আলোকপাত

কৃষির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক অনুসন্ধান

বাংলা ভূখণ্ডে কৃষির তিন হাজার বছরের যাত্রা নিয়ে বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। ২০০২ সালের ওই জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মতো বাংলা ভূখণ্ডের অধিবাসীরাও ছিল যাযাবর। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে যখন পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তখন মানুষ বুঝতে পারে, স্থায়ী বসতি নিজেদের ও গবাদিপশুর জন্য আরামপ্রদ। এ পরিপ্রেক্ষিতে

বাংলা ভূখণ্ডে কৃষির তিন হাজার বছরের যাত্রা নিয়ে বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। ২০০২ সালের ওই জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মতো বাংলা ভূখণ্ডের অধিবাসীরাও ছিল যাযাবর। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে যখন পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তখন মানুষ বুঝতে পারে, স্থায়ী বসতি নিজেদের ও গবাদিপশুর জন্য আরামপ্রদ। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিকাজ ও পশুপালনকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল, কারণ এটি শুধু নিরাপত্তাই প্রদান করে না, বরং খাদ্য সংস্থানের স্থিতিশীল উৎসও তৈরি করে। এতে বন্য প্রাণীতে ভরপুর আশপাশের বনাঞ্চলে খাদ্য অনুসন্ধানের সমস্যা থেকেও মানুষকে রেহাই দিয়েছিল। এতে প্রাচীন বাংলায় মানুষ কেবল কৃষিকাজই নয়, পশুপালনও শুরু করে। বাংলা একাডেমির ওই গবেষণা কাজে আমিও যুক্ত ছিলাম। তখন আমি ‘‌এন্থলজি অব বেঙ্গলি প্রোভার্বস অ্যান্ড বচনস’ সংকলন করছিলাম। বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ওই সংকলনে আমি দেখিয়েছি কীভাবে এসব প্রবাদ সাংস্কৃতিক রূপান্তরে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রভাব ফেলেছিল। বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলায় এসব প্রবাদ-প্রবচনের সংশ্লেষ হয়েছিল। 

এর মধ্যে খনাও ছিলেন, যিনি এখনো বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশে তার কৃষি সম্পর্কিত প্রবাদের জন্য স্মরণীয়। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমার বাবা-মা খনার বচনের প্রতি আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিলেন। 

যা-ই হোক, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু বাংলার সংস্কৃতি ও কৃষিক্ষেত্রে অসাধারণ গুরুত্বের কথা প্রকাশ করেন, যখন তিনি বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় কৃষিক্ষেত্রে তার অবদানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। কৃষি সম্পর্কে তার এ ধারণাই আমাকে আমাদের কৃষি ঐতিহ্য বুঝতে সহায়তা করেছিল। 

কৃষি গবেষণায় আবিষ্কৃত হয় যে প্রাচীন বাংলায় মানুষ কেবল গোষ্ঠী হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করতে শেখেনি, বরং প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়াতেও শিখেছিল। উন্নত কৃষির জন্য আরো উপযুক্ত নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের পদক্ষেপ ধীরে ধীরে এগিয়েছে। এর সঙ্গে জমির মালিকানা এবং পেশাদার কৃষকদের ধারণা আসে, তারপর বিভিন্ন পেশাদার গোষ্ঠীর ব্যবহারিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর করে সমাজকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয় এবং এর সঙ্গে শ্রেণী পার্থক্য ও দ্বন্দ্বও আসে। 

এটাও স্পষ্ট যে বেদগুলোয় কৃষির প্রভাব ছিল। ঋগ্বেদে ইন্দ্রের বিভিন্ন প্রার্থনায় কৃষির উল্লেখ রয়েছে যে গৃহপালিত পশুদের দেখাশোনা এবং এ প্রাণীদের বাঘের শিকার হতে রক্ষা করতে সাহায্য করত। অথর্ববেদ ও চতুর্বেদেও কৃষির অনুরূপ বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

কৃষি সরঞ্জামগুলোর প্রতি অত্যন্ত সম্ভ্রম প্রকাশ করা হতো। কবিতায় বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতির সংরক্ষণকারীকে বিশেষ প্রশংসা ও উপাধি দেয়া হতো। লাঙলের সঙ্গে কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরামের সম্পর্ক প্রকাশ করা হয়। একইভাবে বিশ্বামিত্র ও পরাশর মুনিও কৃষক ছিলেন। এখানে মনে রাখা দরকার, পরাশরকে কৃষির প্রাচীন রূপ এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক উক্তিগুলো পদ্ধতিগত ও সুসংহতভাবে সংগ্রহের কৃতিত্ব দেয়া হয়। (লাহিড়ি, দুর্গাদাস: পৃথিবীর ইতিহাস, খণ্ড ৫)। 

এখানে লক্ষণীয় যে সংগ্রহগুলো একত্র করার সময় পরাশর বলেছিলেন, কখনই তেল, লবণ বা কোনো আগুনের কাছে কোনো ধরনের বীজ সংরক্ষণ করা উচিত নয়। তিনি আরো বলেছেন, অভিজ্ঞ কৃষক ক্ষেতে ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারেন এবং আবার অনভিজ্ঞ কৃষক দরিদ্রও হতে পারেন। মাটির উর্বরতা বাড়াতে পশুর বর্জ্য এবং অন্য জিনিসগুলোকে সার হিসেবে ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।

আর্যদের আগমনের আগেই ওপরের পর্যবেক্ষণগুলো ভারতে কৃষির নীতিগুলো প্রাচীন ও বর্তমান ছিল। নৃতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুসারে, যখন আর্যরা এ দেশে আসে, তখন তারা কখনো কখনো ব্যবস্থাটিকে পরিবর্তন করে এবং কখনো কখনো কৃষির প্রযুক্তিগত দিকগুলোও উন্নত করে। 

বাংলার মানুষ কখন তাদের কৃষি পেশা শুরু করেছিল তা নির্ধারণ করতে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক নথি খুঁজে পাওয়া কঠিন। যা-ই হোক, এটা পরিষ্কার যে কৃষি ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিকশিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৪টি পরগনায় বিভিন্ন খননকাজ চালানো হয়। মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূমে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ-কৃষিজ্ঞানে সমৃদ্ধ বর্তমান সভ্যতাও তা স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। (The Eas tern Anthropologis t, Vol. 31, No.4, 1978, pp. 543-555)

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। বাংলার বিপুল জনসংখ্যার অনুকূল পরিস্থিতি কৃষিকাজকে সম্ভবত সহজতর করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে বাংলার এ উর্বর ভূমিটি বিভিন্ন উপজাতি ও জাতিগত গোষ্ঠীকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাংলায় অভিবাসনের জন্য উৎসাহিত করেছিল। পাশাপাশি এ ধরনের অভিবাসন কৃষির নীতি এবং কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রবাদগুলোর ওপর বিভিন্ন প্রভাব ফেলে। 

সাঁওতাল উপভাষা থেকে বাংলা ভাষায় কৃষিপণ্য ও মসলার বিভিন্ন নামও প্রবেশ করেছে। একইভাবে, গোলমরিচ, কমলা ও কর্পাসের মতো শব্দগুলোও বাংলায় প্রবেশ করেছে। 

বাংলার কিছু অঞ্চলে কিছু কৃষিপণ্যের প্রাধান্য ছিল। এ কারণে এসব অঞ্চলের নামকরণও হয়েছে সেসব কৃষিপণ্যের নামানুসারে। এর মধ্যে উত্তর বাংলার প্রাচীন নাম পুণ্ড্র, যার অর্থ ইক্ষু (এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ইক্ষু জন্মাত)। প্রাচীন বাংলার গৌড় অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে গুড় উৎপাদন হতো, তাই এ অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘গৌড়’। 

পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ে খননকাজ শেষে নারকেল, সুপারি এবং তাল গাছের একটি সমৃদ্ধ কৃষি পদ্ধতির টেরাকোটা নমুনা পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে মৌর্য ও কুষাণ আমলের বিভিন্ন মুদ্রাও পাওয়া গেছে। একইভাবে সেখানে সরিষা ও বিভিন্ন ধরনের ডালের চাষ এবং সেচের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাংলায় কৃষি ও ধান চাষের বিশেষ গুরুত্বের বিষয়টি হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘‌দুর্গা পূজা’-তে স্পষ্ট। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে ‘‌দুর্গা’ ছিলেন হিন্দু দেবতা শিবের স্ত্রী, যাকে কৃষির দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দুর্গাকে ‘অন্নদাতা’ বা ‘খাদ্য সরবরাহকারী’ হিসেবেও মনে করা হতো। 

প্রকৃতপক্ষে কিছু ইতিহাসবিদ বলেছেন, বাংলায় প্রাচীন আমলে কৃষির সঙ্গে ধর্ম সম্পৃক্ত ছিল। কিছু ইতিহাসবিদ আরো বলেছেন, প্রাচীন বাংলায় দেবতাদের প্রতি ভালোবাসা ছিল, কারণ মনে করা হতো, ভালো ফসল এবং ফলস্বরূপ আরো বেশি খাদ্যশস্য পেতে দেবতাদের শান্ত হওয়া প্রয়োজন। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল অংশে বসবাসরত উপজাতিদের মধ্যে এ বিশ্বাস এখনো বিদ্যমান আছে। 

কখনো কখনো আজও আমরা এমন আচার-অনুষ্ঠানের মুখোমুখি হই যেখানে জমি চাষ শুরু করার আগে দেব-দেবীদের কাছে ধান, দূর্বা ঘাস এবং হলুদের মতো অর্চনা দেয়া হয় (Gilbert Slatter, “The Dravidian Element in Indian Culture”  New Delhi, 1978)।  আকর্ষণীয়ভাবে উল্লেখ করা হয় যে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার কিছু অংশে লক্ষ্মী ও শিব কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। একইভাবে পার্বত্য অঞ্চলে ‘‌ঝুম’ চাষ পদ্ধতিতে উপজাতি জনগোষ্ঠী প্রায়ই ফসল রোপণের আগে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করত। তারা ষাঁড় ও লাঙল ব্যবহার করত না, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধারালো লাঠি দিয়ে মাটিতে গর্ত করত। তাদের চাষবাদের ধরন ছিল অপূর্ণাঙ্গ এবং ফলস্বরূপ তারা খুব কম ফসল পেত। 

প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি সংস্কৃতি কৃষির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল—বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশা ছিল কৃষি, যাদের অধিকাংশই গ্রামে বসবাস করত। 

ফলস্বরূপ গ্রামীণ জনমানুষের মনন ও জীবন দর্শন আবর্তিত হয়েছে প্রকৃতি, ঋতু পরিবর্তন ও কৃষিকে ঘিরে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আদিকালে বাংলার কৃষি পণ্য বলতে বুঝাত ধান, তুলা, নারকেল, সুপারি এবং কলার মতো সাধারণ ফসলাদি।  

উপরন্তু গবেষকরা পাট চাষের উল্লেখও পেয়েছেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে শুধু দড়ি তৈরির জন্যই নয়, বোনা পোশাকের জন্যও ব্যবহার হয়ে আসছে। আর পাটকাঠি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো। শেষ করার আগে অবশ্যই লক্ষ করা দরকার, খনার বচন বা উক্তি প্রায় ৮০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল, যখন কৃষি ও দুগ্ধ চাষ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত হতো। এটাও স্পষ্ট যে সেই সময়ে চাল ও কলা উভয়ই দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে খনার প্রবাদে বহুবার বিভিন্ন ধরনের লাউ চাষ, বেগুন, কুমড়ো, মরিচ, গাজর জাতীয় সবজি, মুলা এবং কড়াইশুঁটির উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু টমেটোর উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আম ও কাঁঠালকে খনা বিশেষভাবে দুটি সর্বাধিক প্রচলিত পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

খনা তার বচনগুলোয় নির্দিষ্ট প্রকারের গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, গরু, ষাঁড়, ছাগল, হাঁস ও কবুতরের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা অর্থনৈতিক জীবিকা সম্পর্কিত বিষয়গুলোয় বিশেষভাবে জড়িত। মজার বিষয় হচ্ছে, মহিষ, হাতি, ঘোড়া ও কুকুরের মাত্র কয়েকটি নাম উল্লেখ রয়েছে। খনার ওপর পিএইচডি করা অধ্যাপক ড. আলি নওয়াজের মত ছিল এমন, সম্ভবত মুরগি তখনো গৃহপালিত হয়নি, সে কারণে খনার বচনে মুরগির নাম আসেনি। যা-ই হোক, এসব বিষয়ে কিছু অন্য কৃষি ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতের অমিল রয়েছে। 

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত; পররাষ্ট্র, তথ্য অধিকার ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়াদির বিশ্লেষক

আরও