বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ অধিভুক্ত দেশগুলো নানা সময়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় স্তব্ধ বিশ্বের ক্ষত সারানোর পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর ৫১টি রাষ্ট্রের জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ ও দুটি পর্যবেক্ষণকারী দেশ জাতিসংঘের সদস্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
বর্তমান বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। শক্তির ভারসাম্য ধরে রাখতে পরাশক্তি দেশগুলো নিজেদের কর্মসূচি কোনোভাবেই বন্ধ করছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু অস্ত্রের নৃশংসতম ভয়াবহতা বিশ্ব দেখেছে। পরমাণু অস্ত্রের বিধ্বংসী ক্ষমতা আজও সারা বিশ্বে আতঙ্ক ও ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
ওই ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্র বন্ধ হওয়া উচিত ছিল। উচিত ছিল এর চির অবসান। অথচ হয়েছে তার বিপরীত। বরং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য বিশ্বের বহু দেশ প্রকাশ্যে বা গোপনে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। অথচ বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার ও সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।
তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ জাপান এগিয়ে আছে। পরমাণু বোমার আঘাতে জর্জরিত দেশটি এখন বিশ্বের বুকে অন্যতম শান্তিবাদী দেশ হিসেবে সুপরিচিত। প্রযুক্তিগত শিক্ষা, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক বিকাশ, বাণিজ্য, বিভিন্ন দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, নির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে মনোযোগী জাপান এখন চরমভাবে যুদ্ধবিমুখী।
হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংসযজ্ঞের পর বহু জল গড়িয়েছে। যে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে এভাবে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন। উদার মনোভাবাপন্ন না হলে এ উত্তরণ সম্ভব হতো না জাপানের পক্ষে।
সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচির কারণে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যস্থতায় প্রশমিত হয়। বিষয়টিকে ঘিরে জাপানের নীতিনির্ধারকরা আশা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে আলোচনায় বসে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিহারে উত্তর কোরিয়াকে রাজি করাতে সক্ষম হবেন। কেননা জাপানের নেতারা মনে করেন উত্তর কোরিয়ার স্বল্পপাল্লার এ পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কারণে টোকিও ঝুঁকিতে রয়েছে। শান্তি পরিপালন মনোভাবাপন্ন জাপান কোনোভাবেই আর যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
জাপান দেশটিকে আমরা ‘শান্তিবাদী এক দেশ’ হিসেবে দেখে থাকি। বিভিন্ন সময় নিজেদের বিভিন্ন কাজে সেটা প্রকাশও করেছে জাপান। তাদের সংবিধানের ৯ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা আছে—
জাপানি জনগণ ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে আন্তরিকভাবেই আন্তর্জাতিক শান্তি কামনা করে। যুদ্ধ একটি জাতির সার্বভৌম অধিকার—এ ধারণা জাপানিরা পরিত্যাগ করেছে। অন্যদিকে বল প্রয়োগ বা তার হুমকি দেয়াকে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব-বিবাদ মেটানোর মাধ্যম হিসেবে তারা স্বীকার করে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালে জাপান পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করে। সেটা করতে গিয়ে সে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্রের অনেক মৌলিক অধিকার ত্যাগ করে। এ পুনর্নির্মাণের পথ মসৃণ ছিল না। জাপানি নীতিপ্রণেতাদের এটা নিশ্চিত করতে হয়েছে যে তাদের নতুন নীতিগুলো যেন শুধু ৯ ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণই না হয়, সেগুলো যেন আন্তর্জাতিক পরিসরে জাপানের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খায়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রয়োজনে জাপানের সংবিধানে এ ধারা সংযুক্ত করে।
যদিও ১৯৫০ সালে কোরীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাপানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা একদম উল্টে যায়। তখন আবার তার সশস্ত্র জাপানের প্রয়োজন হয়। ১৯৪৬ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার পরই এ পরিবর্তন শুরু হয়, জাপান তখনো মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা জেনারেল ডগলাস ম্যাকার্থারের অধীনে ছিল। ফলে জেনারেল ম্যাকার্থারকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জাপানকে পুনঃসশস্ত্রীকরণ করতে হয়।
এ ঘটনার পরও জাপানকে কখনো শান্তির পথ ছাড়তে দেখা যায়নি। যদিও জাপানের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সেনাবাহিনীর মধ্যে অন্যতম। তবে জাপানের নীতিতে রয়েছে—যেটা আক্রমণের হুমকি অথবা জাতিসংঘ সনদের আলোকে শান্তি স্থাপন ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয় এমন রণসজ্জা তারা এড়িয়ে চলবে। আর এসব কারণে জাপানের সংবিধানকে শান্তির সংবিধান বলা হয়।
জাপান যে শুধু নিজেরা যুদ্ধ ত্যাগ করেছে বা নিজেদের জন্য শান্তি স্থাপন করে চলেছে বিষয়টি তেমন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শান্তি স্থাপনে তারা কাজ করছে। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ২০১৪ সালে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় দেশটি। পাহাড়ে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবহমানতা বাড়াতে এবং উন্নয়ন সহযোগী হতে দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা এ বিষয়ে সহযোগিতার অংশীদূত হন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার জাপান দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। উভয় দেশের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে রেখেছে জাপান। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাপানের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং যমুনা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণ, পেট্রো কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, বস্ত্র ও রেয়ন মিল এবং ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণ আশু প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এছাড়া জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এশিয়ার অন্যতম দেশ হিসেবে জাপানের সহযোগিতা কাম্য ছিল।
সব দিক বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে টোকিও বিমানবন্দরে পৌঁছেন। বাংলাদেশের জাতির পিতার সম্মানে টোকিও বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর জন্য জাপানের ঐতিহ্যবাহী নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। প্রাণঢালা সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭০৭ থেকে অবতরণের পর জাপানি প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকা সবার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানান।
তার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপান ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যথাসম্ভব সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়াসহ বর্তমানে অনেক মেগা প্রকল্প চালু রয়েছে জাপানের। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দরসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প রয়েছে জাপানের। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিনিয়োগ ৩৮০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের সঙ্গেও জাপানের ঐতিহাসিক কাল থেকে গভীর কৌশলগত আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একই রকম চিন্তাভাবনা রয়েছে। দুই দেশই তাদের জনগণের উন্নত ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। দুই প্রধানমন্ত্রী সংবাদ আলোচনার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অহিংসা ও সহনশীলতার মতো বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ জোর দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারত ও জাপানের মধ্যে শিক্ষা ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনা আদান-প্রদানের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দুই দেশ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর বিশ্বের উন্নয়নের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করে চলেছে।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাপান এভাবে কাজ করে চলেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের প্রথমার্ধে, থাইল্যান্ডে জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এ সময়ে ২৮৪ জন বৈদেশিক বিনিয়োগকারী থাইল্যান্ডে বিনিয়োগ করেন এবং এর মধ্যে জাপানি বিনিয়োগকারী ছিলেন ৭১ জন। এ সময়ে ৩ হাজার ১৬৪ জন থাইল্যান্ডের নাগরিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ইলেকট্রনিকস, কেমিক্যাল, বায়োপ্লাস্টিক প্রভৃতি খাতে থাইল্যান্ডে প্রচুর জাপানি বিনিয়োগ হয়েছে। আকর্ষণীয় ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ নীতি, জাপান ও থাইল্যান্ডের মধ্যে অর্থনীতিক অংশীদারত্বের চুক্তি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, থাইল্যান্ড ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রভৃতি কারণে থাইল্যান্ডে প্রচুর জাপানি বিনিয়োগ হয়েছে।
২০২১ সালে মালয়েশিয়ায় জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়া প্রায় ২২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা জাপান থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিকস এবং ইলেকট্রিক্যাল শিল্প, আইটি, যোগাযোগ ইত্যাদি খাতে ব্যয় হবে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি জাপানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
২০১৯ সালে ফিলিপাইনের অর্জিত বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জাপান প্রায় ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা ফিলিপাইনে বিনিয়োগ করে, যা সে সময়ের প্রাপ্ত বিনিয়োগের ৩১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ফিলিপাইনের বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোনগুলোয় ৮৯১টি জাপানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং ১৯৯৫ থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ফিলিপাইনে বিনিয়োগ করেছেন, যা ফিলিপাইন অর্থনৈতিক জোনগুলোয় বৈদেশিক বিনিয়োগের ২৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সুতরাং বলা যায়, যুদ্ধনীতি ছেড়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রসারণের মাধ্যমে জাপান বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে একদিক থেকে যেমন অর্থনৈতিক উৎকর্ষ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষতা অর্জন। দুটি বিষয়েই জাপান বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। জাপানের এ শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত থাক। ধ্বংস নয়, বিনির্মাণে দেশটি থাকুক বন্ধুপ্রতিম।
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম: চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়