লাদাখের জল চাবাহারে!

জোট নিরপেক্ষ ও ভারসাম্য পররাষ্ট্রনীতির দেশ ভারতের মার্কিন অক্ষে ঝুঁকে যাওয়া ও চীনের বেল্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সমীকরণে ‘ভূমিধ্বস’ পরিবর্তন আনছে। সর্বশেষ চমকে ইরান-ভারত ও আফগানিস্তানের ত্রিদেশীয় চাবাহার রেল প্রকল্প থেকে আচমকা ভারতকে বাদ দিয়ে দেয় ইরান। চীন ও ইরানের মধ্যে ২৫ বছরের ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ চুক্তি হওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসে। ইরান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের এই পার্টনারশিপ চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানের জ্বালানি, বন্দর, সামরিক ও তথ্যপ্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ করবে। বিপরীতে ইরান থেকে কম বিনিময় মূল্যে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ পাবে চীন। এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়াসহ পুরা এশিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। প্রথমত ইরানের তেল গ্যাস প্রাপ্তির মাধ্যমে চীনের Malacca Dillema ঘুচতে যাচ্ছে। ইরানের সাথে চীনের ঘনিষ্টতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে মুখোমুখি করবে। মার্কিন প্রেসক্রিপশনে সৌদি-আমিরাত অক্ষ উইঘুর ইস্যুতে চীনের সমালোচক হয়ে উঠতে পারে। ফলে রাশিয়ার মতো চীনও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি অংশ হতে যাচ্ছে।

জোট নিরপেক্ষ ও ভারসাম্য পররাষ্ট্রনীতির দেশ ভারতের মার্কিন অক্ষে ঝুঁকে যাওয়া ও চীনের বেল্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সমীকরণে ‘ভূমিধ্বস’ পরিবর্তন আনছে।

সর্বশেষ চমকে ইরান-ভারত ও আফগানিস্তানের ত্রিদেশীয় চাবাহার রেল প্রকল্প থেকে আচমকা ভারতকে বাদ দিয়ে দেয় ইরান। চীন ও ইরানের মধ্যে ২৫ বছরের ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ চুক্তি হওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসে। ইরান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের এই পার্টনারশিপ চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানের জ্বালানি, বন্দর, সামরিক ও তথ্যপ্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ করবে। বিপরীতে ইরান থেকে কম বিনিময় মূল্যে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ পাবে চীন। এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়াসহ পুরা এশিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। প্রথমত ইরানের তেল গ্যাস প্রাপ্তির মাধ্যমে চীনের Malacca Dillema ঘুচতে যাচ্ছে। ইরানের সাথে চীনের ঘনিষ্টতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে মুখোমুখি করবে। মার্কিন প্রেসক্রিপশনে সৌদি-আমিরাত অক্ষ উইঘুর ইস্যুতে চীনের সমালোচক হয়ে উঠতে পারে। ফলে রাশিয়ার মতো চীনও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি অংশ হতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে ইরানের এই সিদ্ধান্ত ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধরনের হোঁচট। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে ইরান ও ভারত চাবাহার প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে একমত হয়েছিল। কিন্তু চীন-ইরান চুক্তির পর প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ দেওয়ার পেছনে চীনের ‘ভারত ছাড়’ শর্ত ছিল বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। ইরান সাহসী সিদ্ধান্তকে লাদাখ সীমান্ত সংঘাতের জবাব ভারত যেভাবে বানিজ্য যুদ্ধ দিয়ে দিচ্ছে তার চীনা প্রক্সি প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা হচ্ছে। তবে এই ঘটনার তাৎপর্য আরও গভীর। ভারত-মার্কিন মিত্রতার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে চীন-ইরানের মিত্রতা। যেখানে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে পাকিস্তান-আফগানিস্তান এমনকি ইরাক, সিরিয়াও।

ভারত ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক প্রায় ৭০ বছরের। চার বছর আগে ত্রিদেশীয় চুক্তি অনুযায়ি ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে আফগানিস্তানের জারাঞ্জ পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে রেলপথ ও সড়কপথ নির্মাণের দায়িত্ব পায় ভারত। এর আগে ইরানের চাবাহার বন্দরে ৫০ কোটি ডলার ভারতীয় বিনিয়োগসহ দুদেশ যৌথভাবে বন্দরের উন্নয়নে কাজ করছিল। ইরানের এই বন্দরের উন্নয়নে ও রেল প্রকল্পে সংযুক্ত হতে পারা শামিল হতে পারা ছিল ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বিস্তারের উল্লেখযোগ্য এক অগ্রগতি। এই বন্দরকে চীনের অর্থয়ানে নির্মিত পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের বিকল্প হিসাবে নিয়েছিল ভারত। পাকিস্তানকে বাইপাস করে এই বন্দর ও রেলপথ ব্যবহার করে ইরান ও আফগানিস্তানের পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার সাথে বানিজ্য করার সুযোগ পেতে যাচ্ছিল ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা। চাবাহার বন্দর ও রেল প্রকল্প ভারতকে তাজিকিস্তানে ভারতের বিমানঘাঁটিতে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেয়। এছাড়া ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র আফগানিস্তানের পাকিস্তান নির্ভরতা কমানোর একটা সুযোগ পায় ভারত। ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান তার আমদানি-রফতানির ৪০ শতাংশ করে পাকিস্তানের মাটি ও বন্দর ব্যবহার করে। আফগানিস্তানের জন্য চাবাহার বন্দর পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে ৮০০ কিলোমিটার কম দূরত্বে অবস্থিত।

রেল প্রকল্পে অর্থনৈতিক ছাড়ে ধীরগতির জন্য ভারতকে বাদ দেওয়ার কথা বলছে ইরান। চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগ নিয়েও ভারতের নানা গড়িমসি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে বহু বিদেশী কোম্পানির বিরুদ্ধে অবরোধ দিয়ে রাখলেও চাবাহারে ভারতের বিনিয়োগকে অবরোধের বাইরে রেখেছিল আফগানিস্তানের স্বার্থ চিন্তা করে। ভারতসহ আটটি দেশে ইরান বিষয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল ছিল। কিন্তু গতবছরের মে মাসে শিথিলতার মেয়াদ ফুরিয়ে আসলে ভারতের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায় সস্তায় ইরানি তেল নাকি ট্র্রাম্পের বন্ধুত্ব! তখন ট্রাম্পকে খুশি রাখতে ভারত ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ রাখে। কাশ্মীর ইস্যুতে নীরবতা পালন করে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমদানি অব্যাহত রাখার অনুরোধ নিয়ে নয়াদিল্লী ছুটে গিয়েও মন গলেনি ভারতের। চাবাহারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সেদিনের ক্ষত প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে।

তবে মার্কিন শর্তে ভারতের ইরান বিমুখিতা নতুন নয়। মার্কিন-ভারত পরমাণু চুক্তির শর্ত হিসাবে ভারত-পাকিস্তান-ইরান ত্রিদেশীয় ‘শান্তি গ্যাস পাইপলাইন’ থেকে সরে এসেছিল ভারত। সর্বশেষ ইরান ও পাকিস্তান চীনা অর্থায়নে এই পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বারেবারে মার্কিন চাপে ইরানের প্রকল্প থেকে ভারতের সরে যাওয়া ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র চীনের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে উঠতে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। শত্রুর শত্রু বন্ধু হওয়ার নীতিকে ইরান চীনের এই  ঘনিষ্টতা এশিয়ায় মার্কিন- ভারত অক্ষের সাথে চীনের বানিজ্য ও সামরিক স্নায়ু যুদ্ধকে আরও প্রকট করবে। একটা প্রবাদ আছে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন হয়না।’ ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন বন্ধুত্ব পাতিয়ে কৌশলগত বহু মিত্র হারাতে হচ্ছে ভারতকে।

ইতিমধ্যে সাংহাই করপোরেশনের সদস্য হওয়ার জন্য ইরানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে চীনা প্রভাব প্রকট হচ্ছে। চাবাহার হারানোর মাধ্যমে আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ তৈরির সুযোগ হাতছাড়া হলো ভারতের। চীনের সাথে চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের মতো ইরানের চীননির্ভর হয়ে যাওয়ার ভারতের জন্য ভূ-রাজনৈতিক পরাজয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেছেন, চাবাহার বন্দরে ভারতের শেয়ার থাকলেও সেখানে বড় প্লেয়ার হয়ে উঠবে চীন।


ইরানের তরফ থেকে এমনও ইঙ্গিত রয়েছে চীনের সহায়তায় নির্মিত পাকিস্তানের গোয়াদার ও চাবাহার বন্দরের মাঝে যোগাযোগ-সংযুক্তিতেও আগ্রহী তারা। যদি চীন-ইরান-পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক ভূ-রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি হয় তবে বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, ও সমুদ্র যোগাযোগে এগিয়ে থাকবে এই অক্ষ। যা পারস্য উপসাগরে ভারতের নৌ চলাচলকে আরও অনিরাপদ করবে। সেই সাথে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন প্রভাব ক্ষীণ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে চীন ও পাকিস্তানের হাতে। যা ভারতের জন্য অধিকৃত কাশ্মীরের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। চীন-ইরানের ঘনিষ্টতা আজকে নতুন নয়। নব্বইয়ের দশক থেকে দুই দেশ পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু ইরানের চীন ঘনিষ্টতা মানে ভারতবিমুখীতা এই পরিস্থিতি ভারতের ভারসাম্য বিদেশনীতির ব্যর্থতা বলা চলে। অন্যদিকে এই চুক্তিতে মার্কিন বিরোধী রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য তৈরীর একটা আভাস আছে। এই আভাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনকি মার্কিনবন্ধু ভারতেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও