২৭ এপ্রিল (২০২০) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠব। দুর্যোগ আসবে সেটি আবার চলে যাবে। আবার আলো আসবে।’ করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় তার এই প্রত্যয়ী বাক্য আমাদের আশান্বিত করে তুলেছে। অবশ্য প্রথম থেকেই তিনি ছোঁয়াচে ব্যাধির সংক্রমণ রোধে আশাবাদী। আর সৎ ও নিষ্ঠাবান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি সব শ্রেণির মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য সচেষ্ট।এজন্য ১৪ মে করোনাকবলিত বাংলাদেশে তিনি ৫০ লাখ হতদরিদ্র ও কর্মহীন পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন। মে-জুন এই দুই মাস ৫০ লাখ পরিবার পাঁচ হাজার করে টাকা পাবে। বিকাশ, নগদ, রকেট ও শিওরক্যাশের মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে টাকা পৌঁছে যাবে। এই সুবিধাভোগীদের তালিকায় আছে, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোল্ট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকসহ পরিবহন শ্রমিক, হকারসহ নানা পেশার মানুষ। সরকারি এই প্রচেষ্টা ২৫ মার্চে জাতির উদ্দেশে প্রচারিত ভাষণেই শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছিলেন। পরে নিজের দলের নেতাকর্মীদের ত্রাণ বিতরণের নির্দেশনাও দেন তিনি। ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম এবং ফটোসেশনের মতো হাস্যকর কর্মকাণ্ডও পরিহার করার জন্য নির্দেশ দেন তিনি।
২.
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে কাজ করতেন। তখনকার ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁকে সে সময়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একটা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে মানুষের পাশে থাকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে। চিঠিটি নিম্নরূপ, ‘বন্ধুবরেষু গুণ, আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ‘ত্রাণ বিতরণ করছি’ এ ধরনের কোনো ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না। ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্য দানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজরক্ষার তাগিদে, সঙ্গীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেওয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? এই ‘ক্রেডিট’ নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দিবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না। আমি মনে করি, যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত। ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াতে সেটাই গর্ব করার মতো হতো। যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখেছিলেন, সেদিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে। আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন। শুভেচ্ছান্তে, শেখ হাসিনা, ৯. ১০. ৮৮’।
স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ এই ৭ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছের মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ ১৯৮১ সালের ১৭ মে তার দেশে ফেরা ছিল অতি সাধারণ, কারণ সেভাবেই তিনি দেশের জনগণের সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। সেদিন তিনি এক বৃহৎ শূন্যতার মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এদেশে তার ঘর নেই; ঘরের আপনজনও কেউ নেই। তাই সারা দেশের মানুষ তার আপন হয়ে উঠল। তিনি ফিরে আসার আগে ছয় বছর স্বৈর-শাসকরা বোঝাতে চেয়েছিল তারাই জনগণের মুক্তিদাতা। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছিল, বিচার দাবি করছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের। সেনা শাসকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকায় জনগণের শাসনের দাবি নিয়ে রাজনীতির মাঠে রাতদিনের এক অক্লান্ত কর্মী হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি নেতা কিন্তু তারও বেশি তিনি কর্মী। কারণ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, বঙ্গবন্ধু ও তার শাসনকাল সম্পর্কে অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা তার প্রাত্যহিক কর্মে পরিণত হলো। দেশে ফেরার প্রতিক্রিয়ায় আবেগসিক্ত বর্ণনা আছে তার নিজের লেখা গ্রন্থগুলোতে। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, শেখ হাসিনা যখনই বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রেখেছিলেন তখনই বুঝে নিয়েছিলেন ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু পথ।’ তার ‘পথে পথে গ্রেনেড ছড়ানো’। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৭ মে) আগে ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে তার সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চের সামরিক শাসন জারির দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসে একমাত্র শেখ হাসিনাই সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানবো না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবোই করবো।’ তাই তো কবি ত্রিদিব দস্তিদার শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’।তার অর্জনগুলো এই ২০২০ সালের মহামারি দুর্যোগে আরো বেশি স্পষ্ট।
৩.
করোনা-মহামারিতে সংকটাপন্ন খেটেখাওয়া মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য সুচিন্তিত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার। যাতে কোনও মানুষই মৃত্যুবরণ না করেন, আর যাতে তারা আক্রান্ত না হন, সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে কাজ করছেন।আর এজন্য আমেরিকার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ফোর্বসে’ ২২ এপ্রিল (২০২০) প্রকাশিত কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবারগ-কক্স রচিত “8 (More) Women Leaders Facing The Coronavirus Crisis” শীর্ষক প্রবন্ধে করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়েছে। নারী নেতৃত্বাধীন সিঙ্গাপুর, হংকং, জর্জিয়া, নামিবিয়া, নেপাল, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের ওপর আলোকপাত করার সময় বলা হয়, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ১৬ কোটি ১০ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশের মহামারির সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে ‘প্রশংসনীয়’ বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। কলামে বলা হয়েছে, এদেশের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনি গত ফেব্রুয়ারি থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন সেগুলো এক অর্থে যুক্তরাজ্যও করতে পারেনি। তবে একথা সত্য, বিশ্ব মিডিয়ায় প্রশংসা পাবার জন্য শেখ হাসিনা কাজ করেন না। তার দিনপঞ্জি জুড়ে আছে করোনা মোকাবেলার জন্য ব্যস্ত সময়ের কর্মকাণ্ড।
১৪ মের আগে ৪ মে (২০২০) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে। আমি জানি এটার প্রভাব পড়বে আগামীতেও। আন্তর্জাতিক সংস্থা এই পরিস্থিতিকে মহামারি ঘোষণা দিয়েছে।’ জাতি যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পেতে শুরু করেছিল তখনই হঠাৎ করে আঘাত এসেছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয় সারাবিশ্বে যেহেতু এর প্রভাব, স্বাভাবিকভাবেই এই অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। করোনা চলা অবস্থায় দেশের অর্থনীতির চাকা যেন গতিশীল ও সুরক্ষিত থাকে মানুষকে একেবারে ঘরে বন্দি না করে সীমিত আকারে জরুরি কিছু কিছু কাজ চলানোর উদ্যোগের কথাও তিনি জানান। ক্ষুদ্র শিল্প, হাট-বাজার চালু করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে কিছু জিনিস উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ মানুষকে সুরক্ষিত রেখে, মানুষের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিয়ে শিল্প-কারখানা পরিচালিত হতে পারে। ব্যবসার জন্য যারা ঋণ নিয়েছেন তাদের দুইমাসের সুদ স্থগিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, ১০ টাকায় চাল কেনার জন্য আরও ৫০ লাখ রেশন কার্ড সুবিধা দেওয়া হবে। যাদের আয়-উপার্জনের পথ নেই তারা ঈদের আগে নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। তিনি আবারও কৃষির ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘এবার ২১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হবে। আশা করি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে খাবারের সমস্যা হবে না।’ কৃষির মতো তিনি পোল্ট্রি এবং দুগ্ধ শিল্প রক্ষারও পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে ২৭ এপ্রিল একইভাবে তিনি গণভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে করোনা পরিস্থিতি ও ত্রাণ বিতরণ নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করার সময় সকলস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মহামারির প্রাদুর্ভাব দূর হওয়ার পর খুলবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, তিনি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে চার দফা পৃথক ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ বিভাগের সবগুলো জেলার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। ২৩ এপ্রিল তিনি পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করে বিশ্বের সকল নেতা, সংস্থা ও ফোরামের ঐক্যের মাধ্যমে একসঙ্গে করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার বিষয়ক ওই তারিখের ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, বিশ্ব সম্ভবত গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। সুতরাং সবাই একসঙ্গে সংকটের মোকাবেলা করা দরকার। সমাজের প্রতিটি পর্যায় থেকে সমন্বিত দায়িত্বশীলতা এবং অংশীদারিত্বমূলক মনোভাব প্রয়োজন। তার উত্থাপিত ৫ দফা প্রস্তাব হলো, ‘ক) বিশ্বকে মানবকল্যাণ, বৈষম্যদূরীকরণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং মহামারির পূর্বের অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে নতুন ভাবনা জরুরি। খ) প্রয়োজন জি-৭, জি-২০ এবং ওইসিডির মতো সংগঠনগুলো থেকে দৃঢ় ও পরিকল্পিত বৈশ্বিক নেতৃত্ব। জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকেও এগিয়ে আসা উচিত। গ) কোভিড পরবর্তী সময়ে নতুন নীতি, স্ট্যান্ডার্ড ও পদ্ধতির প্রবর্তন হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে যথাযথ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে যেন বাংলাদেশের মতো দেশগুলো টিকে থাকতে পারে। ঘ) অভিবাসী কর্মীদের বেকারত্ব মোচনের জন্য একটি অর্থপূর্ণ বৈশ্বিক কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ঘ) এই মহামারিতে কার্যকরীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংক্রমণ চিহ্নিত করা গেছে। ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন সেক্টরে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে এই রকম উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।’ করোনা মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী এর আগে ৩১ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। ত্রাণ বিতরণের জন্য নিজের দলের নেতাকর্মীদের ৩ দফা নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কেবল দফায় দফায় প্রস্তাব কিংবা নির্দেশে তিনি থেমে থাকেননি। বরং তার দিনপঞ্জিতে করোনা লড়াইয়ের কর্মসূচি বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।
মহামারি বিপর্যয় রোধে বৈশ্বিক সমন্বয় চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস আধানম গ্রেব্রিয়েসিসকে লেখা এক চিঠিতে তিনি করোনাভাইরাস মহামারির মতো ভবিষ্যতে যেকোনো বিশ্ববিপর্যয় কার্যকরভাবে মোকাবেলায় ‘আরো বেশি নীতি ও আর্থিক গুরুত্ব প্রদানের’ জন্য ‘বৈশ্বিক সমন্বয়ের’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি ভবিষ্যতে যেকোনো বিশ্ববিপর্যয় কার্যকরভাবে মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের মতো স্বাস্থ্য বিষয়গুলোতে আরো নীতি ও আর্থিক গুরুত্ব প্রদানে বিশ্বব্যাপী সমন্বয়ের আহ্বান হিসেবে সবাইকে এই সংকটটিকে সতর্কতা হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি।’ ২৯ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনালাপে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ-ভারত একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই দেশই খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর আগে ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সার্কভুক্ত দেশগুলোকে এক হওয়ার প্রস্তাব দেন নরেন্দ্র মোদি। তার এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সার্কভুক্ত অধিকাংশ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান সমর্থন জানান।
৪.
বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রনায়ক যেখানে তাঁদের সরকারি লোকের ওপর নির্ভর করে করোনা-ভাইরাসের মহামারি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন সেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সার্বক্ষণিক ব্যস্ত সময় পাড় করছেন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায়। আমেরিকাতে করোনাভাইরাস বেশি ছড়ানো এবং মৃত্যু প্রায় ১ লাখ হওয়ার কারণ হিসেবে সেখানকার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে মোট কথা নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে দুষছেন বিশিষ্টজনরা। সেখানে ২১ জানুয়ারি প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। কিন্তু তারা ছয় সপ্তাহ পরে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন ও সামাজিক দূরত্বমূলক ব্যবস্থা শুরু করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা মিডিয়ার বদৌলতে নিউইয়র্ক সিটির গভর্নরের প্রেস কনফারেন্স দেখছি কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো নেতার বক্তব্য শুনছি অথচ গত ৮ মার্চে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর শেখ হাসিনা নিজেই এদেশের করোনা আক্রান্তের খবর, দ্রুত বদলে যাওয়া দেশের মানুষের আচরণ সম্পর্কে খোঁজ রাখছেন সবচেয়ে বেশি। এখন তার দায়িত্ব পালনের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে গণভবন এবং ভিডিও কল থেকে শুরু করে মোবাইল, টেলিফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে করোনা প্রতিরোধে দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত। জরুরি প্রয়োজনে মন্ত্রী, সচিব কিংবা দলীয় নেতাদের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই নিজের বাসভবনে মিটিং করছেন। উদ্ভূত নতুন নতুন অবস্থাভেদে তৃণমূল নেতাদেরও ভিডিও কলে নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। শেখ হাসিনার যথাযথ নির্দেশনার কারণেই এদেশে দ্রুত সময়ে আক্রান্তদের চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে, চিকিৎসার সুযোগও ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে যেখানে প্রায় ৪৫ লাখ আক্রান্ত, মৃত ৩ লাখের বেশি মানুষ সেখানে কেবল শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণে এদেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে না। ৬৪ জেলায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের সাধারণ ছুটি আগামী ৩০ মে পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সবকিছুকেই তার পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যবৃন্দ এবং চিকিৎসকগণ মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
৫.
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের সূচনা দিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ থেকে সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি ঘোষিত হবার পর, ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। অর্থাৎ রোগী শনাক্তের ২ সপ্তাহ পরই হার্ডলাইনে চলে যায় সরকার। গত ৩ মাসে দেশের আট বিভাগের জেলা প্রশাসক, চিকিৎসক, পুলিশ, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে ব্রিফিং ও নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংকট মোকাবিলার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মতামতও নিয়েছেন। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য করণীয় ঠিক করে দিয়েছেন। আগেই বলেছি, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে জাতিকে ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।
নির্দেশনাগুলো হলো, ১. করোনাভাইরাস সম্পর্কে চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ভাইরাস সম্পর্কিত সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. লুকোচুরির দরকার নেই, করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। ৩. পিপিই সাধারণভাবে সকলের পরার দরকার নেই। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য পিপিই নিশ্চিত করতে হবে। এই রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পিপিই, মাস্কসহ সব চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা এবং বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ৪. কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত সব চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এ্যাম্বুলেন্স চালকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। ৫. যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে বা আইসোলেশনে আছেন, তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে। ৬. নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। ৭. নদীবেষ্টিত জেলাসমূহ নৌ-এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে হবে। ৯. পরিচ্ছন্নতা নিশ্চত করা। সারাদেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। ১০. আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। জাতীয় এ দুর্যোগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সব সরকারি কর্মকর্তা যথাযথ ও সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন, এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ১১. ত্রাণ কাজে কোন ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। ১২. দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষক যেন অভুক্ত না থাকে। তাদের সাহায্য করতে হবে। খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত তালিকা তৈরি করতে হবে। ১৩. সোশ্যাল সেফটিনেট কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ১৪. অর্থনৈতিক কর্মকা- যেন স্থবির না হয়, সে বিষয়ে যথাযথ নজর দিতে হবে। ১৫. খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক প্রকার ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে। ১৬. সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। যাতে বাজার চালু থাকে। ১৭. সাধারণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ১৮. জনস্বার্থে বাংলা নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে যাতে জনসমাগম না হয়। ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে। ১৯. স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমাজের সব স্তরের জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। প্রশাসন সবাইকে নিয়ে কাজ করবে। ২০. সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। ২১. জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসন ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করবেন। ২২. সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেমন: কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সা/ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, স্বামী পরিত্যক্তা/বিধবা নারী এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখাসহ ত্রাণ সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ২৩. প্রবীণ নাগরিক ও শিশুদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২৪. দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (এসওডি) যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য সব সরকারি কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। ২৫. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও নিয়মিত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ২৬. আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করবেন না। খাদ্যশস্যসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ২৭. কৃষকগণ নিয়মিত চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। ২৮. সব শিল্প মালিক, ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিজ নিজ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ি-ঘর পরিষ্কার রাখবেন। ২৯. শিল্প মালিকগণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে উৎপাদন অব্যাহত রাখবেন। ৩০. গণমাধ্যম কর্মীরা জনসচেতনতা সৃষ্টিতে যথাযথ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও অসত্য তথ্য যাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ৩১. গুজব রটানো বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে নানা গুজব রটানো হচ্ছে। গুজবে কান দিবেন না এবং গুজবে বিচলিত হবেন না।
এই নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য শেখ হাসিনা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন মাঠ প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, এমপি, মন্ত্রী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে।
৬.
২৫ মার্চ থেকে সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। তখন থেকে দেশের মধ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতির উদ্দেশে একইদিনে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। এ সময় দেশের পোশাক খাতসহ রফতানি শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন তিনি। মহামারির কারণে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরবরাহ ও চাহিদা দ্বিমুখী সংকটের সম্মুখীন। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে প্রায় ১১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে যার মূল সুবিধা ভোগ করবে উৎপাদন ও সেবা খাত, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষামূলক খাতসমূহ। এই সহায়তা প্যাকেজটি বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা ৩ দশমিক ৩ ভাগের সমান। সংকট প্রলম্বিত হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী এ সময় শুধু কৃষি খাতে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়েছেন। কৃষিখাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে মহামারি পরিস্থিতিতে।অন্যদিকে দেশে ফেরত আসা প্রবাসী কর্মীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।দিনের পর দিন অন্যদেশে পরিশ্রম করে যারা টাকা পাঠাতেন তারাও এখন বিপদের মুখে।
লেখাবাহুল্য, প্রথম করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের সূচনা হয় ৮ মার্চ থেকেই। অর্থাৎ করোনা মোকাবেলায় মার্চ মাস থেকেই তিনি কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন।২৯ মার্চ পুনরায় কর্মহীনদের তালিকা করে ত্রাণ বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেন। যেসব কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে খাদ্য সমস্যায় আছে, সেসব কর্মহীন লোক (যেমন, ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ফেরিওয়ালা, চায়ের দোকানদার) যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালায় তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মী এবং সরকারের সকল স্তরে যেমন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন, তেমনি দেশের কোথায় কী করতে হবে, কী ঘটছে, যাবতীয় বিষয়ে সার্বিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ৫ এপ্রিল গণভবনে প্রেস কনফারেন্স করেন তিনি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব উত্তরণে নতুন করে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেন। নতুন চারটিসহ পাঁচটি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ১৩ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ ১৪২৭ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। ১৬ এপ্রিল থেকে একাধিক দিন তিনি বিভাগ ও জেলাভিত্তিক মাঠ পর্যায়ের প্রশাসকদের সঙ্গে ভিডিও কলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
৭.
ক্ষমতার বাইরে রাজনীতির মাঠে অবস্থান করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে ১৯৯৫ এবং ২০০১-২০০৭ সাল পর্যন্ত জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ ছিলেন শেখ হাসিনা। তার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন। তিনি শ্রমজীবী মানুষ বা খেটে খাওয়া মানুষের ঘরের খবর রাখেন, তিনি মধ্যবিত্তের কথাও ভাবেন। আবার দেশের শিল্প-কলকারখানা বাঁচাতে হবে তাও টের পান। লকডাউনের সময় সবদিকেই তিনি খেয়াল রেখেছেন। কিন্তু তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি। করোনা মোকাবেলায় ফ্রন্টলাইনে থাকা চিকিৎসক, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়েছে।ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা ও বিপদের মধ্যে থাকা মিডিয়া সদস্যরাও তার সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত হন নি।আর কৃষিখাত তো গুরুত্বপূর্ণ প্রথম থেকেই। মূলত করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিদিনের কর্মসূচিতে উচ্চারিত ও বাস্তবায়ন হচ্ছে; যা তার মহামারি জয়ের প্রত্যয় হিসেবেই গণ্য করা যায়।
লেখক: ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]