ভূরাজনীতি

ইরান যুদ্ধ খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে বিশ্বকে কী শিক্ষা দিল

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সালফার এবং সার পরিবহন পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ফলে কৃষিপণ্যের বাজারের ওপর চাপ কমবে এবং বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা আরো গভীর সংকটে পড়ার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। তবে প্রণালিটি খোলা থাকলে এ সমঝোতা তাৎক্ষণিক ধাক্কার তীব্রতা কমাতে পারে বটে, কিন্তু গত চার মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি মুছে দিতে পারে না—সারের সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সমঝোতা স্মারকটি নিজেই কতটা কার্যকর হবে কিংবা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে—এসব নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমলেও দেশগুলোর উচিত পরবর্তী ধাক্কার আগেই নিজেদের সক্ষমতা ও সহনশীলতা বাড়িয়ে নেয়া। প্রশ্নটি এখন এমন নয় যে ভবিষ্যতে আবার কোনো বিঘ্ন ঘটবে কিনা; বরং প্রশ্ন হলো, সেটি ঘটলে আমরা কি এবার আরো ভালোভাবে প্রস্তুত থাকব?

গত পাঁচ বছরে কৃষি খাত একের পর এক সংকট মোকাবেলা করেছে—কভিড-১৯ মহামারী, যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ। প্রতিটি সংকটই সরবরাহশৃঙ্খল, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং কৃষি উৎপাদনের দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে। তবে খুব কম সংকটই পরবর্তী বিপর্যয়ের আগে সেই দুর্বলতাগুলো দূর করার এমন স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি থেকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে শিক্ষা পাওয়া গেছে তা হলো, আমরা ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিইনি। সার সরবরাহে বিঘ্নের ঝুঁকি বহুদিন ধরেই পরিচিত ছিল। তবুও বৈশ্বিক কৃষি খাত এ সংকটে প্রবেশ করে সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে, আর গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণের জন্য কোনো সমন্বিত আন্তর্জাতিক মজুদ ব্যবস্থাও ছিল না।

ফলে এমন একটি জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট সারের ২০-৩০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সালফার রফতানির প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবাহিত হয়, সেটিই একাধিক মহাদেশের উৎপাদকদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। যখন এ প্রবাহ ব্যাহত হলো, তখন বাজার স্থিতিশীল রাখার মতো কার্যকর কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না, আবার হারিয়ে যাওয়া সরবরাহ দ্রুত পূরণ করার মতো বিকল্প উৎসও ছিল না।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য রফতানিকারক অঞ্চল লাতিন আমেরিকায় কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে আমদানি করা সারের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে আফ্রিকার বহু দেশে যেখানে সারের ব্যবহার এমনিতেই কম, সেখানে সামান্য বিঘ্নও উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণের সরবরাহশৃঙ্খল কতটা কেন্দ্রীভূত এবং কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

বিরূপ পরিস্থিতিতে সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু বাণিজ্য পুনরুদ্ধার করলেই হবে না। কৌশলগত মজুদ, উন্নত সংরক্ষণ সক্ষমতা, বহুমুখী বাণিজ্য করিডোর এবং আরো শক্তিশালী পরিবহন ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং সংকটের সময় সরকারগুলো আরো নমনীয়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর উচিত এসব বিনিয়োগে সহায়তা করা, বিশেষ করে যেসব দেশ এরই মধ্যে ঋণের চাপ ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সংকটে রয়েছে।

এ ধাক্কা জ্বালানি ও কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও স্পষ্ট করেছে। বহু উন্নয়নশীল দেশে এখনো কোটি কোটি সেচপাম্প, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষিযন্ত্র ডিজেলচালিত। ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে তা দ্রুত কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষির ওপর জ্বালানি সংকটের প্রভাব কমানো গেলে শুধু সহনশীলতাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়বে।

তবে শেষ পর্যন্ত সহনশীলতা নির্ভর করে শুধু সার সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর নয়, বরং সেই সার কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপরও। সবচেয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা সেই নয়, যেখানে সবচেয়ে বেশি সার ব্যবহার করা হয়; বরং সেটিই, যেখানে সঠিক পুষ্টি উপাদান, সঠিক স্থানে, সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়।

এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সারের দাম কমে যাওয়া সবসময় সুসংবাদ নয়। সম্প্রতি ইউরিয়ার দাম কমার পেছনে আংশিক কারণ ছিল চাহিদা হ্রাস। অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক সার কেনা বিলম্বিত করেছেন কিংবা প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে স্বল্পমেয়াদে দাম কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু এটি প্রায়ই পুষ্টি উপাদানের ব্যবহার কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যার ফল ভবিষ্যতে ফলন কমে যাওয়া এবং খাদ্য সরবরাহ আরো সংকুচিত হওয়া।

তাই ভবিষ্যতের সার নিরাপত্তা হয়তো আরো বেশি ব্যবহারের ওপর নয়, বরং আমাদের পায়ের নিচের মাটিকে আরো ভালোভাবে বোঝার ওপর নির্ভর করবে। মাটির মানচিত্র তৈরি, নির্ভুল পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত কৃষি পদ্ধতিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষকরা ফসল ও মাটির প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার ব্যবহার করতে পারবেন। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতাও কমবে।

তথ্যকে কৃষি অবকাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সরকার ও বেসরকারি খাতের উচিত যৌথভাবে এমন অভিন্ন মানদণ্ড ও তথ্যভিত্তিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলা, যাতে মাটিসংক্রান্ত তথ্য বৈশ্বিক জনসম্পদে পরিণত হয়।

সংকটের সময় প্রায়ই একটি মাত্র সমাধান খোঁজার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু কৃষি খাতে সাধারণত একক কোনো সমাধান নেই। সবুজ অ্যামোনিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সার উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে পারে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এখনো এর ব্যয় প্রচলিত অ্যামোনিয়ার তুলনায় অনেক বেশি এবং বৃহৎ পরিসরে এর ব্যবহার শুরু হতে আরো কয়েক বছর সময় লাগবে।

একই সঙ্গে উদ্ভাবনী তহবিল ও গবেষণা বিনিয়োগের মাধ্যমে বিকল্প সার, বায়ো-স্টিমুল্যান্ট, উপকারী অণুজীব, উন্নত ফসলের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পুষ্টি ব্যবহারের দক্ষতা ও মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নকারী প্রযুক্তির বিকাশে সহায়তা করা উচিত। কার্যকর সার কৌশল অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে

হবে এবং এতে কৃত্রিম সারের পাশাপাশি উন্নত মাটি ব্যবস্থাপনা ও জৈবিক সমাধানের সমন্বয় থাকতে হবে।

সবশেষে সহনশীলতার মূল অর্থ হলো পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেলে বিকল্প পথ খোলা রাখা। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, বাজার পর্যবেক্ষণ, কৃষি বীমা এবং আগাম প্রস্তুতিমূলক কর্মপরিকল্পনা সরকারগুলোকে সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ দেয়। পরবর্তী ধাক্কা ভূরাজনীতি, জলবায়ুর পরিবর্তন কিংবা জ্বালানি বাজার—যেখান থেকেই আসুক না কেন, এসব বিনিয়োগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত ফল যা-ই হোক না কেন, হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট বিঘ্নের অর্থনৈতিক প্রভাব জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার অনেক পর পর্যন্ত বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থায় অনুভূত হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে সমন্বয়ের প্রভাব বাজারে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৬ সালজুড়েই কৃষকরা কম মুনাফা এবং আয় হ্রাসের মুখোমুখি হতে পারেন।

সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, কৃষিসংক্রান্ত তথ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, সরবরাহশৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করা এবং আরো স্থিতিস্থাপক সার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ সংকট যেসব দুর্বলতা উন্মোচন করেছে, সেগুলো সংকট শুরুর আগেই আমাদের জানা ছিল। সংকট শেষ হওয়ার পরও সেগুলো আর অমীমাংসিত থেকে যাওয়া উচিত নয়।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

ম্যাক্সিমো তোরেরো: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ

ইংরেজি থেকে অনূদিত

আরও