বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে তারুণ্যের অফুরন্ত শক্তিকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার অর্থাৎ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাকে উন্মোচন করার সুযোগ। অন্যদিকে রয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অমোঘ আহ্বান। মূলত এ দুটো সম্ভাবনার মেলবন্ধনের মাধ্যমে বিগত এক দশকে দেশে ‘স্টার্টআপ’ নামক ধারণার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। যাপিত জীবনের কিছু স্টার্টআপের উদাহরণ এখনই দেয়া যায়। রাইড শেয়ারিং পরিসেবা পাঠাও, এমএফএস বিকাশ কিংবা চালডালের মতো অনলাইন গ্রোসারি শপ এখন প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এমন আরো অনেক স্টার্টআপ রয়েছে যা সামনে আরো বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে।
কিন্তু স্টার্টআপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকায় এটির গোটা ইকোসিস্টেমের ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই করতে হয়। সেটি করতে গিয়ে দেখা যায়, দেশের স্টার্টআপ অবকাঠামো এখনো ‘ক্রাইসিস অব আইডেন্টিটি’ অথবা সরল ভাষার অর্থনৈতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থানের পরিচয় সংকটে ভুগছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্টার্টআপকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক উদ্যোগ অথবা প্রযুক্তিনির্ভর কোনো প্রকল্প ভাবা হয়। অর্থাৎ এটিকে ক্ষুদ্র পর্যায়ে ব্যবসা শুরু করার পদক্ষেপ হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এটি এক ধরনের উদ্ভাবনী ব্যবসায়ী মডেল। এ ধরনের উদ্ভাবনী মডেল বাস্তবিক অর্থনৈতিক সমস্যার নতুন সমাধান তৈরি করে এবং সেটাকে মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে। এজন্য সুষ্ঠু ও টেকসই স্টার্টআপ দ্রুত পরিসরে বিস্তৃত (স্কেলেবিলিটি) হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
স্টার্টআপের মূল শক্তি আইডিয়া পর্যায়ে। অনন্য একটি আইডিয়ার সঙ্গে লাগসই প্রযুক্তির সমন্বয় করার মাধ্যমে এটিকে দ্রুত গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। আর পরিকল্পনা সুষ্ঠু এবং অনন্য হলে তা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এজন্য সাধারণ কোনো দোকান কিংবা প্রথাগত সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টার্টআপ বলা যায় না। প্রচলিত ব্যবসা কাঠামোর সঙ্গে স্টার্টআপের সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। স্টার্টআপ অধিকাংশ সময় কোনো একক বা সম্মিলিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বপ্ন কিংবা আইডিয়া থেকে জন্ম নেয়। এ স্বপ্ন বা আইডিয়াকে সফল করার জন্য একটি অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি হয়ে পড়ে। এখানে সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি যেহেতু মানবিক দৃষ্টিকোণও থাকে তাই যেকোনো স্টার্টআপ টার্গেট অডিয়েন্সের সমাধানের প্লাটফর্ম হতে পারে। যে প্লাটফর্মটি বহু মানুষের সমস্যার সমাধান ধারাবাহিকভাবে দিতে পারে সেটিই প্রকৃত অর্থে দৃষ্টান্তমূলক স্টার্টআপের মর্যাদা পায়।
বিশ্বের সফল স্টার্ট আপ স্টার্টআপগুলোর যাত্রাক্রম দেখলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরি কক্ষে মার্ক জাকারবার্গ ও তার কয়েকজন সহপাঠী মিলে প্রথম ‘ফেস মেশ’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। এটি ছিল মূলত কয়েকজনের সাহসী ও বিতর্কিত ‘ব্যক্তি উদ্যোগ’। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ উদ্যোগের আগ্রহ ও স্বপ্ন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক) রূপ নিয়েছে। এখন ফেসবুক একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। আবার ১৯৯৪ সালে জেফ বেজোস ওয়াশিংটনের বেলেভিউতে তার বাড়ির গ্যারেজে একটি অনলাইন বুকস্টোর প্রতিষ্ঠা করেন। এজন্য ওয়েবসাইট চালু করার ৩০ দিনের মধ্যে কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই অ্যামাজন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ৪৫টি দেশে বই বিক্রি করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে ‘অ্যামাজন’ ক্লাউড কম্পিউটিং (এডব্লিউএস), এআই (এলেক্সা) এবং স্ট্রিমিং সেবাসহ বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স প্লাটফর্ম। ১৯৯৭ সালে রিড হেস্টিংস এবং মার্ক র্যান্ডলফ নেটফ্লিক্স প্রতিষ্ঠা করেন। মজার ব্যাপার হলো, হেস্টিংস একটি মুভি রেন্টাল শপে সিডি ফেরত দিতে দেরি করায় ৪০ ডলার জরিমানা গুনেছিলেন, যা তাকে এ ব্যবসার আইডিয়া দেয়। ডিভিডি ভাড়া দেয়ার সাধারণ ধারণা থেকে পথচলা শুরু করা 'নেটফ্লিক্স' আজ বিশ্ব বিনোদন শিল্পের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে।
এমন বহু উদাহরণ দেয়া যাবে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, স্টার্টআপের মূল শক্তি অঢেল পুঁজি বা বিনিয়োগে নয়। বরং নতুনভাবে চিন্তা করার সাহস নিয়ে বাস্তবিক অর্থে সমস্যার সমাধান দেয়ার সক্ষমতা রাখার মতো মানসিকতা রেখে নিজ উদ্যোগটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখানে জরুরি। বাংলাদেশে বিপুল জনসম্পদ রয়েছে। বহু মানুষের মধ্যে ধারণার অভাব আছে এমনটি বলা যাবে না। এজন্য এ মুহূর্তে দেশে ব্যক্তি উদ্যোক্তা বাড়ছে। কিন্তু নতুন বছরে আমাদের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কেবল কি উদ্যোক্তার সংখ্যাই বেড়ে চলেছে? নাকি সত্যিকার অর্থে টেকসই উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক সমাধান আসছে?
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ম্যাপ স্টার্টআপব্লিঙ্কের চলতি মাসের হালনাগাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ৬৪৫টি প্রধান স্টার্টআপকে নিয়মিত ট্র্যাক করছে। তবে তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় ও তালিকাভুক্ত স্টার্টআপের সংখ্যা ৭০০-৮৫০-এরও বেশি। স্টার্টআপের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ এবং ২০২৫-২৬ সালের ‘গ্লোবাল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ইনডেক্স’ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম। এ পরিসংখ্যানগুলো আশাব্যঞ্জক হলেও মালিকানার ক্ষেত্রে এখনো নারী-পুরুষ ব্যবধান প্রকট। স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ইউএনডিপির ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলধারার প্রযুক্তিভিত্তিক বা ইনভেস্টমেন্ট-নির্ভর স্টার্টআপগুলোতে পুরুষের হার এখনো ৮৫-৯০ শতাংশ এবং নারীদের হার ১০-১৫ শতাংশ। তবে ফেসবুকভিত্তিক বা ক্ষুদ্র ই-কমার্স ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে এ খাতে নারীর হার প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে কসমেটিকস, পোশাক এবং ঘরোয়া খাবার (ক্যাটারিং) শিল্পে নারী উদ্যোক্তাই বেশি।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজারে। ১৮ কোটির বেশি মানুষের এ দেশে ডিজিটাল সেবার চাহিদা অকল্পনীয়। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভিশনের অধীনে যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তা স্টার্টআপগুলোর জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছে। ইন্টারনেট পেনিট্রেশন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) জয়জয়কার এখন প্রান্তিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। মেধাবী তরুণরা এখন আর কেবল বিসিএস বা বহুজাতিক কোম্পানির চাকরির মোহে আবদ্ধ নয়; তারা সমাধান খুঁজছে এগ্রিটেক, হেলথটেক এবং এডুটেক খাতে।
তবে অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও পথচলা মসৃণ নয়। বাংলাদেশে স্টার্টআপের সাফল্যের হার বিশ্ববাজারের মতোই চ্যালেঞ্জিং। দেশের স্টার্টআপের তথ্যের নির্ভরযোগ্য সূত্র লাইটক্যাসলস পার্টনার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ১০-২০ শতাংশ স্টার্টআপ দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পায়। আর বাকি ৮০-৯০ শতাংশ উদ্যোগই প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যর্থতার মুখ দেখে। এ ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ ‘তহবিল সংকট’। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এখনো স্টার্টআপের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতের চেয়ে জমি বা গতানুগতিক শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পাশাপাশি নীতিমালার জটিলতা, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং এআই (এআই) বা ডেটা সায়েন্সের মতো উচ্চতর প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের অভাবও প্রকট। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘এক্সিট’ পলিসি। দেশের পুঁজিবাজার এখনো এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। যদিও আশার কথা হলো, দেশের পুঁজিবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশেরই বয়স ৪৫ বছরের নিচে। এ তরুণ অংশগ্রহণ বাজার সংস্কারের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ বাস্তবতায় স্টার্টআপকে কেবল সাময়িক ‘হুজুগ’ হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টার্টআপে বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দিতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। স্টার্টআপ মানেই স্রেফ একটি মোবাইল অ্যাপ নয়। এটি একটি বৃহৎ ধারণা, যা সমাজের গভীর কোনো সংকট নিরসন করে। এ উদ্যোগগুলো যদি গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্পর্শ করতে পারে, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। পরিশেষে, স্টার্টআপদের টিকে থাকার লড়াইয়ে রাষ্ট্রকে ‘প্যাসিভ’ দর্শক না হয়ে ‘অ্যাক্টিভ’ অংশীদার হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সিলিকন ভ্যালি একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদেরও সময় লাগবে; তবে সেই সময় যেন কেবল অপেক্ষার না হয়ে প্রস্তুতির হয়—সেই লক্ষ্যেই আমাদের এগোতে হবে।
এমএম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক