সত্যিটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার বিপরীতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা অনেক বেশি সময় নষ্ট করে ফেলেছি। ডাইনোসররা যেমন বিলীন হয়ে গেছে, পৃথিবীর বুক থেকে আমরা যদি এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে না চাই তাহলে ঠিক এ মুহূর্ত থেকে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।  জলবায়ু সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই সব দেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। কিছু উন্নয়নশীল দেশে এ সংকট প্রবল। তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিশেষ করে অর্থ সংকটের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় অনেক পদক্ষেপ নিতে সমর্থ হবে না। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ কিছু উদীয়মান অর্থনীতি অনেক বেশি কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক সবুজ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যার জন্য অনেক বেশি তহবিলের প্রয়োজন পড়বে।

এ দেশগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সমর্থনের জন্য আমাদের সমন্বিতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, যেন তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে তাদের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়। ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ছিল বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য। প্রায় ২০০টি দেশ এতে তাদের সমর্থন দেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে গোটা বিশ্বই শিল্পপূর্ব সময়ের চেয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও তারা প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরের সময় এটি করতে সম্মত হয়েছিল।

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, গ্লাসগোর জলবায়ু সম্মেলন থেকে কি সত্যিকার অর্থে আমরা কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারব? থুনবার্গ সম্পতি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমরা এটা করব ওটা করব বলবেন...কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা কিছুই করবেন না।’ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বনেতাদের উদ্যোগহীনতা নিয়ে শুধু তরুণরাই হতাশাগ্রস্ত নন, রানী এলিজাবেথও একই ধরনের নিরাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা সত্যিকার অর্থে বিরক্তিকর যে তারা শুধু বলার প্রয়োজনে বলে কিন্তু কাজের সময় কিছুই করে না।’

তাদের এ ধরনের হতাশা স্বাভাবিক। কেননা আমরা যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার বিপরীতে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে না দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বনেতাদের ব্যক্ত প্রতিশ্রুতিগুলোকে ভণ্ডামি বলেই মনে হতে থাকে।

আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই তাহলে একক উদ্যোগ ও যৌথ উদ্যোগের মধ্যকার পার্থক্যগুলো কী এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়টি কেন জরুরি, তা বোঝা উচিত। ‘প্রিজনার্স ডিলেমা’র মতো মনস্তাত্ত্বিক খেলাগুলো মানুষের স্বার্থপরতার বিভিন্ন দিকগুলো তুলে ধরে। জলবায়ু সংকট মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সংকল্প ও প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর করা যতটা সমাজবিজ্ঞান আর নৈতিক দর্শনগত সংকট, ততটাই রাজনীতিবিদদের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাও।

নব্য ধ্রুপদী অর্থনীতি আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে আধুনিক অর্থনীতি ব্যক্তিমানুষের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয় না। মারিয়ানা মাঝুকাতো তার গ্রন্থ ‘মিশন ইকোনমি: আ মুনশট গাইড টু চেঞ্জিং ক্যাপিটালিজম’-এ উল্লেখ করেছেন, বাজারগুলো ‘সাংগঠনিক আচরণ, মিথস্ক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক নকশাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন নিয়ম, নীতি ও চুক্তিগুলো প্রভাবিত করে।

লোকেরা যখন বলে যে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় এড়াতে সবকিছু করতে চায় কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সমস্যা সমাধানে যৎসামান্য পদক্ষেপ পর্যন্ত গ্রহণ করে না, তখন তারা হয়তো অন্য কোনো সমস্যা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আমার সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে “গ্রেটা’স ডিলেমা” হিসেবে যে বিষয়টিকে বর্ণনা করেছি, তারা হয়তো সে ধরনের দ্বন্দ্বে পড়ে থাকতে পারে।

গ্রেটা’স ডিলেমায় আমি দেখিয়েছি একদল লোক প্রাথমিকভাবে তদের নিজস্ব স্বার্থ অনুসরণ করে। তাদের কৃতকর্মে কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সেসব নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। অথচ তারা যদি সচেতন হতো এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করত তাহলে প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেলগুলো প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে কাজ করতে সমর্থ হতো।

আমরা আজ যে জটিল আর কৌশলগতভাবে সংযুক্ত বিশ্বে বাস করি, তাতে ফলাফলগুলো ভিন্ন হতে পারে। গ্রেটা’স ডিলেমা আপাতবিরোধী ফলাফলগুলোকে চিত্রিত করে, যেখানে পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে। এটা অনেকটা এম সি এসচারের পেইন্টিংগুলোর মতো; ছোট ছোট স্বতন্ত্র পদক্ষেপের আন্তঃসংযোগ, যা গোষ্ঠীকে এমন একটি গন্তব্যে নিয়ে যায়,  যেটি তারা অনুসন্ধান করেনি।

গ্রেটা’স ডিলেমা অবশ্যই ‘দ্বন্দ্বগুলো’ বোঝার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে। কেননা বর্তমান জটিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। আর তা থেকে সবাইকে রক্ষা করতে পারে এমন নীতি প্রণয়নের জন্য আমাদের কৌশলগত ভিত্তিগুলোর দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

কথাগুলোকে হয়তো গড়পড়তা প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তির মতো লাগতে পারে। তবে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য গ্রেটা থুনবার্গসহ অনেকেই উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বৈশ্বিক নেতারাও রয়েছেন। আমরা যদি বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামো তৈরির ভিত্তি হিসেবে গ্রেটা’স ডিলেমা ধারণাটি ব্যবহার করতে পারি। এর মাধ্যমে হয়তো আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাব যে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছি না।

আবার এ চিন্তা থেকেও আমাদের আতঙ্কিত হওয়াটা স্বাভাবিক যে বিশ্বনেতারা কপ২৬ সম্মেলনকে সার্বিক অর্থে কাজে লাগাতে সমর্থ না-ও হতে পারেন। পাশাপাশি আমাদের এ বিষয়েও সচেতন হতে হবে যে এখানে হয়তো কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ে আমরা যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক খেলা খেলছি তা আমাদের বুঝতে হবে এবং এর নিয়মগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে, যাতে আমাদের ব্যক্তিগত নৈতিক উদ্দেশ্য সম্মিলিত ফলাফলগুলোয় আরো ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও