মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের ‘টিম অব রাইভালস’

করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতের ফলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই টালমাটাল। মালয়েশিয়াও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে। জাতির এ ক্রান্তিকালে ‘টিম অব রাইভালস’ মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে আপস ও ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির নতিজা স্থাপন করেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে এশিয়ার সিংহ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ফের হুংকার দিক দেশটি। মালয়েশিয়ার ঘুরে দাঁড়ানো এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; আর দেশটির কাণ্ডারি হিসেবে এ মুহূর্তে আনোয়ার ইব্রাহিমের ভালো বিকল্প নেই।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও রাজার হস্তক্ষেপে প্রত্যাশিত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হলেন আনোয়ার ইব্রাহিম। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মালয়েশিয়াকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা এটা হচ্ছে দেখার বিষয়। শুরুতেই জাতীয় ঐক্যে ফোকাস দিয়ে অর্ধডজন দলের সরকার গঠন করেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে আহমদ জাহিদ হামিদি ও ফাদিল্লাই ইউসুফের নিয়োগ হচ্ছে এ সরকারের বড় চমক। দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করে আব্রাহাম লিংকনের ‘টিম অব রাইভালস’ কেবিনেটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম।

ডরিস কেয়ানর্স গুডউইন তার টিম অব রাইভালস বইয়ে তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে গড়া আব্রাহাম লিংকনের মন্ত্রিসভার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ক্রান্তিকালে লিংকনের মন্ত্রিসভা সংকটে থাকা যেকোনো দেশের জন্য উদাহরণ হিসেবে হাজির হতে পারে। ১৮৬০ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে লিংকনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নিউইয়র্কের সিনেটর উইলিয়াম এইচ সেওয়ার্ড, ওহাইওর গভর্নর স্যালমন পি চেজ এবং মিসৌরির প্রখ্যাত আইনপ্রণেতা এডওয়ার্ড বেটস। ঝানু এসব রিপাবলিকান স্টলওয়াটের বিপরীতে লিংকন ছিলেন তুলনামূলক অনভিজ্ঞ প্রার্থী। প্রতিনিধি পরিষদে এক মেয়াদে ইলিনয়েসের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিজ দলের তিন কঠিন প্রতিপক্ষকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার সিদ্ধান্তে হতবাক ছিল পর্যবেক্ষকরা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেওয়ার্ডকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, চেজকে অর্থমন্ত্রী ও বেটসকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেন। অন্য তিন শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয় তিন সাবেক ডেমোক্র্যাটকে। গিডেয়ন ওয়েলেসকে নিয়োগ দেয়া হয় নৌমন্ত্রী হিসেবে, যাকে মজা করে ‘নেপচুন’ বলে ডাকতেন লিংকন। মন্টোগোমারি ব্লেয়ার হন পোস্টমাস্টার জেনারেল। এডউইন এম স্ট্যান্টন হন লিংকনের যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, যাকে ‘মার্স’ বলে ডাকতেন লিংকন। মন্ত্রিসভার প্রত্যেকেই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও সুপরিচিত। নিজ নিজ ক্ষেত্রে সমকালের সেরা ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার মাধ্যমে চমক দেখিয়েছেন লিংকন। ষোড়শ মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রায় ১৬০ বছর পর মালয়েশিয়ায় একই পথ অনুসরণ করলেন আনোয়ার ইব্রাহিম।

তিন দশক ধরে মালয়েশিয়ার রাজনীতির ট্র্যাজিক হিরোর ভাবমূর্তি ছিল আনোয়ার ইব্রাহিমের। এবার কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব পেয়ে তিনি কি পারবেন কঠিন সময়ে দেশকে সামলাতে। মালয়েশিয়ার দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ার বলেন, তার সরকারের মূল ফোকাস থাকবে অর্থনীতি এবং তা পুনরুজ্জীবিত করতে সম্ভব সব পদক্ষেপই নেবেন। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এরই মধ্যে নাভিশ্বাস উঠে গেছে সাধারণ মানুষের। বিষয়টিতে তিনি যে গুরুত্ব দিচ্ছেন তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে তার নেয়া পদক্ষেপে।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন আনোয়ার। এর মাধ্যমে তাদেরকে নগদ অর্থসহায়তা দেয়া হবে। যাতে জীবনমানের ব্যয় কমে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা দেখা দেয়। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মালয়েশিয়ার নয়া প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, সব নাগরিককেই ভর্তুকি দেয়া হবে। আগে থেকেই জ্বালানি তেল ও রান্নার তেলে ভর্তুকি দেয় মালয়েশিয়া সরকার। বিদ্যুৎ, চিনি ও ময়দায়ও ভর্তুকি দেয়া হয়। আনোয়ার ইব্রাহিম এতে সংস্কার আনতে চান। তিনি গতকাল বলেন, ভর্তুকি হতে হবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অন্যথায় নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি ধনীরাও এ সুবিধা ঘরে নেবে।

যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগে ভর্তুকি পায়নি তাদেরকে নতুন বিবেচনায় আনা হবে বলে জানান আনোয়ার ইব্রাহিম। এক বছরে মালয়েশিয়া সরকার ভর্তুকির পেছনে ৭ হাজার ৭৭০ কোটি রিঙ্গিত বা ১ হাজার ৭৪০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে।

নেমেসিস মাহাথির মোহাম্মদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা না নিতে চাইলে প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর দিকে তাকাতে পারেন আনোয়ার। টানা দুই মেয়াদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতি সামলাচ্ছেন এ রাষ্ট্রনায়ক। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে দেশের শিল্পভিত্তি বাড়ানো, স্টার্টআপ হাব হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা, পাম অয়েল থেকে শুরু করে বিভিন্ন খনিজ সম্পদ রফতানির মাধ্যমে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন উইডোডো। এছাড়া জনবহুল জাকার্তা ছেড়ে নতুন রাজধানী গড়ার উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ; দুর্নীতি। ব্যক্তিগতভাবে উইডোডো বা আশপাশের লোকজন নিয়ে তেমন দুর্নীতির আলাপ শোনা যায় না। তার শাসনকালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। আশি ও নব্বই দশকে মালয়েশিয়া যেভাবে অর্থনৈতিক শক্তি ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা তাতে মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। চলতি শতকের শুরুতে মাহাথির মোহাম্মদের বিদায়ের পর প্রায় অর্ধডজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে মালয়েশিয়া। কিন্তু তারা কেউই না পেরেছেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে, না পেরেছেন অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে। আনোয়ার ইব্রাহিম কি পূর্বসূরিদের মতো ব্যর্থ হবেন নাকি সফলতার গল্প লিখবেন তা দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সমুদ্র পাড়ের প্রতিবেশী যে বিভিন্ন দিক থেকে মালয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে ইন্দোনেশিয়া গমনের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যৌথ উদ্যোগের পাশাপাশি বাণিজ্য সম্পর্ক সুদৃঢ় করা হবে আনোয়ারের ইন্দোনেশিয়া সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নুসানতারা নামে ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাজধানী নির্মাণযজ্ঞে কাজ করতে আগ্রহী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ইন্দোনেশিয়া সফরে আনোয়ার জানান, নুসানতারা ক্যাপিটাল সিটি অথরিটির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী অন্তত ১০টি মালয়েশীয় কোম্পানি। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে রাজধানী জাকার্তা থেকে সরানোর কার্যক্রম শুরু করে ইন্দোনেশিয়া। ঘনবসতি, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের কারণে জাকার্তা থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে নুসানতারা নামে নতুন রাজধানী নির্মাণযজ্ঞ চলছে। মালয়েশিয়ার সাবাহ ও সারাওয়াক রাজ্যের নিকটবর্তী হওয়ায় নতুন রাজধানী অঞ্চলটির অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভা গঠনের দিক থেকে জাতীয় ঐক্যের দিকে জোর দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। সুশাসন, জনগণের ভার কমানো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তার সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন তিনি। ব্যয় সাশ্রয়ী নীতির অংশ হিসেবে মন্ত্রিসভার বহর ছোট রাখছেন আনোয়ার। ২৮ মন্ত্রী ও ২৭ উপমন্ত্রী নিয়ে তার কেবিনেট। ইসমাইল সাবরি ইয়াকুবের কেবিনেট ছিল ৩১ মন্ত্রী ও ৩৮ উপমন্ত্রীর। অন্যদিকে মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের মন্ত্রিসভা ছিল ৩২ মন্ত্রী ও ৩৮ উপমন্ত্রীর। সংক্ষিপ্ত পরিসরের মন্ত্রিসভার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের দিকেও চোখ রয়েছে আনোয়ার ইব্রাহিমের। গত ৫ ডিসেম্বর এক ঘোষণায় তিনি জানান, জনগণের কষ্ট আমলে নিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের বেতন ২০ শতাংশ কর্তন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ও সামলাবেন আনোয়ার ইব্রাহিম। অতীতেও একাধিক দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গত শতকের নব্বই দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন আনোয়ার। মালয়েশিয়ার জন্য এ সময়টা ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও আশাবাদের। তখন চার এশিয়ান টাইগারের একটিতে পরিণত হয়েছিল মালয়েশিয়া। কিছু বয়সী মালয়েশীয় ওই সময়কে দেশের ইতিহাসে সোনালি সময় হিসেবে বিবেচনা করে।

করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতের ফলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই টালমাটাল। মালয়েশিয়াও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে। জাতির এ ক্রান্তিকালে ‘টিম অব রাইভালস’ মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে আপস ও ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির নতিজা স্থাপন করেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে এশিয়ার সিংহ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ফের হুংকার দিক দেশটি। মালয়েশিয়ার ঘুরে দাঁড়ানো এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; আর দেশটির কাণ্ডারি হিসেবে এ মুহূর্তে আনোয়ার ইব্রাহিমের ভালো বিকল্প নেই।

আরও