কভিড- ১৯

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সবুজ ও টেকসই হওয়া চাই

করোনাযুদ্ধের মাঝেই বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারকদের করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। আগের যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দার থেকে বর্তমান ও আগত মন্দা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। সব পূর্বাভাস বলছে, আগত অর্থনৈতিক মন্দা ১৯৩০-এর বিশ্বমন্দাকে হার মানাবে। বস্তুত সে তুলনাও গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। ১৯২৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩০ দশকের বিশ্বমন্দার প্রভাব পৃথিবীকে গ্রাস করতে সময় নিয়েছে এক থেকে তিন বছর। সেখানে করোনা পরিস্থিতিতে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সারা বিশ্ব মারাত্মক মন্দায় পতিত হয়েছে বা হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হলে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় হয়তোবা স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবে নাগাদ করোনা পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হবে? এ অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। এছাড়া করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কি একটি টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাব, নাকি গতানুগতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখব?

করোনাযুদ্ধের মাঝেই বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারকদের করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। আগের যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দার থেকে বর্তমান ও আগত মন্দা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। সব পূর্বাভাস বলছে, আগত অর্থনৈতিক মন্দা ১৯৩০-এর বিশ্বমন্দাকে হার মানাবে। বস্তুত সে তুলনাও গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। ১৯২৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩০ দশকের বিশ্বমন্দার প্রভাব পৃথিবীকে গ্রাস করতে সময় নিয়েছে এক থেকে তিন বছর। সেখানে করোনা পরিস্থিতিতে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সারা বিশ্ব মারাত্মক মন্দায় পতিত হয়েছে বা হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হলে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় হয়তোবা স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবে নাগাদ করোনা পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হবে? এ অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। এছাড়া করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কি একটি টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাব, নাকি গতানুগতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখব?

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পদ্ধতি ও প্রস্তুতি আলোচিত হচ্ছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় পরিবেশ ঝুঁকি যথার্থ কারণেই আলোচনায় উঠে আসছে। বর্তমান উন্নয়নের ধারা ও পদ্ধতি যে পুরোপুরি টেকসই নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না, শুধু করোনা পরিস্থিতি আবার তা  জোরালো ভাষায় মানবজাতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বারবার বিভিন্ন ধরনের মহামারী আমাদের উন্নয়নের ধারা ব্যাহত করছে, শিক্ষা দিতে চেয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত বারবারই আমরা পরিবেশ ও প্রকৃতিকে বিপর্যয়ের মাঝে ঠেলে দিয়ে গতানুগতিক আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের ধারায় মনোনিবেশ করেছি। অর্থনীতির এবারের বিপর্যয় কি সে ধারায় পরিবর্তন আনতে পারবে?

বিশ্বব্যাপী মানবজাতির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পদ্ধতির সঙ্গে প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ, প্রসার এবং বারবার ফিরে আসার সম্পৃক্ততা আছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমরা নির্দিষ্ট কিছু পশু-পাখির জন্ম ও বিস্তারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছি, আবার হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির প্রাণী ও গাছপালা। মানুষের গতিবিধি চলাফেরা আর যাতায়াত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পশু-পাখিরও বিশ্বব্যাপী পরিবহন বেড়েছে।

বিভিন্ন দেশের ও সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বব্যাপী স্থানান্তর হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী অবাধ চলাচলের রাস্তা প্রসারিত এবং নিয়মকানুন সহজ থেকে সহজতর হয়েছে। আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের অসংখ্য প্রকল্প বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে এনেছে। ‘ডব্লিউএইচও’-এর ওয়েবসাইটে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জনতাত্ত্বিক, পরিবেশগত, সামাজিক, প্রযুক্তিগত এবং মানবজাতির জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সংক্রামক রোগ-জীবাণুুর বিস্তৃতি ও প্রসারের সম্পর্ক আছে। যেমন ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগের বিস্তারের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকৃত ছোট-বড় জলাশয়গুলো মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে। উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রেই মানবজাতি প্রকৃতির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটাই বিন্যস্ত করে ফেলেছি আমরা। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হয়েছে মানবজাতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে।

‘জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুড’, ‘ক্লোনিং’—এসব হয়তো উন্নয়নের নতুন দিকনির্দেশনা দিতে শুরু করেছে আর এসবের উপকারও অস্বীকার করা যায় না। তবে এর মধ্য দিয়ে কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে মানবজাতি। এর দুই রকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়—ভয় এবং আশা। একটি পক্ষ মনে করে, এটা অত্যন্ত ভয়ের, এর মাধ্যমে আমরা আসলে সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ করছি, তার নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করছি। আরেক পক্ষ মনে করে, এগুলো বড় ধরনের সফলতা এবং এর মাধ্যমে মানবজাতি প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হবে এবং মানবজাতির অধিক কল্যাণ সাধিত হবে।

‘End of the Nature’—১৯৭০ সালের মানবজাতির প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণের ওপর লেখা একটি বিখ্যাত গ্রন্থে লেখক যথার্থই বলেছেন, হয়তো প্রকৃতি বা পৃথিবী ধ্বংস হবে না, সূর্যও উঠবে, বৃষ্টিও হবে, তবে আগের মতো নয়। এ এক রূপান্তরিত প্রকৃতি, যেখানে মানবজাতির হস্তক্ষেপের প্রতিফলন স্পষ্ট।

‘বন্যরা বনে সুন্দর’ আমরা পড়েছি, জেনেছি; তবে মানিনি। প্রকৃতির মাঝে নয়, বরং আমাদের মাঝে জন্ম ও বড় হতে অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য করেছি পশু-পাখিদের। আজ আমরা দেখছি পশু-পাখির সংস্পর্শ থেকে অনেক রোগজীবাণুর বিস্তৃতি হয়েছে মানুষের মাঝে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর তথ্য অনুসারে, চার ভাগের তিন ভাগ সংক্রামক রোগের সূত্র মানুষ ও পশু-পাখির সংস্পর্শ।

প্রকৃতি বারবার শিক্ষা দিতে চেয়েছে মানবজাতিকে। আশাবাদীরা মনে করেন, করোনা-পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ধারা পরিবর্তিত হবে এবং আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখে নতুন বিশ্ব গড়ব, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেব। তবে হতাশাবাদীদের দল ভারী, যারা মনে করেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা এ সময়ের উৎপাদনের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য নতুন উদ্যোগে উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করব যথারীতি প্রকৃতির নিয়মের অগ্রাহ্য এবং পরিবেশের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের প্রমাণাদি অবশ্য হতাশাবাদীদের পক্ষেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতি আমাদের তাত্ক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে। যেমন ১৯৫৮ সালে চীনের ‘পাখিবিরুদ্ধ প্রচারণা’ বা ‘স্প্যারো ক্যাম্পেইন’ ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনলেও মানবজাতিকে প্রকৃতি ও পরিবেশবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত করতে পারেনি।

১৯৫৮ সালে তত্কালীন চীনের সাম্যবাদী সরকার কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ করে এবং এর আওতায় ফসলের জন্য ক্ষতিকারক (যা প্রকৃতপক্ষে নয়) একটি অত্যন্ত প্রকৃতি নিয়মবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত ও প্রচারণা শুরু করে, যা ইতিহাসে স্প্যারো ক্যাম্পেইন নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে চীনে নিষ্ঠুরভাবে অসংখ্য পাখি মেরে ফেলা হয়। পাখি মারাকে উৎসাহিত করার জন্য এ সময় পাখিগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু এবং সাম্যবাদের শত্রু হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। পাখি নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে চীনে প্রকৃতির ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। পরবর্তী তিন বছরে চীন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে পতিত হয়। বলা হয়, দেড় থেকে সাড়ে চার কোটি মানুষ এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে  আনতে এ সময়ে চীন সরকারকে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার পাখি আমদানি করতে হয়েছিল। এ ধরনের অনেক ঘটনা বারবার আমাদের শিক্ষা দিতে চেয়েছে। শিক্ষা প্রকৃতি ও পরিবেশের নিয়মতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার। শিক্ষা প্রকৃতি ও ভারসাম্য রক্ষার।

করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশলের জন্য অবশ্যই বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যের উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের যথাযথ প্রথা থেকে সরে আসতে হবে। পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। বায়ু ও পানিদূষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানবজাতিকে রক্ষায় এক হয়ে কাজ করতে হবে। পুনরুদ্ধার কৌশলের অংশ হিসেবেই শুরু হতে পারে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করে উন্নয়ন কৌশলের যাত্রা।

সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমাদের। প্রথমত, প্রকৃতি ও পরিবেশের সামঞ্জস্য রক্ষা করে আমরা এই স্বনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ছায়ায় জীবনকে সুন্দর করতে পারি। সেক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ও সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ মানবজাতির জন্য রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়বে। অথবা দ্বিতীয়ত, প্রকৃতি ও পরিবেশের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের গতানুগতিক লড়াই চালিয়ে যেতে পারি এবং বারবার প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিশোধের ও প্রাণঘাতী রোগজীবাণুর মুখোমুখি হতে পারি। সেক্ষেত্রে এ রকম আরো অনেক ভয়ংকর করোনা হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।

গতানুগতিক উন্নয়নের ধারায় আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রকৃতি ও পরিবেশের বিরূদ্ধাচরণ করে চলেছি। এজন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। আর যদি প্রথম বিকল্প অর্থাৎ পরিবর্তনের কথা ভাবতে হয়, প্রকৃতি ও পরিবেশের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য কাজ করতে হয় এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে টেকসই ও সবুজ পুনরুদ্ধারের কৌশলের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়, তাহলে তা হতে হবে সমন্বিত ও সম্মিলিত প্রয়াস। সেক্ষেত্রে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিশ্বের সম্মিলিত প্রয়াসে সংযুক্ত হয়ে করোনার মতো প্রাণঘাতী রোগজীবাণুর সঙ্গে মানবজাতিকে রক্ষার প্রচেষ্টায় কাজ করবে।

 

ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ও পরিচালক প্রশিক্ষণ

আরও