অভিমত

প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য পরিক্রমা

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির চিলাপাড়া পাহাড়ি এলাকায় মেদাবরি জঙ্গলে নলরাজারগড় নামক আয়তাকৃতির দুর্গের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা করা যায়, এটি একটি বৃহদাকৃতির নগরদুর্গ ছিল। সম্ভবত দুর্গটি তোরশা উপত্যকায় জঙ্গল-দুর্গ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষা করতেই এ দুর্গ। এর প্রাচীরের উচ্চতা স্থানভেদে ৪ মিটার থেকে ৭ দশমিক ৩ মিটার। দুর্গটি গুপ্ত আমলে নির্মিত

[গতকালের পর]

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির চিলাপাড়া পাহাড়ি এলাকায় মেদাবরি জঙ্গলে নলরাজারগড় নামক আয়তাকৃতির দুর্গের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা করা যায়, এটি একটি বৃহদাকৃতির নগরদুর্গ ছিল। সম্ভবত দুর্গটি তোরশা উপত্যকায় জঙ্গল-দুর্গ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষা করতেই এ দুর্গ। এর প্রাচীরের উচ্চতা স্থানভেদে ৪ মিটার থেকে ৭ দশমিক ৩ মিটার। দুর্গটি গুপ্ত আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজবাড়িডাঙ্গা মুর্শিদাবাদে অবস্থিত দুর্গটিকে অনেকে রাজবাড়িডাঙ্গাকে রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া ওই স্থানে দুর্গ বা কোনো ইমারতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে রাজধানী যদি হয় তাহলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ দুর্গ থাকতে পারে বলে অনুমান করা যায়।

কোটিবর্ষ-বানগড়কে মহাস্থানগড়ের সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা যায়, তবে আকারে বেশ ছোট, আয়তন ১ হাজার বর্গফুট। পুনর্ভবা নদীর বাম পাশে অবস্থিত এ নগরী পূর্বদিকে আত্রাই নদীবেষ্টিত ছিল এবং চারদিকে চওড়া ইটের প্রাকারে সুরক্ষিত ছিল। রাজকীয় প্রাসাদ, সরকারি ভবন, বণিক-গৃহ, সেনানিবাস, বাজার এবং মন্দির সবই ছিল এ দুর্গ নগরে। তবে এগুলো পাল আমলের। দুর্গ প্রাকারের বাইরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিল্পী, কৃষক, শ্রমিক বসবাস করত।

বাংলাদেশের সাভারে বংশী নদীর তীরে অবস্থিত কোটবাড়ী একটি মাটির দুর্গ, যার দৈর্ঘ্য পূর্ব-পশ্চিমে ২৫০ মিটার এবং দক্ষিণে ১৮০ মিটার। সাত-আট শতকের সমতট অঞ্চলের খড়্গ এবং দেব রাজাদের সময়ে এটি একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। এ স্থানে ‘হরিশচন্দ্র্র রাজার বাড়ি’ নামে কথিত একটি প্রমাণ সাইজ স্তূপ ও বিহার আবিষ্কার হয়েছে খননে। এছাড়াও নিকটবর্তী দাগুরমারাতে ক্রুশাকৃতির ইট নির্মিত স্তূপ আবিষ্কৃত হওয়ায় কেউ কেউ মনে করেন এটি কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের স্থাপত্য নকশা প্রভাবিত ছিল।

গৌড় বাংলার এক প্রাচীন ভূভাগ। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা এবং বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ জেলা মিলে প্রাচীন গৌড়ের অবস্থান। পাণিনীর বর্ণনায় ‘গৌড়পুর’ নামক শহর এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে গৌড়-দেশের উল্লেখ রয়েছে।

টলেমি ও স্ট্রাবো গৌড়কে ‘গওরো’ বলে উল্লেখ করেছেন। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতকের জৈন লেখনীতে লক্ষ্মাণাবতীকে গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বহুল আলোচিত রামপালের (১০৭৭-১১২০ খ্রি.) রামাবতী নগর লক্ষণাবতীর পূর্বে এবং সম্ভবত গৌড়ের একটি অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল। রামাবতী ও লক্ষ্মাণাবতী মুসলিম শাসনের আগে দুটি সমৃদ্ধিশালী নগরী ছিল। গৌড় শহর গঙ্গা এবং মহানন্দার মধ্যবর্তী একটি সরু এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এটা যে সুরক্ষা এবং নৌ-চলাচলের সুবিধার জন্য রাজধানী হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘ফুলওয়ারি’ এবং ‘পাতাল চণ্ডী’ নামে শহরের দুটি তোরণ ছিল যা সেন আমলে নির্মিত। প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক কানিংহামের মতানুসারে সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেনের পিতা বল্লাল সেনের নামে নির্মিত বল্লালবাড়ি (দুর্গ) ফুলওয়ারী তোরণের চার মাইল উত্তরে অবস্থিত ছিল। বর্গাকৃতির এ শহরে চারদিকে ১৫ দশমিক ২৪ মিটার চওড়া ও ৬ দশমিক ১০ মিটার উঁচু বাধ ছিল বলে কানিংহাম উল্লেখ করেছেন। বাঁধের ভেতরে ও বাইরে ২২ দশমিক ৮৬ মিটার চওড়া। ভেতরে কোনো স্থাপত্য নিদর্শন না পেলেও ক্রুশাকার রাস্তার উল্লেখ করেছিলেন কানিংহাম।

বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে বল্লালবাড়ী নামক প্রাচীন স্থান রয়েছে। রামপাল দীঘির দক্ষিণের এ নগরী ও দীঘি বল্লাল সেনের কীর্তি বলেই মানুষ মনে করে। দুর্গটি মৃত্তিকা নির্মিত, আয়তনে ২২৮ দশমিক ৬ বর্গমিটার। দুর্গটি অন্যান্য প্রাচীন দুর্গের মতো চতুর্দিকে পরিখাবেষ্টিত ছিল। দীঘির উত্তর দিকে রাজার হাতিশালার অবস্থান ছিল। ‘অগ্নিকুণ্ড’ এবং ‘রামপাল’ নামে দুটি দীঘির উল্লেখ থাকলেও কেবল রামপাল দীঘিটি এখনো অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের অনেক স্থানেই প্রাচীন দুর্গের সন্ধান পাওয়া গেছে যেমন দিনাজপুর জেলার বোদেশ্বরী দুর্গ, বাংলাগড়, নেকমরদ, গড়গ্রাম, ধর্মগড়, রানীশংকৈল-মালদুয়ার, কিচক বাজারগড়, বেলাইচান্দী বিরাট রাজার দুর্গ, ফুলবাড়ী দুর্গ, চন্ডীপুরগড় এবং পিংলাই, রংপুর জেলার বিরাটনগর, বগুড়া জেলার নিম্নগ্রাম এবং নবাবগঞ্জ (রাজশাহী) জেলার নওদা বুরুজ উল্লেখযোগ্য। খননের অভাবে এসব প্রত্নস্থলে স্থাপত্যের প্রকৃতি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

ময়নামতির শালবন বিহার প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি বৃহদাকৃতির স্তম্ভ হল আবিষ্কৃত হয়েছে যার ছাদ গোলাকৃতির বেশ কয়েকটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ হলের দুটি প্রকোষ্ঠ ছিল। হলটি সম্ভবত ভিক্ষুদের ভোজনকক্ষ হিসেবে ব্যবহূত হতো।

পাহাড়পুর বিহারেও এ ধরনের লোক স্থাপত্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিহার প্রাঙ্গণে একটি বৃহদাকারের ভোজন কক্ষ এবং বিহারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পুকুরে স্নানের জন্য পাকা ঘাট ছিল। ভোজন কক্ষটি ময়নামতির ভোজন কক্ষের মতো স্তম্ভবিশিষ্ট হলঘর ছিল বলে খননের ফলে ধারণা করা যায়। বানগড়ে শস্য রক্ষণাবেক্ষণে নির্মিত গৃহের ভিত আবিষ্কারে প্রমাণিত হয় যে এই ধরনের ইমারতও প্রাচীন বাংলা স্থাপত্যের অংশ ছিল।

ধর্মীয় স্থাপত্য: ধর্মীয় স্থাপত্যকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—১. স্তূপ; ২. বিহার; ও ৩. মন্দির। স্তূপ ভারতীয় প্রাচীন স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। উদ্দেশ্যের দিক থেকে এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: ১. স্মৃতিচিহ্ন স্তূপ; ২. স্মারক স্তূপ; এবং ৩. নিবেদন স্তূপ। স্তূপ ইট, পাথর, মাটি বা ধাতু নির্মিত। প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রকারের স্তূপ কমই দেখতে পাওয়া যায়। যদিও সুয়ান জাং দ্বিতীয় প্রকার স্তূপের কয়েকটি উদাহরণ বাংলার বিভিন্ন স্থানে দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন, তবে এগুলোর অস্তিত্ব আজ আর অবশিষ্ট নেই। স্তূপের তৃতীয় প্রকারের উদাহরণ সামান্য কিছু টিকে থাকায় উদাহরণ হিসেবে নিয়ে এগুলোর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোচনা করা যায়।

স্তূপ সাধারণত বর্গাকার, অষ্টভূজ বা বৃত্তাকৃতির ভিতের ওপর নির্মিত হতো। বর্গাকার ভিতগুলোর পাশে ক্ষুদ্রাকার অনুরূপ ভিত নির্মাণ করে অনেক ক্ষেত্রে ক্রুশাকৃতির ভূমি নকশা প্রদান করা হতো। বৃত্তাকৃতির ভূমিও কোনো কোনো সময়ে ষোড়শভুজে

রূপান্তরিত করা হতো। ভিতের ওপর অর্ধবৃত্তাকৃতির গম্বুজ নির্মিত হতো। গম্বুজ কোনো কোনো সময়ে পিপার ওপরে নির্মিত হতো এবং ব্যাংকের মতো বর্গাকার শীর্ষ অলংকরণ থাকত। সবার ওপরে থাকত ছত্র। তবে সময়ের পরিক্রমায় স্তূপের অলংকরণে বাহুল্য দেখা দেয়। ফলে স্তূপ তার মূল আকৃতি হারিয়ে ক্রমহ্রস্বমান ছত্র সংযোজনের ফলে অনেকটা টাওয়ারের আকার ধারণ করেছিল।

ঢাকা জেলার আশরাফপুরে প্রাপ্ত বর্তমানে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে রক্ষিত, ময়নামতিতে প্রাপ্ত ও ময়নামতি জাদুঘরে রক্ষিত এবং ময়নামতিতে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জ নির্মিত স্তূপ অণুকৃতি এ ধরনের সূ্তপের উদাহরণ। বাংলার স্তূপ স্থাপত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে ময়নামতির শালবন বিহারে প্রাপ্ত ক্ষুদ্রাকৃতির ব্রোঞ্জের নিবেদন স্তূপটি গুরুত্বের দাবি রাখে। এতে একটি চতুষ্কোণ ভিত্তিবেদীর ওপর রয়েছে নলাকার ড্রাম ও অর্ধগোলাকার গম্বুজ। গম্বুজের ওপর দুই ধাপবিশিষ্ট ক্রমহ্রাসমান হর্মিকা এবং হর্মিকার ওপরে ফিনিয়াল বা স্তূপ-স্থাপত্যের বিবর্তনের শেষ ধারার নিদর্শন। সাত এবং আট শতকে সমতটের খড়গ এবং দেব শাসকদের আমলে এ ধরণের স্তূপ স্থাপত্য নির্মাণ করা হতো বলে ধারণা করা হয়। উল্লেখ্য, ব্রোঞ্জের আরো দুটি স্তূপের অনুকৃতি রাজশাহীর পাহাড়পুর এবং চট্টগ্রামের ঝিওরিতে পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের কুমিল্লার ময়নামতির শুরুর দিকের স্তূপের উদাহরণ রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া এবং কুটিলা মুড়ায় পাওয়া গেছে। পরবর্তী উদাহরণগুলো শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহারে পাওয়া গেছে। পাহাড়পুরের স্তূপগুলোর ধ্বংশাবশেষ শালবন বিহারের মতো বিহার অঙ্গনে আবিষ্কৃত হয়েছে। ইটাখোলার স্তূপগুলো বিহার অঙ্গনের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব কোণে আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো ময়নামতির সবচেয়ে জটিল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এ স্তূপগুলোর ভিত বর্গাকার হলেও ওপরের দিকে ক্রুশাকৃতি ধারণ করেছে। ইটাখোলা মন্দিরের পেছনে আরো একটি ক্রুশাকার স্তূপের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, তবে তার নকশা বিভিন্ন সময়ের সংস্কারের ফলে অনেকটাই অস্পষ্ট। রূপবান মুড়ার সামনে যে দুটো স্তূপের ভিত আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের মধ্যে বাম দিকেরটি অষ্টভুজাকৃতির এবং ডানদিকেরটি বর্গাকৃতির।

কোটিলা মুড়ার ত্রিরত্ন স্তূপের প্রধান স্তূপ (৭-৮ শতক) তিনটি একই রেখায় নির্মিত ও বর্গাকার ভিত, গোলাকৃতির এবং গম্বুজ শীর্ষ প্রায় একই রকম। যদিও চূড়া শীর্ষ ও ছত্রাবলি কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। আয়তনের দিক থেকে তিনটি স্তূপই আলাদা, দক্ষিণের সর্ববৃহিটর প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৬৫ মিটার, মাঝেরটি ১১ দশমিক ২৮ মিটার এবং উত্তরেরটির ১০ দশমিক ৩৫ মিটার।

পাহাড়পুরের স্তূপগুলোর মধ্যে দুটির উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। মধ্য-ভিত বর্গাকৃতির হলেও পাশে ক্ষুদ্রাকৃতির বর্গ সমন্বয়ে ক্রুশাকার দেয়া হয়েছে। ক্রুশাকার ভূমি পরিকল্পনা থাকলেও ওপরের অংশের আকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা যায় না। পাহাড়পুর বিহারসংলগ্ন সত্যপীর ভিটার মন্দিরের সম্মুখে থেকেও ১৩২টি স্তূপের ভিত নকশা আবিষ্কৃত হয়েছে। এ স্তূপগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বর্গাকার একটি স্তূপের উল্লেখ প্রয়োজন। বাইরের দিক থেকে স্তূপটির আয়তন ৩ দশমিক ১২ মিটার। স্তূপের মধ্যস্থলে ১ দশমিক ৫ মিটার ব্যাসের একটি কক্ষ রয়েছে। কক্ষটিতে অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির নিবেদন স্তূপ আবিষ্কৃত হওয়ায় এটিকে একটি উপাসনা কক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পুণ্যার্থীরা পুণ্য লাভের আশায় এসব ক্ষুদ্রাকৃতির স্তূপ নৈবেদ্য হিসেবে দান করতেন।

পাহাড়পুরের কয়েকটি ফলকে স্তূপ প্রতিকৃতি উত্কীর্ণ রয়েছে। একটি ফলকচিত্রে ভিত্তিবেদীর ওপর সিলিন্ডার আকৃতির ড্রাম, ক্রমসরু গম্বুজ এবং আয়তাকার ফিনিয়ালসমৃদ্ধ স্তূপ ছাড়াও অন্য একটি ফলকের স্তূপের ওপর ছত্র অথবা অভিক্ষিপ্ত কার্নিশ রয়েছে। শেষোক্ত স্তূপের সম্মুখে অর্ধগোলাকার প্রবেশদ্বার বা তোরণ রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সাঁচী স্তূপে প্রবেশ তোরণ রয়েছে। প্রথমোক্ত স্তূপে পুষ্পমাল্যের অলংকরণ পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের রঘুরামপরের সিলমোহরে বুদ্ধপ্রতিমার দুই পাশে দুটি স্তূপ উত্কীর্ণ রয়েছে। স্তূপদ্বয়ের ক্রমসরু ড্রাম, চতুষ্কোণ হর্মিকা ও ক্রমহ্রাসমান ছত্রাবালি সঙ্গে পাকিস্তানের তখত-ই-বাহির খ্রিস্টীয় দুই অব্দের স্তূপের কিছুটা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। এখানে উল্লেখ্য, ময়নামতি কোটিলামুড়ার কেন্দ্রীয় স্তূপের কক্ষগুলো থেকে অসংখ্য মাটির নিবেদন স্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। নলাকার ড্রাম চতুষ্কোণ হর্মিকা ও সুচালো চূড়াবিশিষ্ট এই স্তূপগুলোর সঙ্গে পাহাড়পুরের সত্যপীর ভিটায় প্রাপ্ত কয়েক হাজার মাটির স্তূপের মিল রয়েছে। বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্তূপ নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। মূলত বুদ্ধদেব এবং তার অনুচর ও শিষ্যবর্গের শরীরাবশেষ সংরক্ষণ ও পূজার জন্য বৌদ্ধদের হাত ধরেই স্তূপ স্থাপত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। সাত শতকে প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক সুয়ান জং বাংলা ভ্রমণের সময় সম্রাট অশোক নির্মিত কিছু স্তূপ প্রত্যক্ষ করেন বলে উল্লেখ করলেও আমরা কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তার প্রমাণ পাই না। কিন্তু বাস্তবে অশোক নির্মিত কোনো স্তূপ আবিষ্কৃত না হলেও কোটিলামুড়া, সত্যপীর ভিটা প্রভৃতি প্রত্নক্ষেত্রে অশোকের রাজত্বকালের বহু বছর পর নির্মিত ইটের তৈরি স্তূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। খননের ফলে এসব স্তূপের ভূমি-নকশা ব্যতীত কোনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ সম্ভব হয়নি। কোটিলামুড়ার ত্রিরত্ন স্তূপ বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের প্রতীক যা এ উপমহাদেশে কদাচিৎ পরিলক্ষিত হয়। সত্যপীর ভিটার স্তূপের সংখ্যা ১৩২টি। এগুলোর সবই ইটের তৈরি নিবেদন স্তূপ। ফলকচিত্রে ও সিলমোহরে উত্কীর্ণ স্তূপ, ক্ষুদ্রাকৃতির মাটির নিবেদন স্তূপ, কোটিলামুড়া ও সত্যপীর ভিটার ইটের তৈরি স্তূপ এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনুযায়ী বলা যায়, বাংলাদেশে স্তূপ স্থাপত্য বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। কোটিলামুড়া কিংবা সত্যপীর ভিটার স্তূপগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় এগুলোর আকার প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পেলেও ফলকচিত্র, সিলমোহর ও ক্ষুদ্রাকৃতির নিবেদন স্তূপ থেকে তত্কালীন বাংলার স্তূপ প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। পরিশেষে বলা যায়, ফলকচিত্র ও সিলমোহরে উত্কীর্ণ এবং মাটির ক্ষুদ্রাকৃতির নিবেদন স্তূপ বাংলায় স্তূপ স্থাপত্যের গতি-প্রকৃতির ইঙ্গিতবহ। 

যদিও স্তূপ স্থাপত্য একসময়ে বৌদ্ধদের একান্ত ধর্মীয় স্থাপত্যে পরিণত হয় তবুও বিহার স্থাপত্য বাংলার বৌদ্ধদের সবচেয়ে জনপ্রীয় স্থাপত্যেকর্ম। চীনা পরিব্রাজকদের বর্ণনায়ও বিহার স্থাপত্যের উল্লেখ রয়েছে। বাংলার বিহারগুলো স্থাপত্য পরিকল্পনায় কুষাণ রীতিকে অনুসরণ করেছে। মাঝখানে একটি খোলা প্রাঙ্গণ রেখে চারদিকে বিহার কক্ষ নির্মাণ করা হতো এবং কক্ষগুলোর সামনে থাকত টানা বারান্দা। প্রতি বাহুর মাঝখানে একটি প্রবেশপথ বা তোরণ থাকত। প্রধান প্রবেশ তোরণটি সাধারণত উত্তর দিকে নির্মিত হতো, তবে কোনো কোনো সময়ে পূর্ব দিকেও প্রবেশ তোরণের উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। বিহার অঙ্গনের কেন্দ্রে প্রধান মন্দির নির্মাণ করা হতো এবং এ মন্দিরের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা যেমন ছোট মন্দির, স্তূপ, জলাধার, স্নানাগার, শস্যভাণ্ডার, ভোজনকক্ষ এবং রান্নাঘর থাকত। বিহারের ভিক্ষুদের জীবনের উপযোগী প্রতিটি ইমারতের সমন্বয়েই গঠিত হতো এ বিহার স্থাপত্য কমপ্লেক্স। বর্তমানের আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এগুলো তুলনীয়।

বাংলায় প্রাচীনতম বিহার স্থাপত্যের উল্লেখ পাওয়া যায় গুপ্ত আমলের একটি তাম্রশাসনে (৪৭৯ খ্রি.)। সময়ের ধারবাহিকতায় দিনাজপুরের সিতাকোট বিহারটি সপ্তম শতকের মাঝামাঝি নির্মিত হয়। বর্গাকৃতির এ বিহারটিও প্রথাগত পরিকল্পনায় স্থাপিত হয়।

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার ময়নামতি-লালমাই পাহাড়ে অনেক বিহারের অবস্থান। পাহাড়ের পূর্বঢালে এ বিহারগুলো ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। খননে উন্মোচিত বিহারগুলো হলো রূপবান বিহার, ইটাখোলা বিহার, শালবন বিহার, ভোজ বিহার এবং আনন্দ বিহার। এ বিহারগুলোর মধ্যে রূপবান মুড়াই সর্বপ্রাচীন বিহার। এটি সপ্তম শতকে খড়গ রাজবংশের রাজা বলভট্ট কর্তৃক স্থাপিত বলে মনে হয়। এখানে অবস্থিত মন্দিরটি প্রথমে বর্গাকার ও পরবর্তী সময়ে ক্রুশাকৃতির করে নির্মিত হয়। বর্গাকৃতির বিহার নকশাটি প্রথম পর্বের এবং ক্রুশাকৃতির মন্দিরটি পরবর্তীকালের। রূপবান মুড়ায় বিহার এবং মন্দিরের পৃথক অবস্থান থেকে অনুমান করা যায় যে বিহার স্থাপত্যের প্রথম দিকে বিহার ও মন্দির আলাদাভাবে নির্মাণ করা হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিহারের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। রূপবান মুড়ার উত্তরে ইটাখোলা মুড়া নামক বিহারটিও একই রীতিতে পৃথকভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল।

বাংলার বিহারকেন্দ্রিক মন্দিরগুলো ক্রুশাকার পরিকল্পনায় নির্মিত বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয় দেব যুগে এ পরিকল্পনার সূচনা ঘটে। শালবন বিহার ময়নামতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিহার স্থাপত্য বর্গাকৃতির। এ বিহারটির আয়তন ১৬৭ দশমিক ৬ বর্গমিটার এবং অঙ্গনের চারদিকে ১১৫টি ভিক্ষু কক্ষ রয়েছে। বিহারের কেন্দ্র প্রাঙ্গণে ক্রুশাকৃতির মন্দিরটির অবস্থান ছিল। বিহারের বাইরের দেয়াল ৫ মিটার চওড়া এবং স্থানভেদে উচ্চতা ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৮ মিটার। প্রবেশতোরণ উত্তর দিকে। প্রবেশ তোরণের সম্মুখে বহুধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি রয়েছে। বিহারের ভিক্ষু কক্ষের প্রতি বাহুর গড় পরিমাপ ৩ দশমিক ৬ মিটার এবং সামনের টানা বারান্দাটাি ২ দশমিক ৬ মিটার চওড়া। প্রতি কক্ষেই তিনটি করে কর্বেল পদ্ধতিতে নির্মিত কুলুঙ্গী রয়েছে। এ কুলুঙ্গীগুলোরয় সম্ভবত পূজার নিমিত্তে ক্ষুদ্র প্রতিমা কিংবা স্তূপ অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী রাখা হতো।

স্থানীয়ভাবে ভোজ রাজার বাড়ি নামে খ্যাত ভোজ বিহারের কেন্দ্র মন্দিরটি ক্রুশাকৃতির পরিকল্পনায় নির্মিত। মন্দিরের অলংকরণে পোড়ামাটির ফলক ব্যবহার করা হয়েছিল। ময়নামতিতে আবিষ্কৃত সর্ববৃহৎ বিহার আনন্দ বিহার যার প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ১৯৫ মিটার। শালবন বিহারের মতো এ বিহারেও একটি কেন্দ্র মন্দির এবং পাশে অন্যান্য ইমারতের ধ্বংশাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে খননের ফলে।

বাংলায় বিহার স্থাপত্যের ইতিহাসে সোমপুর বিহার একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এ বিহারটি শুধু বাংলায় নয় বরং পুরো উপমহাদেশের অন্যতম বিহার হিসেবে পরিচিত। সোমপুর বিহারের প্রশস্তি বুদ্ধ-গয়া এবং নালন্দার লিপিমালায় উল্লিখিত হয়েছে। তিব্বতী ভাষায় অনূদিত কিছুসংখ্যক সংস্কৃত বৌদ্ধ-সাহিত্যেও সোমপুরের উল্লেখ রয়েছে। বিহারটি আয়তনে প্রায় বর্গাকৃতির। উত্তর-দক্ষিণে বিহারটির পরিমাপ ২৭৬ দশমিক ৬ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমের ২৭৬ মিটার। শালবন বিহারের মতো এর প্রবেশ তোরণটিও উত্তর দিকে। বিহারের কেন্দ্রে বিশালকৃতির মন্দিরের অবস্থান। মন্দিরের চারপাশে রয়েছে ছোটখাটো নানা ইমারতের ধ্বংসাবশেষ। প্রধান ফটকের পূর্ব পাশে ক্ষুদ্রাকৃতির খিরকি দরজা রয়েছে। সোমপুরের চারদিকে ভিক্ষুকক্ষের সংখ্যা ১৭৭টি এর মধ্যে ৪৫টি উত্তর দিকে এবং অন্য দিকে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। বিহারটি পাল নৃপতি ধর্মপালের সময়ে (আনু. ৭৭০-৮১০ খ্রি.) নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে একসময় মন্দিরটি বৃহদাকৃতির ও এর চূড়া বহুদূর থেকেও দেখা যেত। ধারণা করা যায় মিয়ানমারের বাগানের আনন্দ মন্দিরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু বৌদ্ধ মন্দির পরিকল্পনা পাহাড়পুর, ময়নামতির ক্রুশাকৃতির মন্দির প্রভাবিত ছিল।

মন্দির: স্তূপ এবং বিহারের মতো প্রাক-মুসলিম যুগের কোনো মন্দিরই কালের করাল গ্রাসে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনি। সুতরাং মন্দির স্থাপত্য সম্পর্কে যে ধারণা আমরা পাই তার অধিকাংশই পশ্চিম বাংলায় টিকে থাকা উদাহরণ থেকে। এ উদাহরণগুলো একাদশ শতক এবং তার পরবর্তী সময়ের। এছাড়াও বিভিন্ন জাদুঘরে রক্ষিত পাথরের মন্দির অনুকৃতি, পালিপি চিত্র এবং খননাবিষ্কৃত ইমারতের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাচীন বাংলার মন্দির স্থাপত্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

ধারণা করা হয় বাংলার মন্দির-উত্তর ভারত এবং ওড়িশা রীতিপ্রভাবিত। সাধারণভাবে বাংলার মন্দির বর্গাকার, আয়তাকার বা ক্রুশাকার ভূমি নকশায় নির্মিত হতো। মন্দিরের গর্ভগৃহের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ পথ মন্দির স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বর্গকার মন্দির আয়তনে ছোট আর ক্রুশাকার মন্দির আয়তনে বড়। কোনো কোনো মন্দিরের সামনে স্তম্ভ-হল বা মণ্ডপ এবং তোরণ নির্মিত হতো। মন্দিরের অলংকরণে পাথর, ইট এবং পোড়ামাটির ফলকচিত্র ব্যবহূত হতো।

বাংলার মন্দিরগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় যেমন—১. ভদ্র বা পীড় দেউল। এ ধরনের মন্দিরের উপরি কাঠামো ক্রমে উঁচু হয়ে স্তর বিন্যাস্ত ছাদ মণ্ডপ ও আমলকে পরিণত হয়। ২. রেখ বা শিখর দেউল। এ ধরনের মন্দিরের ছাদ ক্রম হ্রাস পেয়ে ওপরে উঠে শেষ হয়। ৩. জটিল ভদ্র দেউল। এ ধরনের মন্দিরের উপরাংশ জটিল অবয়বে নির্মিত হয়ে শীর্ষ চূড়ায় স্তূপ অথবা শিখরে পর্যবসিত হয়।

ভদ্র মন্দিরই বাংলার আদি মন্দিরের নমুনা বলে অনেকে মতপ্রকাশ করেন। চন্দ্রকেতুগড়ে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে দ্বি-স্তরবিশিষ্ট যে মন্দির অণুকৃতিটি পাওয়া গেছে তা সময়ের পথপরিক্রমায় ভদ্র মন্দিরে রূপান্তর হয়েছে। ভদ্র মন্দির স্থাপত্যেও দ্বিতীয় পর্যায়ের বিকাশের প্রমাণ চন্দ্রকেতুগড়েই পাওয়া গেছে। ৪ দশমিক ২২ মিটার উঁচু দেয়ালের ভগ্নাবশেষে চিহ্নিত এ মন্দির এবং দিনাজপুর জেলার বৈরামে আবিষ্কৃত গোবিন্দ স্বামী মন্দির (৪৭৭-৭৮ খ্রি.)। বাংলার ভদ্র মন্দির স্থাপত্যের প্রাচীনতম উদাহরণ। চন্দ্রকেতুগড়ের এ আবিষ্কার নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ভদ্র মন্দিরের উদাহরণ বাংলাদেশের নরসিংদীর আশরাফপুরে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জ-স্তূপ অণুকৃতি, কলকাতার আশুতোষ জাদুঘরে রক্ষিত রাজশাহীর বিরলে প্রাপ্ত উমা-মহেশ্বর প্রতিমার পৃষ্ঠফলকের মন্দির অলংকরণ, বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত রাজশাহীর বারিয়া গ্রামের সূর্য প্রতিমা এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত ঢাকার মধ্যপদে প্রাপ্ত বুদ্ধ ভাস্কর্যের মন্দির নকশায় পরিলক্ষিত হয়। তবে এ মন্দিরের প্রকৃত স্থাপত্যিক উদাহরণ বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার অনেক মন্দিরেও লক্ষ্য করা যায়।

রেখ মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় পশ্চিম বাংলায়। অষ্টম শতক থেকে এ রীতির সূচনা। এ মন্দিরের সর্বোত্কৃষ্ট উদাহরণ একাদশ শতকে নির্মিত বাঁকুড়া জেলার বালুহারার ইট নির্মিত সিদ্ধেশ্বর মন্দির। মন্দিরটি উল্লম্বভাবে নির্মিত এবং শেষ অংশ বাঁকা হয়ে চূড়ায় পরিণত হয়েছে। মন্দিরটি কুলুঙ্গী এবং লতা নকশায় সুশোভিত। পুরুলিয়া জেলার বোধপুরের কাছে তুইসামায় ব্রাহ্মণ্য মন্দির এবং ছর্রার জৈন মন্দির রেখ দেউলের উদাহরণ।

জটিল ভদ্র দেউল স্থাপত্যের উদাহরণ নেই বললেই চলে। তবে বাংলাদেশের মহাস্থান, ময়নামতি ও পাহাড়পুরে খননে প্রাপ্ত মন্দিরের ভূমি নকশা থেকে ধারণা করা যায় যে এসব মন্দির হয়তো একসময় প্রচলিত ছিল। ময়নামতি এবং পাহাড়পুরে প্রাপ্ত ক্রুশাকার বা সর্বতোভদ্র মন্দিরের ভূমি নকশার সঙ্গে বার্মা, কম্বোডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মন্দিরের ভূমি নকশার মিল খুঁজে পাওয়া এবং ধারণা করা অসংগত হবে না এসব মন্দিরের স্থাপত্য নকশাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় প্রভাব বিস্তার করেছিল।

মহাস্থান দুর্গের দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লক্ষ্মীন্দরের মেঢ় মন্দিরটির অবস্থান। এটিও কক্ষ-ভূমির ওপর নির্মিত ক্রুশাকার মন্দিরের একটি চমৎকার উদাহরণ। কক্ষ-ভূমির কেন্দ্রে একটি অষ্টভুজাকৃতি ভূমির ওপর সম্ভবত নির্মিত হয়েছিল একটি স্তূপ, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সম্ভবত সেন আমলে এ অষ্টভুজকে বর্গাকৃতির রূপ দেয়া হয়।

মহাস্থান দুর্গের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। তাদের সবই হয় বর্গাকার অথবা আয়তাকার ভূমি নকশার ওপর নির্মিত ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্দিরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ পথের প্রমাণও পাওয়া যায়। বৈরাগী ভিটায় একটি মন্দিরের উত্তর বাহুতে তোরণেরও সন্ধান পাওয়া যায়। অনুমতি হয় যে এ মন্দিরগুলো এবং পরবর্তী সময়ে ময়নামতি ও পাহাড়পুরের মন্দিরগুলো মন্দির-প্রকারের প্রথম এবং দ্বিতীয় রীতির পরিচায়ক।

ময়নামতির মন্দিরগুলোকে ভূমি নকশা অনুযায়ী দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ১. সম্মুখে মণ্ডপসহ বর্গাকার কক্ষবিশিষ্ট ২. ক্রুশাকার নকশাবিশিষ্ট। চারপুত্র মূড়ায় প্রথম প্রকারের যে হিন্দু মন্দিরটি আবিষ্কৃত হয়েছে তা উত্তর ভারতীয় রীতির বলে ধারণা করা হয়। উল্লেখ্য ময়নামতির অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দির থেকে এর প্রকৃতি পৃথক। তবে মন্দিরের বৈশিষ্ট্যে প্রতীয়মান হয় যে উত্তর ভারতীয় রীতির সঙ্গে স্থানীয় খড়গ এবং দেব স্থাপত্যে পরিকল্পনার সংমিশ্রণে এ মন্দির স্থাপত্যের উত্পত্তি। তবে এটি একটি ব্রাহ্মণ্য মন্দির। মন্দিরটি পরবর্তী সময়ে সংস্কার হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। তাহলে এটা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে চারপত্র মুড়ার মন্দিরটি বৌদ্ধ ক্রুশাকৃতির মন্দিরের পরবর্তী সংস্করণ এবং বাংলাদেশে প্রাপ্ত হিন্দু মন্দিরের প্রথম উদাহরণ। ইটাখোলা মুড়ায় প্রাপ্ত সাত-আট শতকের মন্দিরটি প্রাক-ক্রশাকৃতির স্থাপত্য নকশার।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বাংলাদেশের পাহাড়পুর, বিহার ধাপ, মহাস্থান, রঘুরামপুরের চিত্রফলকে আমরা প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যশৈলীর রূপ এবং প্রকৃতি কী রূপ ছিল সে সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত লাভ করি। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত এবং বর্তমান বরেন্দ্র জাদুঘরে প্রদর্শিত একটি ফলকে মন্দির স্থাপত্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এটি সম্ভবত কোনো মন্দিরের সামনের অংশ। ফলকচিত্রটিতে পোর্চের সম্মুখভাগে দুটি স্তম্ভ রয়েছে, এ স্তম্ভদ্বয়ের ওপরে লিনটেল এবং এর উপরে মার্লনের মতো কারুকাজ পরিলক্ষিত হয়। চিত্রানুযায়ী স্তম্ভযুক্ত হলঘর পেরিয়ে সামনে এগুলেই পড়বে মন্দিরের প্রবেশদ্ধার, যার একটি কপাট খোলা এবং অন্যটি বন্ধ । যদিও ফলকটি পাল পর্বের, তথাপি এতে উত্কীর্ণ মন্দিরের গঠন প্রকৃতির সঙ্গে গুপ্ত মন্দিরের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। সাঁচী, জব্বলপুর প্রভৃতি মন্দিরে এ ধরনের স্তম্ভযুক্ত হলঘরসমৃদ্ধ পোর্চ রয়েছে। তবে যেহেতু বাংলাদেশে গুপ্ত পর্বের কোনো মন্দির স্থাপত্য আজ আর টিকে নেই, সেহেতু নিঃসংশয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। আর পালপর্বে তো আমরা পাহাড়পুরে ক্রুশাকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দিরে পাথরের স্তম্ভযুক্ত হলঘরের প্রমাণ পাই। স্তম্ভগুলোর ভিত্তিমূল উত্খননের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, আলোচ্য চিত্রফলকের স্তম্ভ দুটি সম্ভবত প্রস্তর স্তম্ভ, কারণ গুপ্ত যুগ থেকেই বাংলাদেশে প্রস্তর স্তম্ভের নিদর্শন পাওয়া যায় যেমন মহাস্থান জাদুঘরে প্রদর্শিত গুপ্তস্তম্ভ। মহাস্থান জাদুঘরে প্রদর্শিত একটি ফলকে স্তম্ভযুক্ত পোর্চ অথবা কোনো মন্দিরের সম্মুখদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। পাহাড়পুরের দুটি ফলকে আমরা পালপর্বের মন্দিরের আকার প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। একটি ফলকে বক্রাকৃতির ছাদ, অভিক্ষিপ্ত কার্নিশ এবং চূড়ায় আমলক সমৃদ্ধ মন্দির এবং অন্য ফলকচিত্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কেবল আমলকসমৃদ্ধ শিখর দৃশ্যমান। এ ফলকচিত্রগুলো কি রেখ বা শিখর দেউলের ইঙ্গিতবহ? এ রীতিতে গর্ভগৃহের চাল ঈষৎ বক্ররেখায় শিখরাকৃতি হয়ে সোজা উপরে উঠে গেছে। শিখরের উপরিভাগে থাকে আমলক ও চূড়া। এখানে উল্লেখ্য, পাল যুগের পুঁথিচিত্রেও এ শ্রেণীর মন্দির প্রতিকৃতি অংকিত রয়েছে। মুন্সিগঞ্জের রঘুরামপুরের একটি সিলমোহরে মন্দিরের প্রতিকৃতির নিচে বুদ্ধ ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় আসীন। আনুমানিক ১১ শতকের এ সিলমোহর থেকে আমরা তৎকালীন সময়ের মন্দির স্থাপত্যের যে রূপটি পাই সেটি হলো গর্ভগৃহের চালটি ক্রমহ্রাসমান পিরামিড আকৃতির হয়ে তিনটি ধাপে উপরে উঠে গেছে এবং সর্বোচ্চ স্তরের ওপর আমলক ও চূড়া। এ ধরনের মন্দির ভদ্র বা পীড় দেউল নামে পরিচিত। উপরোল্লিখিত ফলকচিত্র ছাড়াও মহাস্থানগড়ের গোবিন্দভিটার একটি ফলকে করবেল পদ্ধতির খিলান এবং ময়নমতির শালবন বিহারের ফলকচিত্রের খিলান পূর্বে উল্লিখিত মন্দির স্থাপত্যশৈলীতে হয়তো ব্যবহূত হতো করবেল পদ্ধতির খিলান যা প্রাক-মুসলিম পর্বের স্থাপত্যে ব্যাপক ব্যবহূত হতো। পরবর্তী সময়ে পাল সেন পর্বের কোনো মন্দিরস্থাপত্য এমন অবস্থায় টিকে নেই যার সাহায্যে ভূমি পরিকল্পনা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ স্থাপত্য চিত্র অংকন সম্ভব। অবশ্য এর অন্যতম কারণ এ  দেশের মাটির গঠন ও জলবায়ুর প্রকৃতি। কারণ এ আবহাওয়ায় এত শত বছরের পুরনো ইট নির্মিত বিহার মন্দিরের টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই পোড়ামাটির ফলকচিত্র, প্রস্তর ভাস্কর্যের পৃষ্ঠপট কিংবা পুঁথিই প্রাচীন বাংলার মন্দির স্থাপত্যের পূর্ণাঙ্গ রূপের একমাত্র উত্স। আমাদের আলোচ্য ফলকে উত্কীর্ণ চিত্র তৎকালীন বাংলায় সমৃদ্ধ মন্দির স্থাপত্যশৈলীর প্রমাণ বহন করে। তারানাথের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ধীমান ও বীতপাল নামক দুই শিল্পী পাল আমলে তাদের বহুমুখী প্রতিভার জন্য বিখ্যাত ছিলেন এবং ধারণা করা যায় যে তারা তৎকালে বাংলার স্থাপত্য নির্মাণে হয়তো বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। সুতরাং বলা যায় ফলকচিত্রে উত্কীর্ণ মন্দির কেবল শিল্পীর কল্পনা নয় বাস্তবেই হয়তো এগুলোর কোনো কোনোটি ধীমান বা বীতপাল কিংবা তাদের মতো কোনো স্থপতির হাতে মোহনীয় রূপ লাভ করেছিল।

স্থাপত্যকলার ইতিহাসে বাংলার বিহার মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সোমপুর কিংবা ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরের খ্যাতি বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলার চালা রীতির মন্দির স্থাপত্য তো পৃথিবীময় তার স্থাপত্য রীতি ছড়িয়ে দিয়ে বাংলোর স্থাপত্যে জন্ম দিয়েছে।

ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও