অভিমত

আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে

(পূর্ব প্রকাশের পর) তিন: আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন (২০২০-২১) থেকেই শুরু হোক গণতন্ত্রের নবতর অভিযাত্রা নতুন এক প্রেক্ষাপটে ২০২০-২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং সময় সময় উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে বর্তমান

(পূর্ব প্রকাশের পর)

 

তিন: আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন (২০২০-২১) থেকেই শুরু হোক গণতন্ত্রের নবতর অভিযাত্রা

নতুন এক প্রেক্ষাপটে ২০২০-২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং সময় সময় উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে এবং গঠিত হবে নতুন কমিশন। সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ে। বিশেষত ভোটারদের সঙ্গে কাউন্সিলর ও মেম্বারদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার কারণে এ দুই স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে।

১. নির্বাচনকালীন স্থানীয় প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনকে গ্রহণ করতে হবে। এটি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক অধিকার এবং দায়িত্ব। তাই নির্বাচনী আইন ও সব আচরণবিধি অক্ষরে অক্ষরে পালন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যত্যয় ঘটলে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যার ক্ষেত্রে যেটি প্রযোজ্য, তা বহাল ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষক দল নিয়োগ করে প্রতিদিনের রিপোর্ট নিয়ে তা পর্যালোচনাপূর্বক বিধি ভঙ্গের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ পর্যবেক্ষক দলে পর্যাপ্ত ক্যামেরা থাকবে এবং প্রতি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৩. ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ। এ নির্বাচনে ১২৮ জন মতান্তরে ১৪০ জন লোক নিহত এবং প্রায় কয়েক হাজার লোক হতাহত হয়। ২০২০-২১-এর নির্বাচনে হিংসা ও সন্ত্রাস দমনের পূর্ণ ও পূর্বপ্রস্তুতি আবশ্যক। 

৪. ইভিএম মেশিনে পেপার ট্রেল যুক্ত করে ভোট পুনর্গণনার সুযোগ রাখতে হবে। ভোটকেন্দ্রে অযাচিত ব্যক্তির আনাগোনা বন্ধ করতে হবে। ইভিএমের সামনে ভোটার ও পোলিং কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ থাকার কথা নয়।

৫. পর্যবেক্ষক দল প্রতিদিনের প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয়ভাবে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেট দুই কর্তৃপক্ষ বরাবর দাখিল করবে। অন্য বেসরকারি পর্যবেক্ষকের সংস্থাগুলোকেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আহ্বান করা হোক এবং ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ নির্বিঘ্ন করা হোক।

৬. তফসিল ঘোষণার আগে বা সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি, নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিকার পাওয়ার অভিযোগ দাখিল, এজেন্ট নিয়োগের বাধ্যবাধকতা ও অন্যান্য নিয়ম-পদ্ধতি বিষয়ে প্রার্থীদের জন্য একদিনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কমিশন করতে পারে।

৭. নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব নিবন্ধিত দলের জন্যও পৃথক অবহিতকরণ কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।

৮. নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রেস কনফারেন্স করতে দল ও প্রার্থীরা যত পারদর্শী, তারা আইনগতভাবে অভিযোগ করে প্রতিকার চাওয়ার বিষয়ে নিস্পৃহ ও অমনোযোগী। এ-জাতীয় প্রতিবাদ তখনই অর্থবহ হবে যখন তা আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি করা হবে। তাছাড়া মামলা না হওয়ার কারণে অনিয়মগুলো যথাযথ রেকর্ড হচ্ছে না।

৯. প্রতিটি রাজনৈতিক দল, যারা ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও আইনানুগ করতে আগ্রহী হবে, তাদের জন্য নির্বাচনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে দৃঢ় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। এজন্য প্রতিটি দলকে নির্বাচনকালীন জেলাভিত্তিক ‘আইন সহায়তাকারী টিম’ নির্বাচনের আগে নিয়োগ করতে হবে। নির্বাচনী বিরোধসংক্রান্ত মামলা লড়ার দায় শুধু প্রার্থীর হবে না। দলকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য দলের একটি ‘আইন সহায়তা তহবিল’ও গঠন করা প্রয়োজন।

১০. সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের আইনি সহায়তা দান নির্বাচন কমিশনেরও একটি দায়। নির্বাচন কমিশন যেসব অভিযোগ পাবে, তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে মামলা পরিচালনায় প্রার্থীকে কমিশনের আইনি সহায়তা দেয়া উচিত। আদালত যেসব মামলা গ্রহণ করবেন, সেসব মামলায় নির্বাচন কমিশন প্রার্থীকে আইনি সহায়তা অবশ্যই দেবেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ যারা করবেন, তাদেরকে নির্বাচনী মামলায় প্রয়োজনে সাক্ষ্য দিতে হবে।

১১. নির্বাচনে অনিয়মের ঢালাও অভিযোগ থাকলেও আদালতে মামলার সংখ্যা খুবই নগণ্য। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হবে আইনের আশ্রয়। আইনি প্রতিকার ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হলেও এর উন্নত বা ভালো বিকল্প নেই।

১২. নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ড যথা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, নির্বাচন শিক্ষা ও সচেতনতা, নির্বাচন বিশ্লেষণ ও গবেষণা প্রভৃতি কাজে নিয়োজিত নাগরিক সংগঠন, একডেমিক ব্যক্তি ও সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম সবার সক্রিয়তা আবশ্যক। গণমাধ্যম ছাড়া অন্যদের সম্পৃক্ততা অনেক কমে গেছে। সবার সম্পৃক্ততা পুনরায় বৃদ্ধি করা দরকার।

১৩. নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা অনিয়মের প্রতিবেদনগুলোকে সূত্র হিসেবে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এটি নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে সহায়তা করবে। গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের অংশ হতে পারে।

১৪. স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনকে অর্থবহ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারবিষয়ক আইন ও সাংগঠনিক কাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে সীমাবদ্ধতাগুলো কাটানোর লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নানামুখী সংস্কার প্রয়োজন। এরই মধ্যে অনেক সংস্কার প্রস্তাব নানা মহল থেকে করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করে দেখতে পারে। প্রস্তাবগুলো সরকারের বিবেচনার জন্য সুপারিশ আকারে পেশ করার জন্য সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করতে পারে। সে কমিটি সরকারকে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য করে সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করতে পারে।

চার. স্থানীয় সরকারের সংস্কার প্রসঙ্গ: সব নির্বাচন একটি একক তফসিলে করা সম্ভব

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নানা কারণে জটিল, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বর্তমান স্থানীয় সরকার কাঠামো গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাচর্চার অনুকূল না হওয়ায় একদিকে যোগ্য নেতৃত্ব বিকাশে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাচর্চায় থাকছে না যুগোপযোগী ভারসাম্য। প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ছে এক ব্যক্তি তথা চেয়ারম্যান বা মেয়রসর্বস্ব এবং আমলা নিয়ন্ত্রণ দিন দিন বাড়ছে। মেয়র ও চেয়ারম্যান নির্বাচন অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল। সদস্য ও কাউন্সিলর নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে গুরুত্বহীন। তাই আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে সংস্কার করে নির্বাচন পদ্ধতির সহজীকরণ এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গভীর মনোযোগ দাবি করে।

আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় সরকার উভয়ের মেয়াদকাল পাঁচ বছর। জাতীয় সরকারের নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পর একবারই হয়, কিন্তু একটি জাতীয় সরকারের মেয়াদের পাঁচ বছর ধরেই স্থানীয় সরকারের অসংখ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে থাকে। নির্বাচনকাল সব দেশ ও সবসময়ের জন্যই একটি অস্থির সময়। অস্থিরতা সমাজের ও রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কাজে কম-বেশি বিঘ্ন সৃষ্টি করেই থাকে। স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠান তথা ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটি একক তফসিলে সর্বাধিক এক মাস বা ৪৫ দিন সময় নিয়ে শেষ করা যায়। এ নির্বাচন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের উভয়ের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী ও সময়সাশ্রয়ী হবে। স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশে সহায়ক ও স্থানীয় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে বলে বিশ্বাস।

বর্তমান ব্যবস্থায় পাঁচটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পৃথক পাঁচটি তফসিলে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি তফসিলে ৪৫ দিন করে একটি পাঁচ বছরের সরকারের মোট ২২৫ দিন সময় ব্যয় হয়। আর্থিক ও প্রশাসনিক ঝক্কি-ঝামেলার কথা এ সময় নাই-বা বলা হলো। সরকারের সমন্বিত ও পরিকল্পিত উন্নয়নকাজেও প্রচুর বিঘ্ন ও অপচয় ঘটে। এ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একেকটি জেলার ভৌগোলিক কাঠামোয় নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে কাজ করে। বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন যেহেতু ভিন্ন সময়ে হয়, তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মেয়াদকাল শুরু ও শেষ করে। এ কারণে একটি বিশেষ এলাকায় জাতীয় সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে তাল রাখা যায় না। তাছাড়া আন্তঃপ্রতিষ্ঠান সমন্বয় ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সময়কালের একটি অসামঞ্জস্য দেখা যায়। একসঙ্গে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা গেলে এ দুটি ক্ষেত্রেও একটি শৃঙ্খলা আনা যায়।

জেলা পরিষদ ছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রতিজন ভোটার তিনটি করে ভোট দিয়ে থাকেন। পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদের বেলায় প্রতিজন নাগরিক মেয়র বা চেয়ারম্যানকে একটি, সাধারণ সদস্য বা কাউন্সিলরকে একটি এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য বা কাউন্সিলরকে একটি করে ভোট দিয়ে থাকেন। গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ভোটার এবং সিটি করপোরেশন বাদে সব পৌর এলাকার ভোটাররা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুই ভাইস চেয়ারকে মোট তিনটি ভোট দিয়ে থাকেন। জেলা পরিষদে সাধারণ নাগরিকদের ভোট দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না বা সাধারণের ভোটাধিকার নেই। জেলা পরিষদে নাগরিকদের ভোটাধিকার চালু করা উচিত। নতুন প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তা অতিসহজে করা সম্ভব।

ভোটে শৃঙ্খলা বিধান বা সহজীকরণের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো এবং আইন কাঠামোর সামঞ্জস্য বিধান প্রয়োজন। বর্তমানে জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক এলাকা নির্বিশেষে প্রতি জেলায় জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানসহ মোট ২১ জন, উপজেলায় তিনজন এবং ইউনিয়নে ১৩ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। জেলায় সাধারণ ভোটারদের ভোটাধিকার নেই। শ্রেণী ও আকার অনুযায়ী পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর সংখ্যা কম-বেশি হয়। সেটি পূর্ণমাত্রায় যুক্তিসংগত। অন্য তিনটি তথাকথিত গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে (জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে) জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও আয়তন বিবেচনায় সদস্যপদে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেনি। পদের ধরন ও নির্বাচন পদ্ধতিও এক ও অভিন্ন নয়। (চলবে)

 

ড. তোফায়েল আহমেদ: ‘সুজন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

আরও