মুক্তবাজার অর্থনীতির সুন্দরতম সৃষ্টি পুঁজিবাজার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা ও বিচারহীনতা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে ভীষণভাবে সংকুচিত ও পঙ্গু করে রেখেছে। দেশে যখন একজন গৃহপরিচারক ৪০০ কোটি টাকা ও একজন গাড়িচালক ১ হাজার কোটি টাকার মালিক হন তখন সাধারণ মানুষ রাতারাতি বড়লোক হওয়ার একটি স্বপ্ন নিয়ে পুঁজিবাজারে আসে। ফলে তারা নিশ্চিতভাবেই প্রতারণার শিকার হয়। অতীতে দেখেছি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি না দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সহযোগী হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাই দুষ্কৃতকারী হয়ে গেছে। ফলে এ বাজার থেকে যারা পুঁজি সংগ্রহ করবেন বা জোগান দেবেন তারা এ বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। এ কারণে অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের যে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেটা রাখতে পারেনি। এ মুহূর্তে দেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে। অথচ সে অনুপাত পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানে প্রায় ১০ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১৫, ভিয়েতনামে ৪১, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৪, থাইল্যান্ডে ৯১ ও ভারতে ১২০ শতাংশ।
আশার কথা হচ্ছে, এ মুহূর্তে একটি পরিবর্তনের সুবাতাস পাচ্ছি এবং একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন কমিশন গঠন হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বোর্ড পুনর্গঠন হয়েছে। পুঁজিবাজার সংস্কারের সুপারিশের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিগত সময়ের অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য একটি ‘অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এ বাজারের বর্তমান দুর্দশা থেকে খুব দ্রুত বের হয়ে আসতে পারব বলে আশাবাদী।
পুঁজিবাজারের যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে সেগুলোর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা তৈরি করাই এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রদানের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ ও নিশ্চিত করা এবং সেই সংস্কৃতি তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও বাজার নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।
বাজার উন্নয়নের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রক্রিয়া ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত। পুঁজিবাজারে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা ও দর ব্যবস্থায় (প্রাইস মেকানিজম) অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো থেকে সরে আসতে হবে। একই সঙ্গে ভালো কোম্পানি বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে কী ধরনের নীতিসহায়তা দেয়া যায় সে বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে। তবে জোর করে বা বাধ্যতামূলক কাজ করানোর নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অন্যদিকে বন্ড মার্কেটেও প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা আছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের একটি অংশকে কীভাবে বন্ড মার্কেটে বা বন্ডে রূপান্তর করা যায় সে বিষয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতকে অনুসরণ করে এ বিষয়ে আমরা কাজ করতে পারি।
দেশের মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর একটি লিগ্যাসি ইস্যু রয়ে গেছে। ২০১০-পরবর্তী সময়ে তাদের ট্রিগার সেল না করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন থেকে তাদের নেগেটিভ ইকুইটিভিত্তিক মার্জিন লোন ও পোর্টফোলিও রয়েছে। এখন ব্যাংক খাতের মতোই এ খাতকে সরকারি সহায়তায় কিছু সুবিধা দিতে হবে।
দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতও কাজ করছে না। আমাদের ক্লোজড এন্ডের যে ফান্ডগুলো আছে সে ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। আমাদের এখানে মিউচুয়াল ফান্ডের ক্লোজার ডেট এক্সটেনশন করা যায়, যা পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে বলে মনে হয় না। সে ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে ফান্ডের কাঠামো কেমন হবে সে বিষয়ে কাজ করতে ফান্ড ম্যানেজারদের কিছুটা স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারীদের আমরা আকৃষ্ট করতে পারি।
অতীতে নীতিগত রূপরেখার একটি বড় সমস্যা প্রত্যক্ষ করেছি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারের দৈনন্দিন কার্যক্রম বা বাজার উন্নয়নে অযাচিতভাবে জড়িত হয়ে পড়ছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিতর্কিত হচ্ছে এবং সংস্কার উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছে না। তাদের সম্মানহানি ঘটছে। তাই বাজার ব্যবস্থায় বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ভূমিকা কী হবে তা নির্ধারণের সময় এসেছে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে।
এ মুহূর্তে পুঁজিবাজার একটি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। তাই স্বল্পমেয়াদে বাজারের আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সেজন্য কিছু নীতিসহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, অতীতে তোষণমূলক চর্চা দেখেছি। বিনিয়োগকারীদের একাংশের অযৌক্তিক দাবিদাওয়া এবং সেসবের প্রতি বাজারের মৌলভিত্তির বাইরে এসে অ্যাডহক ভিত্তিতে কার্যক্রমে যাওয়া থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিরত থাকতে হবে এবং এ ধরনের ঘোষণা দিতে হবে। তা না হলে যেসব বিদেশী বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তাদের ফেরানো কঠিন হবে।
আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এবং বাজারের কিছু প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি আলোচনা করা দরকার। যেখানে অর্থনীতিতে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা কী হবে এবং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কীভাবে কাজ করা যায় সেগুলো এ মুহূর্তে নির্ধারণ করতে হবে।
বর্তমান বাজারের অবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ বেশ কঠিন। কিন্তু হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পরিবর্তনের বাতাস বইতে শুরু করেছে। আমরা নিশ্চিতভাবেই একটি নতুন গল্প তৈরি করতে পারব, যেখানে একটি দক্ষ ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার সামনে পাব।
মমিনুল ইসলাম: চেয়ারম্যান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি
[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]