১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে বান্দরবান জেলার রুমা ও থানচি উপজেলায় দুটি ব্যাংকের তিনটি শাখায় ডাকাতি করে, নিরাপত্তারক্ষী ও আনসার সদস্যদের অস্ত্র লুট করে এবং একজন ব্যাংক ম্যানেজারকে অপহরণ করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে। অবশ্য হইচই ফেলে দেয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়, কেননা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাস করে একটি কথিত ‘সশস্ত্র’ গোষ্ঠী দুটি উপজেলা সদর পরপর দুদিন প্রায় ১ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দুটি ব্যাংকের তিনটি শাখায় ডাকাতি করে নির্বিঘ্নে চলে গেছে। চলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এ হইচই ফেলে দেয়ার পেছনে আরো একটি কারণ হচ্ছে কেএনএফের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে যখন সংলাপ করছে এবং কেএনএফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার ব্যাপারে সমঝোতা ও আলাপ-আলোচনা চলছে, সেই সময়ে এ ধরনের শোডাউন, ব্যাংক ডাকাতি, অস্ত্র লুট এবং অপহরণের ঘটনা খুব স্বাভাবিক নয়। এছাড়া কেএনএফ ২০১৭ সালের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্নভাবে নানা ‘সন্ত্রাসী’ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটির কয়েকটি এলাকায় রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার সদস্যদের অর্থের বিনিময়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার অভিযোগ থাকলেও কিছু অপহরণের ঘটনা ঘটালেও এতবড় শোডাউন এবং ব্যাংক ডাকাতির মতো ঘটনা আগে ঘটেনি। ফলে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এলাকায় যেমন একটা ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি বান্দরবানে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর টনক নড়েছে এবং কেএনএফের এ দুঃসাহসিক কাজের জন্য সরকারও নড়েচড়ে বসেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ‘পার্বত্য চুক্তি’ (যা শান্তিচুক্তি নামে পরিচিত) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রকৃতপক্ষে প্রকাশ্য দিবালোকে এ ধরনের সশস্ত্র শোডাউনের আগে কখনো হয়েছে বলে মনে আমার জানা নেই। জনসংহতি সমিতি, সংস্কারপন্থী নামে পরিচিত জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ, পিসিপি এবং পিসিপি (গণতান্ত্রিক) প্রভৃতি নানা উপদলের মধ্যে বিভিন্ন সময় নানা দ্বন্দ্ব সংঘাত হয়েছে। নিজেদের মধ্যে এমনকি খুনাখুনির ঘটনাও ঘটেছে যাকে মিডিয়া ‘ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত’ বলে অভিহিত করে। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরও পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং খুনাখুনির ঘটনা ঘটেছে কিন্তু প্রায় ৭০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি পরপর দুদিন বান্দরবান জেলার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপজেলা সদরের কেন্দ্রস্থল প্রায় ১ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ রেখে তিনটি ব্যাংকে ডাকাতি করার মতো ঘটনা ঘটেনি। ফলে এ ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর মধ্যে যেমন এক ধরনের সক্রিয়তা তৈরি করেছে, তেমনি স্থানীয় জনগণের মধ্যেও এক ধরনের চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। খুব স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশের প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিকস মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এ সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করছে এবং নিয়মিত লাইভ টেলিকাস্ট করার মধ্য দিয়ে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক দূরীভূত হওয়ার পরিবর্তে আতঙ্কের মাত্রা খানিকটা বাড়ছে বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা, গবেষকরা এবং সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে এ ঘটনার কারণ ও ফলাফল ব্যাখ্যার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিন মিডিয়া মোটামুটি কেএনএফ ‘দখল’ করে রেখেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেএনএফ হঠাৎ কেন এত বেপরোয়া হয়ে উঠছে? হঠাৎ করে কেন তাদের ব্যাংক ডাকাতির দরকার পড়ল? কেএনএফের শক্তির উৎস কোথায়? কেএনএফের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা আছে কিনা? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এ ব্যাংক ডাকাতির মধ্য দিয়ে এবং এ সশস্ত্র শোডাউনের মধ্য দিয়ে কেএনএফ আসলে কী বার্তা দিতে চায়? আমার কাছে মনে হয়েছে, ব্যাংক ডাকাতি, ম্যানেজারকে অপহরণ, অস্ত্র লুট এবং সশস্ত্র শোডাউনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, এর একটা কারণ হতে পারে কেএনএফকে ছোটখাটো একটা ‘সশস্ত্র’ দল হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনার টেবিলে দরকষাকষি করার যে প্রক্রিয়া চলছিল সেখানে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার জন্য এ ঘটনার মধ্য দিয়ে কেএনএফ তাদের শক্তিমত্তার জানান দেয়ার চেষ্টা করেছে। কারণ একটা নিজস্ব মিলিটারি পোশাকে, অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে, প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে পরপর দুদিন দুটি অন্যতম উপজেলা সদর নিয়ন্ত্রণে রাখা, তিনটি ব্যাংক ডাকাতি করা, একজন ম্যানেজারকে অপহরণ করা এবং অস্ত্র লুটের মধ্য দিয়ে তারা এটা বোঝাতে চেয়েছে যে, তারা কোনো ছোটখাটো ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন নয়। একটি প্রশিক্ষিত সশস্ত্র দুর্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী তাদের আছে, যারা ভারতের মণিপুর ও মিজোরামে এবং মিয়ানমারের চীন রাজ্যে প্রফেশনাল ট্রেনিং নিয়ে কেএনএফের আর্মস উইংস কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) গঠন করেছে। তাই তারা তাদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হতে পারে যে কেএনএফের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে; বিশেষ করে প্রথম সারির নেতাদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে যখন শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সঙ্গে সমঝোতার আলাপ-আলোচনা চলছে, তখন দ্বিতীয় সারির নেতারা সেটাকে কখনই ভালো চোখে নেয় না। ফলে দ্বিতীয় সারির নেতারা এ সংলাপ চলাকালীন প্রথম সারির নেতাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ রকম একটি ঘটনা ঘটিয়ে বড় ধরনের শোডাউন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে বানচাল করে দেয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে কেএনএফের মধ্যকার বিদ্যমান নেতৃত্বের কোন্দল উন্মোচন হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ইন্সারজেন্স গ্রুপগুলোর সঙ্গে যখন অস্ত্রবিরতি, যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা হয়, তখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সারির নেতারা সেটাকে সবসময় ভালোভাবে নেয় না। এখানেও সে রকম হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় যেখানে মার্চের ৫ তারিখ শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সঙ্গে কেএনএফের নেতাদের বৈঠকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না করার ব্যাপারে একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও ৫ এপ্রিল নতুন করে আরেকটা বৈঠকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পরও এবং ২২ এপ্রিল এটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ার পরেও সংলাপ চলাকালীন হঠাৎ করে শোডাউন করে এ রকম ঘটনা ঘটানোর কোনো কারণ নেই।
তৃতীয় কারণটি হতে পারে, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টস নাম দেয়ার কারণে ভারতের মিজোরাম, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে বসবাসকারী বিভিন্ন কুকি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ‘সশস্ত্র’ ও বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাদের একটা যোগাযোগ আছে সেটা তারা এরই মধ্যে স্বীকার করেছে। আবার মিয়ানমারের চিন রাজ্যে চিন ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের সঙ্গেও তাদের একটা সংযোগ আছে। যেহেতু ভারতের মণিপুরের কুকিদের সঙ্গে স্থানীয় মেইতেইদের সশস্ত্র বিরোধ চলছে এবং সেখানে কুকিরা একটা শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করছে। আবার মিয়ানমারের চিন রাজ্যে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে চিন ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স তুমুল লড়াই করছে এবং এ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করে চিন ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স একের পর এক টাউন দখল করছে। ভারতে কুকিরা এবং মিয়ানমারের চিনরা যখন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করছে এবং একের পর এক টাউন দখল করছে, তখন বাংলাদেশে বসে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট কেন টেবিলে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের এত দিনের পরিশ্রমে গড়া ২৫০-৩০০ সদস্যের ব্যাটালিয়ন শান্তির চুক্তি স্বাক্ষরের নামে আত্মসমর্পণ করবে? এ কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে চলমান প্রক্রিয়া, যে আলোচনা এবং সমঝোতার যে সংলাপ সেটাকে নষ্ট করে দেয়া, ব্যর্থ করে দেয়া এবং বন্ধ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে কেএনএফ শোডাউনটি করেছে এবং আমরা জানি, এরই মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি সব ধরনের শান্তি প্রক্রিয়া, আলোচনা এবং সংলাপ প্রক্রিয়া বাতিল করেছে। অর্থাৎ কেএনএফ যে উদ্দেশ্যে এ শোডাউন করেছে, সেটা সফল হয়েছে।
সরকার কেএনএফের এ শোডাউনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে এবং কেনএফকে নির্মূল করার জন্য একটা সর্বাত্মক অভিযান এবং যৌথ অভিযানের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে আদৌ কি কেএনএফের কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে? বান্দরবানে এবং রাঙ্গামাটিতে প্রায় ১২ হাজার বাম জনগোষ্ঠী আছে। আর যখন কুকি-চিন ন্যাশনাল বলে এ সংগঠনের কাঠামো তৈরি হয়, তখন সেটা কেবলই বম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেননা কুকি-চিন বাংলাদেশে কোনো জনগোষ্ঠীর নাম নয়, এটা অনেকগুলো জনগোষ্ঠীর একটি ক্যাটাগরির নাম যার মধ্যে খুমি, খেয়াং, লুসাই, পাংকুয়া ও ম্রো সবাই অন্তর্ভুক্ত। কেবল অস্ত্রের ভাষা দিয়ে এদের ‘সশস্ত্র’ আন্দোলনকে কি চিরতরে নির্মূল করা যাবে? ফলে কেএনএফের ২৫০-৩০০ সদস্যের একটা গ্রুপকে সশস্ত্র অভিযানের মধ্য দিয়ে যদি নির্মল করাও যায়, তাহলে কেএনএফ যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল, এবং যে উদ্দেশ্যে তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, সেটাকে কি নির্মূল করা যাবে? পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অর্ধশত বছরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকায়নের ইতিহাস, পরিপ্রেক্ষিতে ও ইতিবৃত্ত যথাযথভাবে উপলব্ধি না করে কেবল যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে কেএনএফকে নির্মূল করার পরিকল্পনা দিয়ে পার্বত্য কি চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে আদৌ শান্তি আনা সম্ভব? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানাটা খুবই জরুরি।
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়