দেড় বছর পর গতি ফিরছে জাপানি অর্থায়নের মেগা প্রকল্পগুলোয়

নির্ধারিত সময়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সংস্কৃতি চালু করতে হবে

দীর্ঘ দেড় বছরের স্থবিরতার পর আবারো গতি ফিরে পেতে শুরু করেছে জাপানি অর্থায়নে দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প।

খবরটি আশাব্যঞ্জক হলেও একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে। এ স্থবিরতায় দেশের ক্ষতি কতটুকু এবং ভবিষ্যতে এটি এড়ানোর উপায় কী? দেশে মেগা প্রকল্প মানেই ‘দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে বিলম্ব, অনুমিত অপেক্ষা কম সুবিধা’। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার। ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদার মন্তব্যটি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন যে এ বিলম্ব বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করেছে। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের এমন সরাসরি মন্তব্যকে কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা না ভেবে জাতির জন্য গভীর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষত মেগা প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সরকারকে এখন থেকে উদ্ভাবন ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের গতি যেন কেবল ঘোষণায় না থেকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপান্তরিত হয়, সেটা নিশ্চিত করা এখন সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এমনকি সময়ের পেছনে থাকা অন্য প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও অভিন্ন নীতিগত অবস্থান রাখতে হবে।

যেকোনো প্রকল্প নির্বাচনের নীতি অভিন্ন থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় অপেক্ষা প্রাপ্ত সুবিধা বেশি হতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক সম্পদ বাড়ানো। তাই প্রকল্পের অপেক্ষা ব্যয় বেশি হলে সামাজিক ও ব্যক্তি সম্পদ কমে আর অপেক্ষা ব্যয় কম হলে সম্পদ বাড়ে। অথচ এ বাস্তবতা এখনো নীতিনির্ধারকরা অনুধাবন করতে পারেননি বলে সময়ের অনেক পেছনে রয়েছে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো ও থার্ড টার্মিনালের বিদ্যমান দরপত্র প্রক্রিয়া ও চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই সময় এটি প্রয়োজনীয় হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হয়ে ওঠে। এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ঠিকাদারদের সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব প্রকল্পের মূল প্রাক্কলনকে প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়। ২০১৯ সালে একনেকে যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ও ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকায় অনুমোদিত এ প্রকল্পের ব্যয় ঠিকাদারের দরপত্রে প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকে। এদিকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এক বছরের বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও আটকে যায় অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায়। জাপানি কনসোর্টিয়ামকে অপারেটর হিসেবে চূড়ান্ত করা হলেও রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। একটি প্রস্তুত টার্মিনাল বিমান না ওড়ানোর মতো বসে থাকা—এটি কেবল বিলম্ব নয়, এটি সক্রিয় অর্থনৈতিক ক্ষতি।

একই অবস্থা অন্য মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা যায়। ২০১০ সালে অনুমোদিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প, কয়েক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আংশিক চালু হয় ২০২৩ সালে। পূর্ণাঙ্গ কাজ এখনো শেষ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে অনুমোদিত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি ২০২২-২৩ সালে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু চীনা ঋণ ছাড় পেতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের কাজ অনেকদিন ঝুলে থাকে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এটির কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬৮ শতাংশ। আবার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও ২০২২-২৩ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনের কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। এ বছরও এটির বড় একটি অংশের কাজ চলমান থাকবে।

দেশের ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের প্রতিটি মুহূর্তে বৃহৎ প্রকল্পগুলো একটি ‘সিদ্ধান্তের শূন্যতা’র শিকার হয়। ফলে মাসের পর মাস কাজ থেমে থাকে। জটিল মেগা প্রকল্পে বহুপক্ষীয় অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় রক্ষা করার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা দরকার, তার ঘাটতি স্পষ্ট। একটি চুক্তির ছোট ধারা নিয়ে মাসের পর মাস আলোচনা চলার অর্থ হলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও কাঠামো এখনো পরিপক্ব হয়নি।

প্রকল্প যত বিলম্বিত হয় বাড়তি ব্যয়ের ভার বহন করে সাধারণ করদাতা। অথচ এ ব্যয় বৃদ্ধির জন্য কেউ দায়ী হন না, কেউ শাস্তি পান না। এ সংস্কৃতি বদলাতে হবে। নতুন সরকারের কাছে এ সংস্কৃতি চালুর সুযোগ রয়েছে। সেজন্য মেগা প্রকল্প নির্বাচন, কার্যকারিতা প্রাক্কলন ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব পর্যায়ে কার্যকর জবাবদিহি ও স্পষ্ট ব্যাখ্যার অনুশীলন বাড়াতে হবে। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করতে হবে, যারা ৩০ দিনের মধ্যে যেকোনো বড় সংকটের সমাধান দিতে সক্ষম হবে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার বাঁধা অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন প্রায়ই কম দেখানো হয়। ফলে পরে দরপত্রে প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি আসে এবং পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়। বাজার গবেষণার ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা পরিচালনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শুধু প্রশাসনিক ভূমিকা নয়, অগ্রগতির ব্যর্থতার জন্য ব্যক্তিগত দায়িত্ব বহন করবেন, এমন নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ না হলে কারণ দর্শাতে হবে। এজন্য সংসদীয় কমিটি বা বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তিতে সময়মতো কাজ শেষ না হলে জরিমানার স্পষ্ট বিধান থাকতে হবে এবং তা প্রয়োগ করতে হবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ছাড়া মেগা প্রকল্পের বিলম্বের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ দেয়া, বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা এবং ‘প্রকল্প ম্যানেজমেন্ট অফিস (পিএমও)’ কাঠামো প্রবর্তন করা যেতে পারে।

মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতির তথ্য অনলাইনে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এমনকি কোনো কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তাও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনা প্রতিবেদন কেবল নথিতে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ যেন না থামে, তা নিশ্চিত করতে একটি ‘জাতীয় অবকাঠামো ধারাবাহিকতা নীতি’ প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রকল্পগুলোকে রাজনৈতিক দলীয় প্রকল্প হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার পরিবর্তনের পরও প্রকল্পের চলমান চুক্তি ও দরপত্র প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল ঋণ চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মিত যোগাযোগ ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি গড়তে হবে। অংশীদারদের প্রকল্পের আসল পরিস্থিতি জানানো, সমস্যার দ্রুত সমাধান চাওয়া এবং সম্মিলিতভাবে সংকট উত্তরণে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তাহলে আস্থার সংকট অনেকটা কাটানো যাবে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ছাড়া বড় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সরকারকে বুঝতে হবে, মেগা প্রকল্পের কাজ আংশিক চালু করলে জাতীয় জীবন ও অর্থনীতির উপকার হয় না। উপকার তখনই হয় যখন সেবাটি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা যায়।

আরও